• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১০ আষাঢ় ১৪২৯
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
তালেবান সামন্ততান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর, ধর্মীয়-ফ্যাসিবাদী গণশত্রু কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ দেশ-জাতি-জনগণের আরও বড় শত্রু
তালেবান সামন্ততান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর, ধর্মীয়-ফ্যাসিবাদী গণশত্রু কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ দেশ-জাতি-জনগণের আরও বড় শত্রু

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

বুধবার, ২৫ আগস্ট ২০২১  |  অনলাইন সংস্করণ

আফগানিস্তানে দীর্ঘ দুই দশক পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সেনা প্রত্যাহার করা শুরু করলে মার্কিনের পুতুল ঘানি সরকার গত ১৫ আগস্ট পলায়ন করে। ফলে কোনো সামরিক বাধার সম্মুখীন না হয়েই তালেবান কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে। সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে আধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি দ্বারা সজ্জিত আফগান সেনাবাহিনীর তালেবানের কাছে এ হেন আত্মসমর্পণ মার্কিন-তালেবান-ঘানি সরকারের মধ্যে পর্দার আড়ালে এক ধরনের সমঝোতা বলে ধারণা করা অমূলক হবে না। যদিও বাহিনীর শক্তিতে বলিয়ান তালেবানই হতে বাধ্য রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান শরীক।    

 

তালেবান কারা? 

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অধীনে আফগানিস্তান ছিল একটি আধা সামন্ততান্ত্রিক-আধা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। গত শতাব্দীর ৭০-র দশকে রুশ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে মার্কিনের দ্বন্দ্ব যখন তীব্র, তখন মার্কিনের মদদে রুশকে ঠেকাতে আফগানিস্তানে ইসলামী মৌলবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটে, যেটাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কমিউনিজম বিরোধী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে। ৮০-র দশকে সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। ব্যাপক পরিমাণ আফগানিরা দেশান্তরিত হয়ে পাকিস্তানের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। মার্কিন-পাকিস্তানের মদদ-সহায়তা-পরিচালনায় শরণার্থী ক্যাম্পগুলো পরিণত হয় জঙ্গিদের ট্রেনিং সেন্টারে। সোভিয়েত আগ্রাসন বিরোধী সংগ্রামে নানা জাতিগোত্রে বিভক্ত ইসলামী জিহাদিরা ছাড়াও প্রকৃত দেশপ্রেমিক-গণতন্ত্রকামী-বিপ্লবীরাও সামিল হয়েছিলেন। কিন্তু তারা প্রাধান্যকারী অবস্থানে পৌছতে ব্যর্থ হন। ৮০-র দশকের শেষে সোভিয়েত পিছু হটলে মার্কিন মদদে মুজাহিদিনরা ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু অচিরেই নানা কেন্দ্রে বিভক্ত মুজাহিদিনদের অন্তর্কলহে আফগানিস্তান জুড়ে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা ভিন্ন পথ গ্রহণ করে।  সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ব্যাপকভাবে মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষার্থীরা তালেব এলেম নামে পরিচিত; আর তা থেকে তালেবানের উৎপত্তি। এই তালেবানদের উত্থানের পেছনে ছিল মার্কিনের মদদ ও সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি ভূমিকা। মুজাহিদিনদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে আফগানিস্তানজুড়ে যখন চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে তখন তালেবানরা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা দখল করে।  কিন্তু ক্ষমতাসীন হয়ে মার্কিনের সাথে তাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সামন্ততান্ত্রিক ধর্মবাদ বনাম মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া বিকাশ - কোনপথে আফগানিস্তান আগাবে- এ প্রশ্নে মার্কিনের সাথে তালেবানের তিক্ততা বাড়তেই থাকে। যার সাথে মার্কিনের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের বিষয়টি যুক্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনায় মার্কিনীদের পক্ষ থেকে লাদেন/আল কায়েদাকে দায়ী করা ও লাদেনকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেয়ার অজুহাতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আফগানিস্তানে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালায়। ফলে মার্কিন মদদপুষ্ট, হাতেগড়া তালেবান মার্কিনের শত্রুতে পরিণত হয়। মার্কিন-ন্যাটো জোটের সৈন্যদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠা পায় মার্কিনের নতজানু বিভিন্ন সরকার।   

