• বৃহঃস্পতিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩০
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
ভারতের কৃষক আন্দোলন- কর্পোরেট দাসত্বের বিরুদ্ধে কৃষকের লড়াই
ভারতের কৃষক আন্দোলন- কর্পোরেট দাসত্বের বিরুদ্ধে কৃষকের লড়াই

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১  |  অনলাইন সংস্করণ

সম্প্রতি (সেপ্টেম্বরে) হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে পার্লামেন্টে কন্ঠ ভোটে  তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন পাস করেছে। এ আইনের বলে ভারত রাষ্ট্রের কৃষি হবে রাষ্ট্রের/সরকারি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত। তা চলে যাবে সম্পূর্ণরূপে কর্পোরেট পুঁজি এবং ব্যবসায়ীদের হাতে।   

করোনাকালীন ৩ টি নতুন আইন :  

১) কৃষিপণ্য বাণিজ্য আইন: এই আইনে মান্ডি বা মান্দি প্রথা বাতিল করা হয়েছে। এই প্রথায় সরকার ভর্তুকি দিয়ে সরকারি রেটে কৃষকের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় MSP (Minimum Supporting Price) বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য। নতুন বাণিজ্য আইনে এমএসপি তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে কৃষক তার পণ্য কোম্পানি বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত কম রেটে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য থাকবে।  

২) মূল্য সুরক্ষা ও কৃষি পরিষেবা সংক্রান্ত চুক্তি আইন: এই আইনে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর পূর্বনির্ধারিত মূল্যে কৃষক কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য থাকবে। এবং কোম্পানির নির্ধারিত ফসলই চাষ করতে হবে। যেমন ব্রিটিশ ভারতে নীল চাষ প্রথা। আমাদের দেশের হালের তামাক চাষ।  

৩) অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন: এই আইনে দানা শস্য, আলু, তৈল বীজ, পেঁয়াজ এগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে এগুলো এখন সরকার সংরক্ষণ করবে না। ব্যবসায়ীরা যে যত বেশি সম্ভব  গুদামজাত করতে পারবে। এবং ৫০% দাম বৃদ্ধি পেলেই কেবল সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। আগে সরকার এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো। এর ফলে এ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাখুশীমত (একটা পর্যায় পর্যন্ত) বাড়িয়ে দিতে পারবে, যা কৃষক ও ভোক্তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।  

* ঋণ নেওয়ার শর্ত হিসেবে IMF I WTO -এর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ভারত সরকার এসব আইন পাশ করেছে।   পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল, পশ্চিমবঙ্গসহ সারা ভারতের প্রায় পাঁচ শতাধিক কৃষক সংগঠন এ আইন বাতিলের দাবিতে জোট বেধেছে। ইতিমধ্যে মাওবাদীরা এ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ভারতের বামপন্থী সংগঠন, বুর্জোয়া দলগুলোর একটা বড় অংশ এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বগণ তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এ আন্দোলনের প্রতি।   এ গণআন্দোলন এত ব্যাপকতা অর্জন করার একটি কারণ হলো এতে ব্যাপক ধনীকৃষক ও কৃষি বুর্জোয়াদের অংশগ্রহণ। বাস্তবে এটি হলো সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট পুঁজি ও মুৎসুদ্দি পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ধনী কৃষক/কৃষি বুর্জোয়া থেকে সমস্ত স্তরের জনগণের স্বার্থানুসারী একটি আন্দোলন। সরকার-বিরোধী শাসকশ্রেণির অন্য দলগুলো যে একে সমর্থন করছে সেটা ভোটের রাজনীতিতে জনসমর্থন পাওয়ার জন্য। একইসাথে এটা যেহেতু বিপ্লবী আন্দোলন নয় সেজন্যও।   

* হাজার হাজার কৃষক দিল্লির তীব্র শীত, টিয়ার গ্যাস, জল কামান, হামলা-মামলা উপেক্ষা করে অভিনব কায়দায় দিল্লি ঘেরাও করে রেখে এক অভ‚তপূর্ব গণআন্দোলন গড়ে তুলেছেন। সরকার এ আন্দোলনকে বিরোধীদের উস্কানী, মাওবাদীদের সম্পৃক্ততা বা রাষ্ট্রদ্রোহীদের ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। পুলিশী নিপীড়নে বেশ কিছু কৃষক মারা গেছেন। আন্দোলনের চাপে মোদি সরকার কৃষকদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করে এ আইন সংস্কারের কথা বললেও কৃষকরা এ আইন পুরোপুরি বাতিলের সিদ্ধান্তে অটল। শেষ পর্যন্ত মোদি সরকার বিতর্কিত কৃষি আইনের প্রয়োগ এক-দেড় বছরের জন্য স্থগিত রাখতে প্রস্তাব রেখেছে। কিন্তু কৃষক নেতারা এই তিন আইন বাতিলের মূল দাবি  থেকে সরছেন না।  

