• বৃহঃস্পতিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪৩০
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে নতুন মেরুকরণ
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে নতুন মেরুকরণ

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

বৃহঃস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির আজ প্রায় দশ মাস ছুঁই ছুঁই। এটি রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পেলেও সত্যিকারভাবে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে রুশ সাম্রাজ্যবাদের। আর ইউক্রেন হচ্ছে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের বলি। রাশিয়া ইউক্রেনের অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি কিছুদিন যাবৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করছে। বিদ্যুৎ শূন্য করে সামনের শীতকালে ইউক্রেনকে কাবু করতে চাইছে। 

যুদ্ধে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা এককাট্টাভাবে ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আর রাশিয়া তার পুরোনো সাম্রাজ্য ফিরে পাবার আশায় বিভোর। যুদ্ধে রুশ মিত্ররা কূটনৈতিকভাবে রাশিয়ার পক্ষে ভূমিকা রাখছে। চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা এই পররাজ্যগ্রাসী যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছে। রাশিয়া এ যুদ্ধে ইউরোপকে মার্কিন বলয় থেকে মুক্ত করে বা তাতে ভাঙন ধরিয়ে নিজস্ব আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। ইউক্রেনে তার লক্ষ্য ক্রেমলিনের অনুগত কাউকে বসানো। যুদ্ধ জয়ের লক্ষ্যে রাশিয়া পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকিও দিচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা মার্কিন মুলুকেও এ যুদ্ধের উত্তাপ পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারী তথা অর্থনৈতিক মন্দা সেখানেও থাবা বসিয়েছে। ধনকুবের ইলন মাস্কের টুইটারই ছয় হাজার লোকের চাকরি ছাড়িয়েছে। সামরিক সহায়তায় ইউক্রেনকে হাজার হাজার কোটি ডলার (নভেম্বর পর্যন্ত ৫২০০ কোটি ডলার) প্রদান মার্কিনীরা ভাল চোখে দেখছে না। শুধু রিপাবলিকান শিবির নয় খোদ ডেমোক্রেটদেরও এখন কেউ কেউ বিরোধিতা করছে। বৈশ্বিক বিভিন্ন ফোরামে মার্কিন ও তার মিত্ররা রাশিয়ার উদ্দেশ্যে চড়া কথা বললেও গোপনে রাশিয়ার সাথে দরকষাকষি অব্যাহত আছে। তাইতো জেলেনস্কির অতি বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য ‘এ রাশিয়া নয়, আমরা নতুন রাশিয়ার সাথে আলোচনায় বসব’, খোদ তার প্রভুদেরই বিরাগভাজন করেছে। কারণ যুদ্ধের ভয়াবহতার আগুনে যখন নিজেরাই পুড়ছে, লাভের চেয়ে ক্ষতির অঙ্কটাই বেশি বলে অনুভূত হচ্ছে পশ্চিমা শিবিরে। তখন তাদের ভেতরেই যুদ্ধের কট্টর সমর্থকদের সাথে নিমরাজি বা যুদ্ধ বিরোধীদের দূরত্ব বাড়ছে। যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের ভেতর ফাটল ধরাচ্ছে। কোনো পক্ষই যুদ্ধের দ্রুত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা দেখতে না পাওয়ায় উভয় পক্ষই চাইছে যুদ্ধ থেকে দ্রুত সম্মানজনক প্রস্থান। তাই অহরহ ইউরোপীয় নেতাদের কিয়েভ সফর করতে দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে মার্কিনের পিছু হটা বৈশ্বিক মঞ্চে তার ভাবমূর্তিকে দুর্বল করেছে। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে চায়। একইসাথে রাশিয়াকে দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধের কবলে ঠেলে দিয়ে দুর্বল করাও ছিল তার লক্ষ্য। অন্যদিকে মার্কিনের প্রধান মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নও তার নিজস্ব শক্তিমত্তায় স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাদেরকে জানান দেয়া যে, মার্কিনের সহযোগিতা ছাড়া ইউরোপ অনিরাপদ। সুতরাং তাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই আমেরিকার সাথে গাঁটছড়া বাধা ছাড়া ইউরোপের গত্যন্তর নেই। তারপরও ইউরোপের কেউ কেউ মার্কিনের প্রতি তাদের এই নতজানু নীতি থেকে বের হয়ে আসতে চায়। মার্কিনের ইন্ধনে যুদ্ধের ধাক্কা গোটা ইউরোপকে যেভাবে কাঁপিয়ে তুলেছে তাতে ইউরোপের জনগণও আমেরিকার প্রতি চরমভাবে রুষ্ট। ইতিমধ্যেই ইউরোপ বুঝে উঠেছে যুদ্ধে আমেরিকার তুলনায় তাদেরকেই বেশি মূল্য চুকাতে হচ্ছে। 