 

স্বাধীনচেতা আফগান জনগণের ন্যায্য সংগ্রাম  

আফগানিস্তানের ভৌগোলিক দুর্গমতা, ক্ষুদ্রক্ষুদ্র জাতিসত্তা, অনুন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা, সামন্তীয় ভাবধারার প্রধান্য সত্তে¡ও জাতি হিসেবে তাদের স্বাধীনচেতা মনোভাব বহুপূর্ব থেকেই সুবিদিত। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন দ্বারা কুক্ষিগত হলেও আফগানদের ব্রিটিশরা পদানত করতে পারেনি। লড়াকু এ আফগানরা গত ও এ শতাব্দীর রুশ ও মার্কিন আগ্রাসনকেও রুখে দাড়িয়েছেন, লড়াই করেছেন, যা ছিল ন্যায্য। আফগান জনগণের বীরত্মব্যঞ্জক লড়াই, আত্মত্যাগ সত্তে¡ও তাদের ন্যায্য মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব কুক্ষিগত করে ধর্মবাদী, মুৎসুদ্দি ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীলরা। যারা এক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অন্য সাম্রাজ্যবাদের পক্ষপুটে আশ্রয় নেয়। এভাবে জনগণের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়। এবারও সেটাই ঘটেছে কিছুটা ভিন্নভাবে।    

 

চলমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী অন্তর্দ্বন্দ্বঃ ক্ষমতার পালাবদলে বড় অনুঘটক

আফগানিস্তানে ১৯৯৬ সালে তালেবান সরকারের প্রতিষ্ঠা ও এ শতাব্দীর প্রথমে তাদের পতনকালীন সময়ে ছিল মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের এক মেরু বিশ্ব। তারা গণশত্রæদের সকল পক্ষকেই যেভাবে নিজ কুক্ষিগত রাখতে পেরেছে বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে ভিন্ন।   দীর্ঘ দুই দশক পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ আজ মার্কিনের প্রধান মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। রুশ সাম্রাজ্যবাদও তার হৃত শক্তিমত্তা অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করেছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী অন্তর্দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধি, মার্কিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক-সামরিক সংকটের কারণে তারা বৈশ্বিক রাজনীতিতে তার পলিসি পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। মার্কিনের পক্ষে গোয়ার্তুমি করে আরও কিছুকাল আফগানিস্তানে টিকে থাকতে নিশ্চয়ই সক্ষম ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়া তার সুযোগ নিয়ে তালেবানদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করার মওকা পাবে। ফলে মার্কিনের পুরনো মিত্র তালেবানরা একেবারেই তার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া মার্কিন তার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে এখন পরিপূর্ণভাবে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত করতে চায়। যা গুরুতরভাবে ব্যাহত হবে যদি তারা আরো সুদীর্ঘদিন ধরে তালেবান ঠেকানোর ফলহীন কাজে আটকে থাকে।   তাই, এক ধরনের সম্মানজনক প্রস্থান ও তালেবানদের সাথেও এক ধরনের সমঝোতার মাধ্যমে তার স্বার্থ যতটা সম্ভব রক্ষাই হলো আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সৈন্য গুটিয়ে ফেলার অন্যতম কারণ। এ লক্ষ্যে তারা কয়েক বছর ধরেই কাজ করছে। তাদের নির্দেশেই পাকিস্তানের জেলে আটক তালেবানের প্রধান নেতা মোল্লা গণি বারাদাকে মুক্তি দেয়া হয় কয়েক বছর আগে এবং কার্যত একটি সমঝোতা কর্মসূচি চলছিল। এরই এখন-পর্যন্ত চূড়ান্ত ফল হলো তালেবানের বিজয়।  ফলে তালেবানদের এ ক্ষমতাদখল আফগান জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ন্যায্য সংগ্রামের কোনো বিজয় নয়। এটা হলো সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরিচালনায় মঞ্চস্থ এক নাটক, যাতে কুশিলবদের প্রত্যেকেই ক্ষমতার বড় অংশটি নিজেদের হাতে রাখতে চাইবে। শুধু জনগণের ক্ষমতা অর্জন ব্যতীত।    

