• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১০ আষাঢ় ১৪২৯
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণেরই ইঙ্গিত
ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণেরই ইঙ্গিত

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনাকালীন সময়ে কোন ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ সফর করেছেন। দুইদিনের এই সফরের মুল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির বার্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেয়া। বৈঠক নিয়ে যে রাকঢাক বা গোপনীয়তা উভয়পক্ষ দেখিয়েছে তাতে বোঝা যায় এ বৈঠকের গুরুত্ব।

এমন এক সময়ে এ সফর অনুষ্ঠতি হল যখন বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের বৃদ্ধি ও নতুন মেরুকরণ ঘটছে। ভারত-চীন দ্বন্দ্ব প্রায় যুদ্ধের পর্যায়ে রয়েছে। এতে বর্ধিত মদদ দিয়েছে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব। মার্কিন-ট্রাম্প এবং ভারত-মোদির উষ্ণ করমর্দন। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চীনের প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠছে। চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব প্রতিবেশী দেশ থেকে যে প্রতিক্রিয়া ভারত আশা করেছিল, সেটা সে পায়নি। যদিও শ্রীলঙ্কার নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়নাথ কলন্বাগে বলেছে তারা ‘ইন্ডিয়া ফাষ্ট’ নীতি গ্রহণ করেছে। এবং আরো বলেছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতাধরদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কলম্বো নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে। বাংলাদেশ সরকারও সরাসরি ভারতের পক্ষ নেয়নি চীনের সাথে তার অর্থনৈতিক গাঁটছড়ার কারণে। তারাও নিরপেক্ষতার ভান করে হলেও আলোচনা মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলেছে।

চীনের সঙ্গে ভারতের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে চীন বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। তিস্তা ব্যারেজে চীন বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে। জুনে চীন-ভারত সংঘর্ষের একদিন পরই চীন বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১ টি পণ্য রপ্তানিতে ৯৭ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশকে পক্ষে রাখতে চাইছে। চীন বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে রাজনীতিতেও উপস্থিত হচ্ছে। নেপালের সঙ্গেও ভারতের সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেন জুলাইয়ের শেষ দিকে। জুলাই মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের হাইকমিশনার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের বক্তব্য-‘দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, শত্রুতা নয়। আর কুটনীতিতে চিরদিনের জন্য বন্ধু আর চিরজীবনের শত্রু বলে কিছু নেই।’পাকিস্তানের এই যোগাযোগ যে চীনের প্রভাবেই ঘটছে ভারত সেটা বুঝেই উদ্বিগ্ন হচ্ছে। বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে এবং বাংলাদেশকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদীদের রশি টানাটানি চলছে। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার হঠাৎ ঢাকা সফর তারই প্রকাশ।

শ্রিংলার সফর পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রালয় থেকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারতের যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব করোনাকালীন সময়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত না হওয়া, এ বৈঠক ছিল তারই অংশ বিশেষ। এ ছাড়া ভারতে উৎপাদিত ভ্যাকসিন প্রতিবেশি দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে দিতে তারা আগ্রহী। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা, রোহিঙ্গাসহ বিবিধ প্রশ্নে নিয়েও নাকি তাদের মধ্যে কথা হয়েছে। বাস্তবতা হল সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যা যেন ভারতের এক রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের গড়িমসি, রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের মায়ানমারের পক্ষাবলম্বন, কিংবা সিএএ ও এনআরসি’র মত সাম্প্রদায়িক বিল পাশ এবং এ নিয়ে বিজেপি সরকারের সিনিয়র নেতা-নেত্রীদের ভারতের মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে নানা উগ্র হিন্দুত্ববাদী বক্তব্য হাসিনা সরকারকে যথেষ্ট চাপে ফেলেছিল। এ সব কারণে হাসিনা সরকার কিছুটা গোস্বা করতেই পারে। ফলে হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলীর সাথে করোনকালীন অজুহাতে সাক্ষাৎ না করতে চাওয়া এগুলো কারণ হতে পারে। যদিও বলা হচ্ছে করোনার জন্য সাক্ষাৎ দেয়া হয়নি। অথচ শ্রিংলাকে শেখ হাসিনা ঠিকই সাক্ষাৎ দিয়েছেন।