ইউক্রেন ইস্যুতে মার্কিন বিরোধী অবস্থান থেকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী চীন কূটনৈতিকভাবে রাশিয়াকে সমর্থন যোগাচ্ছে। চীন সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও ধীরে চলো নীতিতে বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিক-সামরিক আধিপত্য বিস্তারে মগ্ন। তাবৎ বিশ্ব যখন যুদ্ধ জ্বরে কম-বেশি কাহিল, চীনের গায়ে এর আঁচড়টি পর্যন্ত লাগেনি। বরং  সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যকার কামড়াকামড়িকে কাজে লাগিয়ে সে আর্থিক বা রাজনৈতিকভাবে অনেকটা লাভবান হয়েছে। এশিয়া-আফ্রিকার পরে চীন এখন মধ্যপ্রাচ্যেও তার প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছে। সৌদির ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীন সক্রিয় সহায়তা দিচ্ছে। বিনিময়ে সৌদির কাছ থেকে সে পাচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী থাকা সত্ত্বেও সৌদির আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল। ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় তা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্য ক্ষুণ্ন হয়, তাই আমেরিকা সৌদিকে তাদের অগ্রসর প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হস্তান্তর করবে না বলে গত বছর সেপ্টেম্বরে জানিয়ে দেয়। খাসোগী হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজের সরাসরি সম্পৃক্ততার খবর প্রকাশ পেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদির পক্ষ নেয়নি। চীন এটিকে সৌদির অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যায়। ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জালানি সংকটের সময় বাইডেন প্রশাসন ওপেক প্লাসের প্রতি তেল উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললেও সৌদি তাতে কর্ণপাত করেনি, বাইডেনের হুমকি সত্ত্বেও। যা সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক ফাটলের প্রকাশ। চীন যেটাকে নিঃসন্দেহে কাজে লাগাচ্ছে। এসব ঘটনা সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের মধ্যে নতুন মেরুকরণেরই আভাস। 

মার্কিনও বসে নেই। চীনকে মোকাবেলায় তারা তাইওয়ান ইস্যুকে ব্যবহার করছে। চীনা রাষ্ট্রকে আপাত অনেকটা সুসংহত মনে হলেও জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নেই। জনগণের ভেতর ধুমায়িত ক্ষোভ যে কোনো ঘটনায় বিস্ফোরণ্মুখ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কমিউনিস্ট শাসনের নামে সেখানে আসলে চলছে পুঁজিবাদী একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসন। এর বিরুদ্ধে চীনের জনগণের যে কোনো ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে চীন বিরোধী পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে উন্মুখ। তাইওয়ান, হংকং, উইঘুর, করোনা ইস্যুগুলোতে এটাই দেখা যাচ্ছে।

গত শতাব্দীর ৮০-দশকের পর মার্কিনের নেতৃত্বে এক মেরু বিশ্বের বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদ আজ বহু কেন্দ্রে বিভক্ত। মার্কিন নিরঙ্কুশ এককেন্দ্রীক আধিপত্য হারালেও একটা কেন্দ্রের অধিপতি হিসেবে সে ভূমিকা রাখছে। মার্কিনের সাথে ই.ইউ, জাপান, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল থাকলেও এ সম্পর্কগুলো আগের মতো সরল নয়। জার্মানি, ফ্রান্স, ইটালির মতো কেউ কেউ বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাবমুক্তি কাটাতে চায়। যুদ্ধে ইউরোপের কেউ কেউ রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের বিপক্ষে। অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, ভেনিজুয়েলা, সিরিয়া একদিকে অবস্থান করলেও ন্যাটোর মতো কোনো সামরিক জোট হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারে নি। যা ন্যাটো জোটকে চীনা বলয় থেকে কিছু মাত্রায় এগিয়ে রেখেছে। তারপরেও বৈশ্বিক জটিল রাজনীতির সমীকরণে মার্কিন মিত্ররা আর একই সুরে রেওয়াজ করছে না। মার্কিনের সাথে মার্চ করার আগে তাদের নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসেব নিকেশ করছে। কম-বেশি মাত্রায় মার্কিনের প্রভাব বলয় সংকুচিত হচ্ছে। সে সুযোগে চীন ধীর লয়ে তার প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে। যা বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থায় পুনর্বিন্যাসের জরুরিত্বকে সামনে আনছে। এবারের জলবায়ু সম্মেলনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাবে ৭৩টি দেশ পক্ষে এবং ১৪টি দেশ বিপক্ষে ভোট দিলেও বাংলাদেশসহ বিরাট সংখ্যক দেশ ভোট দানে বিরত ছিল। এসবই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় নয়া মেরুকরণের আভাস। যা কখনও কখনও মার্কিন-চীনকে মুখোমুখি করে তুলছে। হাসিনা পর্যন্ত আমেরিকাকে খুনির লালনকর্তা বলার সাহস দেখাচ্ছে। ভারতের প্রভাবে রাশিয়ার সাথে ব্যালেন্স করার চেষ্টাতেই সে এটা করছে। বিশ্ব-ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে মার্কিনী একক কর্তৃত্বে যে কতখানি আলগা হয়ে গেছে এসব তার নমুনা। 