 

তথাকথিত ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক সরকার’

ইতিমধ্যেই আফগান সরকার গঠন নিয়ে শুরু হয়েছে নানা দেন-দরবার। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক সরকার’ গঠনের প্রস্তাব মাঠে ছেড়েছে। সাম্রাজ্যবাদের সকল পক্ষের দালালদের ক্ষমতার অংশী করার পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী এই প্রকল্প হলো আফগানিস্তানে তাদের নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ যতটা সম্ভব বাড়ানো।  এই লাইনেই ইতিমধ্যে তালেবানদের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে, নারীদের উপর বাহ্যত বড় ধরনের আক্রমণ করা হচ্ছে না, এখনো পর্যন্ত (২১ আগস্ট) বিমানবন্দর মার্কিন সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেয়া হচ্ছে Ñ ইত্যাদির মাধ্যমে তালেবানের পক্ষ থেকে মার্কিনের সাথে এক ধরনের সমঝোতার আভাস পাওয়া যায়। একই সাথে তারা রাশিয়া-চীন গোষ্ঠীর সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, যার সুযোগ চীন-রাশিয়াও নেবে ও নিচ্ছে।  মার্কিনের অনুগত পরাজিত আফগান মুৎসুদ্দিরা তালেবানের ওপর মার্কিনী প্রভাব কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার একটা ভাগ হাতিয়ে নিতে চাইছে। প্রাক্তন মুজাহিদিনরাও পাকিস্তানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তালেবানদের ভিতরেও আছে নানা ধারা-উপধারা। সাধারণ ক্ষমার সুযোগে তালেবান বহির্ভূত অন্য দালালরা প্রশাসন বা এমনকি তালেবানের মধ্যেও বড় প্রভাব সৃষ্টি করবে। মার্কিন বনাম চীন-রাশিয়ার আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে বিভিন্ন দালালদের পুনর্গঠন চলবে। ফলে আগামীতে তালেবানের নেতৃত্বে অস্থায়ী বা জাতীয় সরকার যাই গঠিত হোক না কেন, সে সরকার যে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থারই সেবাদাস হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।  

প্রতিক্রিয়াশীলদের অন্তর্কলহ পুনরায় গৃহযুদ্ধে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়। এসবই আফগানিস্তানের ভবিষ্যতকে অন্ধকার করে রেখেছে।    

 

জনগণের মুক্তির জন্য ভিন্ন সংগ্রাম করতে হবে  

তালেবান যতই বলুক তাদের শাসনে নারীদের অমর্যাদা করা হবে না, বাস্তবে সেটা চলবেই। কারণ, তারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদকে প্রতিনিধিত্ব করে, তারা ধর্মবাদী আদর্শকে ধারণ করে। এর কিছু সংস্কার নারীদের কোনো মুক্তি দেবে না। যাকে ব্যবহার করতে চাইবে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালাল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ারা।  তালেবানরা ঘোষণা করেছে তারা গণতন্ত্র (পশ্চিমা ও মুৎসুদ্দি অর্থে) সরকার করবে না, ধর্মীয় সরকার করবে। যদিও তার চূড়ান্ত এখনো হয়নি। একেও গণতন্ত্রের নামে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের দালালরা ব্যবহার করতে চাইবে।  কিন্তু এ দুই প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদীরাও তাদের দালালদের দ্বারা কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়নি, ঘটাতে সক্ষমও নয়। ফলে নারী তো বটেই, সর্বোপরি কৃষকসহ ব্যাপক জনগণ সামন্ততান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়ন থেকে তাদের আমলেও মুক্তি পাননি।  ফলে কৃষক, নারী ও সাধারণ মধ্যবিত্ত এদের যেকোনো শাসনে শোষিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত হতে বাধ্য। তারা কোনো না কোনো রূপে তাদের সংগ্রাম চালাবেন। তাদের সকল পুরানো শত্রুর বিরুদ্ধেই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। আর সেজন্য বিপ্লবী নেতৃত্বÑ একটি বিপ্লবী পার্টি ও মুক্তিদাতা কর্মসূচি তাদের গড়ে তুলতে হবে, আঁকড়ে ধরতে হবে।  