সাম্রাজ্যবাদ বা কর্পোরেট পুঁজির সেবাদাস ‘মোদিজি’ আদানী-আম্বানীদের মত মুৎসুদ্দি বা বিদেশি পুঁজির একচেটিয়া শাসন-শোষণ, লুন্ঠনের বিস্তার ঘটাতে হাত দিয়েছে ভারতের হৃদপিন্ড কৃষি ও কৃষকের উপর। ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ অব্দি কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ। শুধু গত বছরেই প্রায় ১০,২৮১ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তৃতীয় বিশ্বের নয়া ঔপনিবেশিক দেশে দেশে সা¤্রাজ্যবাদী প্রেসক্রিপশনে এ ধরনের ‘উন্নয়ন’ কৃষককে সর্বস্বান্ত করে পরিণত করে কর্পোরেট পুঁজির মজুরি দাসে। গুজরাটের কসাই, হিন্দুত্ববাদী মোদি যে মুৎসুদ্দি এবং বিদেশি পুঁজির স্বার্থবাহী, তা ভারতের কৃষকরা এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরও একবার বিশ্বের তাবৎ শোষিত-নিপীড়িত মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছেন।   

ভারত সহ সকল দেশের কৃষকদের সাম্রাজ্যবাদ ও কর্পোরেট পুঁজিবাদীদের এই শোষণ ব্যবস্থার উচ্ছেদের সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে হবে। এ কারণে এধরনের গণ-আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেয়া খুব কঠিন। সরকার দাবি না মেনে দমন-নির্যাতন, বিভক্তি সৃষ্টি- এসব পথ বেছে নিচ্ছে। তাই কৃষককে বিপ্লবী রাজনীতির চেতনায় সজ্জিত করাটাই মৌলিক কর্তব্য।  

ভারতের কৃষক আন্দোলন- কর্পোরেট দাসত্বের বিরুদ্ধে কৃষকের লড়াই

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১  |  অনলাইন সংস্করণ

সম্প্রতি (সেপ্টেম্বরে) হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে পার্লামেন্টে কন্ঠ ভোটে  তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন পাস করেছে। এ আইনের বলে ভারত রাষ্ট্রের কৃষি হবে রাষ্ট্রের/সরকারি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত। তা চলে যাবে সম্পূর্ণরূপে কর্পোরেট পুঁজি এবং ব্যবসায়ীদের হাতে।   

করোনাকালীন ৩ টি নতুন আইন :  

১) কৃষিপণ্য বাণিজ্য আইন: এই আইনে মান্ডি বা মান্দি প্রথা বাতিল করা হয়েছে। এই প্রথায় সরকার ভর্তুকি দিয়ে সরকারি রেটে কৃষকের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় MSP (Minimum Supporting Price) বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য। নতুন বাণিজ্য আইনে এমএসপি তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে কৃষক তার পণ্য কোম্পানি বা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত কম রেটে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য থাকবে।  

২) মূল্য সুরক্ষা ও কৃষি পরিষেবা সংক্রান্ত চুক্তি আইন: এই আইনে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর পূর্বনির্ধারিত মূল্যে কৃষক কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য থাকবে। এবং কোম্পানির নির্ধারিত ফসলই চাষ করতে হবে। যেমন ব্রিটিশ ভারতে নীল চাষ প্রথা। আমাদের দেশের হালের তামাক চাষ।  

৩) অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন: এই আইনে দানা শস্য, আলু, তৈল বীজ, পেঁয়াজ এগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে এগুলো এখন সরকার সংরক্ষণ করবে না। ব্যবসায়ীরা যে যত বেশি সম্ভব  গুদামজাত করতে পারবে। এবং ৫০% দাম বৃদ্ধি পেলেই কেবল সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। আগে সরকার এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো। এর ফলে এ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাখুশীমত (একটা পর্যায় পর্যন্ত) বাড়িয়ে দিতে পারবে, যা কৃষক ও ভোক্তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।  