করোনা উত্তর সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা মার্কিন অর্থনীতিতে এক প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী চীন আজ সরাসরি বিভিন্ন প্রশ্নে মার্কিনকে খোলামেলা চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এক্ষেত্রে একের পর এক পরাজয়ে মার্কিন-ট্রাম্প বৃদ্ধ বাঘের ন্যায় হুঙ্কার দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিনের বিশ্বস্ত অনুচর ভারতকে দিয়ে চীনকে ঠেকাতে চাইছে। চীনের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী উত্থান দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মুঠি ক্রমান্বয়ে আলগা হতে চলেছে। ভারতের সীমান্তে নেপালের মতো ছোট দেশও আজ দিল্লির দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের বিশাল পুঁজির কাছে আমেরিকা-ইউরোপই যখন ধরাশায়ী, তখন ভারতের অবস্থা যে লেজে গোবরে হয়ে দাঁড়িয়েছে তার হিসাব টানতে বড় কোন গণিতবিদ হবার প্রয়োজন পড়েনা।

ফলে হর্ষ বর্ধনের সফরে করোনা ভ্যাকসিনের বিষয় যে উঠে এসেছে তা কথার কথা নয়। কারণ করোনা পর্বেও চীনের সাথে বাংলাদেশের মাখামাখি কম নয়। ইতিপূর্বে চীনা চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে এবং বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছে। চীন বলছে করোনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশকে তারা আগে দিবে। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সফরের কিছুদিন আগে চীনের করোনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের জন্য বাংলাদেশে এসেছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও তার বাজারজাত করণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তাদের এই প্রতিযোগিতা যতটা না জীবন রক্ষার জন্য তার চেয়ে বেশি অর্থের লিপ্সা এবং মুনাফা অর্জন। কারণ মুনাফার লিপ্সায় তারা করোনার ভয়াল থাবা থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার সহ করোনা সামগ্রী উৎপন্ন ও বিপণনে কোন সমন্বিত উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সমগ্র পুঁজিবাদী বিশ্ব উন্নয়নের যে জিগির দিয়ে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে রাখতে চায় তা যে কত ঠুনকো এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা যে কত বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে তা করোনা বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে। ফলে মার্কিন-ভারত বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিনের বাজার চীনের কাছে সহজে ছেড়ে দিবে না এটাও সত্য। হর্ষ বর্ধণ শ্রিংলার করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কথা বলাটাই স্বাভাবিক। তাই, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেছে আমরা ভারতের ভ্যাকসিন ট্রায়াল দেয়ার বিষয়টি আশস্ত করেছি। কিন্তু শ্রিংলার সফরের রেশ শেষ হতে না হতেই চীনের করোনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ভারত-মোদির কড়া বার্তা পেয়েও হাসিনা সরকার চীনের সাথে ব্যালেন্স রাখছে-এটিও গুরুত্বপূর্ণ  ।

পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলার এ সফরকে যতই করোনা ভ্যাকসিন কেন্দ্রীক বলার চেষ্টা করুক না কেন, এ সফর ছিল যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক তা আমরা উপরেই বলেছি। আওয়ামী সরকারের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়াকে ভারত ভালভাবে নিচ্ছে না, তা শ্রিংলা শেখ হাসিনাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। মোদির সেই কড়া বার্তা নিয়েই শ্রিংলা বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের অবস্থা এখন দাঁড়িয়েছে অনেকটা শ্যাম রাখি না কুল রাখির মত। এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা চীন-ভারতের সাথে ব্যালেন্স করে চলতে চাইছে।

তারপরও কথা হচ্ছে হাসিনা সরকারকে ভারতই দুই দুই বার ক্ষমতায় বসিয়েছে। তাই শেখ হাসিনার পক্ষে ভারত মুক্ত হওয়া বেশ কঠিন। তাই বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাব শাকশ্রেণির সরকারি অংশেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এগুলোর সাথে বিভিন্নভাবে সরকারের ক্ষমতার বহির্ভূত বিবিধ শক্তি সক্রিয় থাকবে এবং মদদ দিবে তাতে সন্দেহ নেই। বিপ্লবী শক্তিকে এই পরিস্থিতিকে নজরে রাখতে হবে। জনগণকে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি উচ্ছেদ করে গণক্ষমতা দখলের বিপ্লবী রাজনীতিতে সজ্জিত হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণেরই ইঙ্গিত