তালেবান সামন্ততান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর, ধর্মীয়-ফ্যাসিবাদী গণশত্রু কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ দেশ-জাতি-জনগণের আরও বড় শত্রু

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
বুধবার, ২৫ আগস্ট ২০২১  |  অনলাইন সংস্করণ

আফগানিস্তানে দীর্ঘ দুই দশক পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সেনা প্রত্যাহার করা শুরু করলে মার্কিনের পুতুল ঘানি সরকার গত ১৫ আগস্ট পলায়ন করে। ফলে কোনো সামরিক বাধার সম্মুখীন না হয়েই তালেবান কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে। সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে আধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি দ্বারা সজ্জিত আফগান সেনাবাহিনীর তালেবানের কাছে এ হেন আত্মসমর্পণ মার্কিন-তালেবান-ঘানি সরকারের মধ্যে পর্দার আড়ালে এক ধরনের সমঝোতা বলে ধারণা করা অমূলক হবে না। যদিও বাহিনীর শক্তিতে বলিয়ান তালেবানই হতে বাধ্য রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান শরীক।    

 

তালেবান কারা? 

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অধীনে আফগানিস্তান ছিল একটি আধা সামন্ততান্ত্রিক-আধা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। গত শতাব্দীর ৭০-র দশকে রুশ সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে মার্কিনের দ্বন্দ্ব যখন তীব্র, তখন মার্কিনের মদদে রুশকে ঠেকাতে আফগানিস্তানে ইসলামী মৌলবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটে, যেটাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কমিউনিজম বিরোধী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে। ৮০-র দশকে সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। ব্যাপক পরিমাণ আফগানিরা দেশান্তরিত হয়ে পাকিস্তানের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। মার্কিন-পাকিস্তানের মদদ-সহায়তা-পরিচালনায় শরণার্থী ক্যাম্পগুলো পরিণত হয় জঙ্গিদের ট্রেনিং সেন্টারে। সোভিয়েত আগ্রাসন বিরোধী সংগ্রামে নানা জাতিগোত্রে বিভক্ত ইসলামী জিহাদিরা ছাড়াও প্রকৃত দেশপ্রেমিক-গণতন্ত্রকামী-বিপ্লবীরাও সামিল হয়েছিলেন। কিন্তু তারা প্রাধান্যকারী অবস্থানে পৌছতে ব্যর্থ হন। ৮০-র দশকের শেষে সোভিয়েত পিছু হটলে মার্কিন মদদে মুজাহিদিনরা ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু অচিরেই নানা কেন্দ্রে বিভক্ত মুজাহিদিনদের অন্তর্কলহে আফগানিস্তান জুড়ে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা ভিন্ন পথ গ্রহণ করে।  সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ব্যাপকভাবে মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষার্থীরা তালেব এলেম নামে পরিচিত; আর তা থেকে তালেবানের উৎপত্তি। এই তালেবানদের উত্থানের পেছনে ছিল মার্কিনের মদদ ও সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি ভূমিকা। মুজাহিদিনদের অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে আফগানিস্তানজুড়ে যখন চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে তখন তালেবানরা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা দখল করে।  কিন্তু ক্ষমতাসীন হয়ে মার্কিনের সাথে তাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সামন্ততান্ত্রিক ধর্মবাদ বনাম মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া বিকাশ - কোনপথে আফগানিস্তান আগাবে- এ প্রশ্নে মার্কিনের সাথে তালেবানের তিক্ততা বাড়তেই থাকে। যার সাথে মার্কিনের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের বিষয়টি যুক্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনায় মার্কিনীদের পক্ষ থেকে লাদেন/আল কায়েদাকে দায়ী করা ও লাদেনকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেয়ার অজুহাতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আফগানিস্তানে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালায়। ফলে মার্কিন মদদপুষ্ট, হাতেগড়া তালেবান মার্কিনের শত্রুতে পরিণত হয়। মার্কিন-ন্যাটো জোটের সৈন্যদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠা পায় মার্কিনের নতজানু বিভিন্ন সরকার।   

 