* ঋণ নেওয়ার শর্ত হিসেবে IMF I WTO -এর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ভারত সরকার এসব আইন পাশ করেছে।   পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল, পশ্চিমবঙ্গসহ সারা ভারতের প্রায় পাঁচ শতাধিক কৃষক সংগঠন এ আইন বাতিলের দাবিতে জোট বেধেছে। ইতিমধ্যে মাওবাদীরা এ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ভারতের বামপন্থী সংগঠন, বুর্জোয়া দলগুলোর একটা বড় অংশ এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বগণ তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এ আন্দোলনের প্রতি।   এ গণআন্দোলন এত ব্যাপকতা অর্জন করার একটি কারণ হলো এতে ব্যাপক ধনীকৃষক ও কৃষি বুর্জোয়াদের অংশগ্রহণ। বাস্তবে এটি হলো সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট পুঁজি ও মুৎসুদ্দি পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ধনী কৃষক/কৃষি বুর্জোয়া থেকে সমস্ত স্তরের জনগণের স্বার্থানুসারী একটি আন্দোলন। সরকার-বিরোধী শাসকশ্রেণির অন্য দলগুলো যে একে সমর্থন করছে সেটা ভোটের রাজনীতিতে জনসমর্থন পাওয়ার জন্য। একইসাথে এটা যেহেতু বিপ্লবী আন্দোলন নয় সেজন্যও।   

* হাজার হাজার কৃষক দিল্লির তীব্র শীত, টিয়ার গ্যাস, জল কামান, হামলা-মামলা উপেক্ষা করে অভিনব কায়দায় দিল্লি ঘেরাও করে রেখে এক অভ‚তপূর্ব গণআন্দোলন গড়ে তুলেছেন। সরকার এ আন্দোলনকে বিরোধীদের উস্কানী, মাওবাদীদের সম্পৃক্ততা বা রাষ্ট্রদ্রোহীদের ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। পুলিশী নিপীড়নে বেশ কিছু কৃষক মারা গেছেন। আন্দোলনের চাপে মোদি সরকার কৃষকদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করে এ আইন সংস্কারের কথা বললেও কৃষকরা এ আইন পুরোপুরি বাতিলের সিদ্ধান্তে অটল। শেষ পর্যন্ত মোদি সরকার বিতর্কিত কৃষি আইনের প্রয়োগ এক-দেড় বছরের জন্য স্থগিত রাখতে প্রস্তাব রেখেছে। কিন্তু কৃষক নেতারা এই তিন আইন বাতিলের মূল দাবি  থেকে সরছেন না।  

সাম্রাজ্যবাদ বা কর্পোরেট পুঁজির সেবাদাস ‘মোদিজি’ আদানী-আম্বানীদের মত মুৎসুদ্দি বা বিদেশি পুঁজির একচেটিয়া শাসন-শোষণ, লুন্ঠনের বিস্তার ঘটাতে হাত দিয়েছে ভারতের হৃদপিন্ড কৃষি ও কৃষকের উপর। ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ অব্দি কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ। শুধু গত বছরেই প্রায় ১০,২৮১ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তৃতীয় বিশ্বের নয়া ঔপনিবেশিক দেশে দেশে সা¤্রাজ্যবাদী প্রেসক্রিপশনে এ ধরনের ‘উন্নয়ন’ কৃষককে সর্বস্বান্ত করে পরিণত করে কর্পোরেট পুঁজির মজুরি দাসে। গুজরাটের কসাই, হিন্দুত্ববাদী মোদি যে মুৎসুদ্দি এবং বিদেশি পুঁজির স্বার্থবাহী, তা ভারতের কৃষকরা এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরও একবার বিশ্বের তাবৎ শোষিত-নিপীড়িত মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছেন।   

ভারত সহ সকল দেশের কৃষকদের সাম্রাজ্যবাদ ও কর্পোরেট পুঁজিবাদীদের এই শোষণ ব্যবস্থার উচ্ছেদের সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে হবে। এ কারণে এধরনের গণ-আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেয়া খুব কঠিন। সরকার দাবি না মেনে দমন-নির্যাতন, বিভক্তি সৃষ্টি- এসব পথ বেছে নিচ্ছে। তাই কৃষককে বিপ্লবী রাজনীতির চেতনায় সজ্জিত করাটাই মৌলিক কর্তব্য।  

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র