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনাকালীন সময়ে কোন ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ সফর করেছেন। দুইদিনের এই সফরের মুল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির বার্তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেয়া। বৈঠক নিয়ে যে রাকঢাক বা গোপনীয়তা উভয়পক্ষ দেখিয়েছে তাতে বোঝা যায় এ বৈঠকের গুরুত্ব।

এমন এক সময়ে এ সফর অনুষ্ঠতি হল যখন বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের বৃদ্ধি ও নতুন মেরুকরণ ঘটছে। ভারত-চীন দ্বন্দ্ব প্রায় যুদ্ধের পর্যায়ে রয়েছে। এতে বর্ধিত মদদ দিয়েছে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব। মার্কিন-ট্রাম্প এবং ভারত-মোদির উষ্ণ করমর্দন। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চীনের প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠছে। চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব প্রতিবেশী দেশ থেকে যে প্রতিক্রিয়া ভারত আশা করেছিল, সেটা সে পায়নি। যদিও শ্রীলঙ্কার নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়নাথ কলন্বাগে বলেছে তারা ‘ইন্ডিয়া ফাষ্ট’ নীতি গ্রহণ করেছে। এবং আরো বলেছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতাধরদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কলম্বো নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে। বাংলাদেশ সরকারও সরাসরি ভারতের পক্ষ নেয়নি চীনের সাথে তার অর্থনৈতিক গাঁটছড়ার কারণে। তারাও নিরপেক্ষতার ভান করে হলেও আলোচনা মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলেছে।

চীনের সঙ্গে ভারতের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে চীন বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। তিস্তা ব্যারেজে চীন বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে। জুনে চীন-ভারত সংঘর্ষের একদিন পরই চীন বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১ টি পণ্য রপ্তানিতে ৯৭ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশকে পক্ষে রাখতে চাইছে। চীন বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে রাজনীতিতেও উপস্থিত হচ্ছে। নেপালের সঙ্গেও ভারতের সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেন জুলাইয়ের শেষ দিকে। জুলাই মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের হাইকমিশনার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের বক্তব্য-‘দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, শত্রুতা নয়। আর কুটনীতিতে চিরদিনের জন্য বন্ধু আর চিরজীবনের শত্রু বলে কিছু নেই।’পাকিস্তানের এই যোগাযোগ যে চীনের প্রভাবেই ঘটছে ভারত সেটা বুঝেই উদ্বিগ্ন হচ্ছে। বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব বাংলাদেশে পড়ছে এবং বাংলাদেশকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদীদের রশি টানাটানি চলছে। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার হঠাৎ ঢাকা সফর তারই প্রকাশ।

শ্রিংলার সফর পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রালয় থেকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারতের যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব করোনাকালীন সময়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত না হওয়া, এ বৈঠক ছিল তারই অংশ বিশেষ। এ ছাড়া ভারতে উৎপাদিত ভ্যাকসিন প্রতিবেশি দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে দিতে তারা আগ্রহী। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা, রোহিঙ্গাসহ বিবিধ প্রশ্নে নিয়েও নাকি তাদের মধ্যে কথা হয়েছে। বাস্তবতা হল সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যা যেন ভারতের এক রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের গড়িমসি, রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের মায়ানমারের পক্ষাবলম্বন, কিংবা সিএএ ও এনআরসি’র মত সাম্প্রদায়িক বিল পাশ এবং এ নিয়ে বিজেপি সরকারের সিনিয়র নেতা-নেত্রীদের ভারতের মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে নানা উগ্র হিন্দুত্ববাদী বক্তব্য হাসিনা সরকারকে যথেষ্ট চাপে ফেলেছিল। এ সব কারণে হাসিনা সরকার কিছুটা গোস্বা করতেই পারে। ফলে হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলীর সাথে করোনকালীন অজুহাতে সাক্ষাৎ না করতে চাওয়া এগুলো কারণ হতে পারে। যদিও বলা হচ্ছে করোনার জন্য সাক্ষাৎ দেয়া হয়নি। অথচ শ্রিংলাকে শেখ হাসিনা ঠিকই সাক্ষাৎ দিয়েছেন।