স্বাধীনচেতা আফগান জনগণের ন্যায্য সংগ্রাম  

আফগানিস্তানের ভৌগোলিক দুর্গমতা, ক্ষুদ্রক্ষুদ্র জাতিসত্তা, অনুন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা, সামন্তীয় ভাবধারার প্রধান্য সত্তে¡ও জাতি হিসেবে তাদের স্বাধীনচেতা মনোভাব বহুপূর্ব থেকেই সুবিদিত। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন দ্বারা কুক্ষিগত হলেও আফগানদের ব্রিটিশরা পদানত করতে পারেনি। লড়াকু এ আফগানরা গত ও এ শতাব্দীর রুশ ও মার্কিন আগ্রাসনকেও রুখে দাড়িয়েছেন, লড়াই করেছেন, যা ছিল ন্যায্য। আফগান জনগণের বীরত্মব্যঞ্জক লড়াই, আত্মত্যাগ সত্তে¡ও তাদের ন্যায্য মুক্তি সংগ্রামের নেতৃত্ব কুক্ষিগত করে ধর্মবাদী, মুৎসুদ্দি ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীলরা। যারা এক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অন্য সাম্রাজ্যবাদের পক্ষপুটে আশ্রয় নেয়। এভাবে জনগণের সংগ্রাম ব্যর্থ হয়। এবারও সেটাই ঘটেছে কিছুটা ভিন্নভাবে।    

 

চলমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী অন্তর্দ্বন্দ্বঃ ক্ষমতার পালাবদলে বড় অনুঘটক

আফগানিস্তানে ১৯৯৬ সালে তালেবান সরকারের প্রতিষ্ঠা ও এ শতাব্দীর প্রথমে তাদের পতনকালীন সময়ে ছিল মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের এক মেরু বিশ্ব। তারা গণশত্রæদের সকল পক্ষকেই যেভাবে নিজ কুক্ষিগত রাখতে পেরেছে বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে ভিন্ন।   দীর্ঘ দুই দশক পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ আজ মার্কিনের প্রধান মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। রুশ সাম্রাজ্যবাদও তার হৃত শক্তিমত্তা অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করেছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী অন্তর্দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধি, মার্কিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক-সামরিক সংকটের কারণে তারা বৈশ্বিক রাজনীতিতে তার পলিসি পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। মার্কিনের পক্ষে গোয়ার্তুমি করে আরও কিছুকাল আফগানিস্তানে টিকে থাকতে নিশ্চয়ই সক্ষম ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়া তার সুযোগ নিয়ে তালেবানদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করার মওকা পাবে। ফলে মার্কিনের পুরনো মিত্র তালেবানরা একেবারেই তার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া মার্কিন তার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে এখন পরিপূর্ণভাবে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত করতে চায়। যা গুরুতরভাবে ব্যাহত হবে যদি তারা আরো সুদীর্ঘদিন ধরে তালেবান ঠেকানোর ফলহীন কাজে আটকে থাকে।   তাই, এক ধরনের সম্মানজনক প্রস্থান ও তালেবানদের সাথেও এক ধরনের সমঝোতার মাধ্যমে তার স্বার্থ যতটা সম্ভব রক্ষাই হলো আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সৈন্য গুটিয়ে ফেলার অন্যতম কারণ। এ লক্ষ্যে তারা কয়েক বছর ধরেই কাজ করছে। তাদের নির্দেশেই পাকিস্তানের জেলে আটক তালেবানের প্রধান নেতা মোল্লা গণি বারাদাকে মুক্তি দেয়া হয় কয়েক বছর আগে এবং কার্যত একটি সমঝোতা কর্মসূচি চলছিল। এরই এখন-পর্যন্ত চূড়ান্ত ফল হলো তালেবানের বিজয়।  ফলে তালেবানদের এ ক্ষমতাদখল আফগান জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ন্যায্য সংগ্রামের কোনো বিজয় নয়। এটা হলো সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরিচালনায় মঞ্চস্থ এক নাটক, যাতে কুশিলবদের প্রত্যেকেই ক্ষমতার বড় অংশটি নিজেদের হাতে রাখতে চাইবে। শুধু জনগণের ক্ষমতা অর্জন ব্যতীত।    

 

তথাকথিত ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক সরকার’

ইতিমধ্যেই আফগান সরকার গঠন নিয়ে শুরু হয়েছে নানা দেন-দরবার। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক সরকার’ গঠনের প্রস্তাব মাঠে ছেড়েছে। সাম্রাজ্যবাদের সকল পক্ষের দালালদের ক্ষমতার অংশী করার পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী এই প্রকল্প হলো আফগানিস্তানে তাদের নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ যতটা সম্ভব বাড়ানো।  এই লাইনেই ইতিমধ্যে তালেবানদের পক্ষ থেকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে, নারীদের উপর বাহ্যত বড় ধরনের আক্রমণ করা হচ্ছে না, এখনো পর্যন্ত (২১ আগস্ট) বিমানবন্দর মার্কিন সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেয়া হচ্ছে Ñ ইত্যাদির মাধ্যমে তালেবানের পক্ষ থেকে মার্কিনের সাথে এক ধরনের সমঝোতার আভাস পাওয়া যায়। একই সাথে তারা রাশিয়া-চীন গোষ্ঠীর সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, যার সুযোগ চীন-রাশিয়াও নেবে ও নিচ্ছে।  মার্কিনের অনুগত পরাজিত আফগান মুৎসুদ্দিরা তালেবানের ওপর মার্কিনী প্রভাব কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার একটা ভাগ হাতিয়ে নিতে চাইছে। প্রাক্তন মুজাহিদিনরাও পাকিস্তানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তালেবানদের ভিতরেও আছে নানা ধারা-উপধারা। সাধারণ ক্ষমার সুযোগে তালেবান বহির্ভূত অন্য দালালরা প্রশাসন বা এমনকি তালেবানের মধ্যেও বড় প্রভাব সৃষ্টি করবে। মার্কিন বনাম চীন-রাশিয়ার আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে বিভিন্ন দালালদের পুনর্গঠন চলবে। ফলে আগামীতে তালেবানের নেতৃত্বে অস্থায়ী বা জাতীয় সরকার যাই গঠিত হোক না কেন, সে সরকার যে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থারই সেবাদাস হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।  

প্রতিক্রিয়াশীলদের অন্তর্কলহ পুনরায় গৃহযুদ্ধে পরিণত হওয়া অসম্ভব নয়। এসবই আফগানিস্তানের ভবিষ্যতকে অন্ধকার করে রেখেছে।    

 

জনগণের মুক্তির জন্য ভিন্ন সংগ্রাম করতে হবে  

তালেবান যতই বলুক তাদের শাসনে নারীদের অমর্যাদা করা হবে না, বাস্তবে সেটা চলবেই। কারণ, তারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদকে প্রতিনিধিত্ব করে, তারা ধর্মবাদী আদর্শকে ধারণ করে। এর কিছু সংস্কার নারীদের কোনো মুক্তি দেবে না। যাকে ব্যবহার করতে চাইবে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালাল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ারা।  তালেবানরা ঘোষণা করেছে তারা গণতন্ত্র (পশ্চিমা ও মুৎসুদ্দি অর্থে) সরকার করবে না, ধর্মীয় সরকার করবে। যদিও তার চূড়ান্ত এখনো হয়নি। একেও গণতন্ত্রের নামে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের দালালরা ব্যবহার করতে চাইবে।  কিন্তু এ দুই প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদীরাও তাদের দালালদের দ্বারা কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়নি, ঘটাতে সক্ষমও নয়। ফলে নারী তো বটেই, সর্বোপরি কৃষকসহ ব্যাপক জনগণ সামন্ততান্ত্রিক শোষণ-নিপীড়ন থেকে তাদের আমলেও মুক্তি পাননি।  ফলে কৃষক, নারী ও সাধারণ মধ্যবিত্ত এদের যেকোনো শাসনে শোষিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত হতে বাধ্য। তারা কোনো না কোনো রূপে তাদের সংগ্রাম চালাবেন। তাদের সকল পুরানো শত্রুর বিরুদ্ধেই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। আর সেজন্য বিপ্লবী নেতৃত্বÑ একটি বিপ্লবী পার্টি ও মুক্তিদাতা কর্মসূচি তাদের গড়ে তুলতে হবে, আঁকড়ে ধরতে হবে।  

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র