করোনা উত্তর সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা মার্কিন অর্থনীতিতে এক প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী চীন আজ সরাসরি বিভিন্ন প্রশ্নে মার্কিনকে খোলামেলা চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এক্ষেত্রে একের পর এক পরাজয়ে মার্কিন-ট্রাম্প বৃদ্ধ বাঘের ন্যায় হুঙ্কার দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিনের বিশ্বস্ত অনুচর ভারতকে দিয়ে চীনকে ঠেকাতে চাইছে। চীনের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী উত্থান দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মুঠি ক্রমান্বয়ে আলগা হতে চলেছে। ভারতের সীমান্তে নেপালের মতো ছোট দেশও আজ দিল্লির দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের বিশাল পুঁজির কাছে আমেরিকা-ইউরোপই যখন ধরাশায়ী, তখন ভারতের অবস্থা যে লেজে গোবরে হয়ে দাঁড়িয়েছে তার হিসাব টানতে বড় কোন গণিতবিদ হবার প্রয়োজন পড়েনা।

ফলে হর্ষ বর্ধনের সফরে করোনা ভ্যাকসিনের বিষয় যে উঠে এসেছে তা কথার কথা নয়। কারণ করোনা পর্বেও চীনের সাথে বাংলাদেশের মাখামাখি কম নয়। ইতিপূর্বে চীনা চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে এবং বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছে। চীন বলছে করোনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশকে তারা আগে দিবে। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সফরের কিছুদিন আগে চীনের করোনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের জন্য বাংলাদেশে এসেছে। বিশ্বব্যাপী মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও তার বাজারজাত করণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তাদের এই প্রতিযোগিতা যতটা না জীবন রক্ষার জন্য তার চেয়ে বেশি অর্থের লিপ্সা এবং মুনাফা অর্জন। কারণ মুনাফার লিপ্সায় তারা করোনার ভয়াল থাবা থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার সহ করোনা সামগ্রী উৎপন্ন ও বিপণনে কোন সমন্বিত উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সমগ্র পুঁজিবাদী বিশ্ব উন্নয়নের যে জিগির দিয়ে মানুষকে মোহগ্রস্ত করে রাখতে চায় তা যে কত ঠুনকো এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা যে কত বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে তা করোনা বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে। ফলে মার্কিন-ভারত বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিনের বাজার চীনের কাছে সহজে ছেড়ে দিবে না এটাও সত্য। হর্ষ বর্ধণ শ্রিংলার করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কথা বলাটাই স্বাভাবিক। তাই, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেছে আমরা ভারতের ভ্যাকসিন ট্রায়াল দেয়ার বিষয়টি আশস্ত করেছি। কিন্তু শ্রিংলার সফরের রেশ শেষ হতে না হতেই চীনের করোনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ভারত-মোদির কড়া বার্তা পেয়েও হাসিনা সরকার চীনের সাথে ব্যালেন্স রাখছে-এটিও গুরুত্বপূর্ণ  ।

পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলার এ সফরকে যতই করোনা ভ্যাকসিন কেন্দ্রীক বলার চেষ্টা করুক না কেন, এ সফর ছিল যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক তা আমরা উপরেই বলেছি। আওয়ামী সরকারের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়াকে ভারত ভালভাবে নিচ্ছে না, তা শ্রিংলা শেখ হাসিনাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। মোদির সেই কড়া বার্তা নিয়েই শ্রিংলা বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের অবস্থা এখন দাঁড়িয়েছে অনেকটা শ্যাম রাখি না কুল রাখির মত। এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনা চীন-ভারতের সাথে ব্যালেন্স করে চলতে চাইছে।

তারপরও কথা হচ্ছে হাসিনা সরকারকে ভারতই দুই দুই বার ক্ষমতায় বসিয়েছে। তাই শেখ হাসিনার পক্ষে ভারত মুক্ত হওয়া বেশ কঠিন। তাই বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাব শাকশ্রেণির সরকারি অংশেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এগুলোর সাথে বিভিন্নভাবে সরকারের ক্ষমতার বহির্ভূত বিবিধ শক্তি সক্রিয় থাকবে এবং মদদ দিবে তাতে সন্দেহ নেই। বিপ্লবী শক্তিকে এই পরিস্থিতিকে নজরে রাখতে হবে। জনগণকে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি উচ্ছেদ করে গণক্ষমতা দখলের বিপ্লবী রাজনীতিতে সজ্জিত হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র