এই নয়া মেরুকরণে বিশ্ব রাজনীতিতে মোড়ল মার্কিনই থাকবে, না তার স্থলাবিষিক্ত হবে চীন বা অন্য কেউ তার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আর এ সমস্যা সমাধানে সাম্রাজ্যবাদের কাছে যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোনো পথ খোলা নেই– হোক সেটা আঞ্চলিক যুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধ। এমনকি সেটা সীমিত বা সার্বিক মুখোমুখি লড়াইয়েও পর্যবসিত হতে পারে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যা প্রকাশিত। লেনিন বহুপূর্বেই বলেছিলেন– ‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের মুমূর্ষু স্তর’ আর ‘সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ’। তাই আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের নয়া মেরুকরণের অংশ না হয়ে যে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা সকল সংকটের মূল, তাকে উচ্ছেদের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে পরিচালিত ন্যায় যুদ্ধই পারে বিশ্বকে চিরতরে যুদ্ধ মুক্ত করতে। 

–  ৬ ডিসেম্বর ’২২

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে নতুন মেরুকরণ

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
বৃহঃস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির আজ প্রায় দশ মাস ছুঁই ছুঁই। এটি রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পেলেও সত্যিকারভাবে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে মার্কিনের নেতৃত্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে রুশ সাম্রাজ্যবাদের। আর ইউক্রেন হচ্ছে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের বলি। রাশিয়া ইউক্রেনের অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি কিছুদিন যাবৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করছে। বিদ্যুৎ শূন্য করে সামনের শীতকালে ইউক্রেনকে কাবু করতে চাইছে। 

যুদ্ধে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা এককাট্টাভাবে ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আর রাশিয়া তার পুরোনো সাম্রাজ্য ফিরে পাবার আশায় বিভোর। যুদ্ধে রুশ মিত্ররা কূটনৈতিকভাবে রাশিয়ার পক্ষে ভূমিকা রাখছে। চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা এই পররাজ্যগ্রাসী যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছে। রাশিয়া এ যুদ্ধে ইউরোপকে মার্কিন বলয় থেকে মুক্ত করে বা তাতে ভাঙন ধরিয়ে নিজস্ব আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। ইউক্রেনে তার লক্ষ্য ক্রেমলিনের অনুগত কাউকে বসানো। যুদ্ধ জয়ের লক্ষ্যে রাশিয়া পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকিও দিচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা মার্কিন মুলুকেও এ যুদ্ধের উত্তাপ পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারী তথা অর্থনৈতিক মন্দা সেখানেও থাবা বসিয়েছে। ধনকুবের ইলন মাস্কের টুইটারই ছয় হাজার লোকের চাকরি ছাড়িয়েছে। সামরিক সহায়তায় ইউক্রেনকে হাজার হাজার কোটি ডলার (নভেম্বর পর্যন্ত ৫২০০ কোটি ডলার) প্রদান মার্কিনীরা ভাল চোখে দেখছে না। শুধু রিপাবলিকান শিবির নয় খোদ ডেমোক্রেটদেরও এখন কেউ কেউ বিরোধিতা করছে। বৈশ্বিক বিভিন্ন ফোরামে মার্কিন ও তার মিত্ররা রাশিয়ার উদ্দেশ্যে চড়া কথা বললেও গোপনে রাশিয়ার সাথে দরকষাকষি অব্যাহত আছে। তাইতো জেলেনস্কির অতি বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য ‘এ রাশিয়া নয়, আমরা নতুন রাশিয়ার সাথে আলোচনায় বসব’, খোদ তার প্রভুদেরই বিরাগভাজন করেছে। কারণ যুদ্ধের ভয়াবহতার আগুনে যখন নিজেরাই পুড়ছে, লাভের চেয়ে ক্ষতির অঙ্কটাই বেশি বলে অনুভূত হচ্ছে পশ্চিমা শিবিরে। তখন তাদের ভেতরেই যুদ্ধের কট্টর সমর্থকদের সাথে নিমরাজি বা যুদ্ধ বিরোধীদের দূরত্ব বাড়ছে। যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের ভেতর ফাটল ধরাচ্ছে। কোনো পক্ষই যুদ্ধের দ্রুত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা দেখতে না পাওয়ায় উভয় পক্ষই চাইছে যুদ্ধ থেকে দ্রুত সম্মানজনক প্রস্থান। তাই অহরহ ইউরোপীয় নেতাদের কিয়েভ সফর করতে দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে মার্কিনের পিছু হটা বৈশ্বিক মঞ্চে তার ভাবমূর্তিকে দুর্বল করেছে। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে চায়। একইসাথে রাশিয়াকে দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধের কবলে ঠেলে দিয়ে দুর্বল করাও ছিল তার লক্ষ্য। অন্যদিকে মার্কিনের প্রধান মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নও তার নিজস্ব শক্তিমত্তায় স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বৈশ্বিক রাজনীতিতে তার প্রভাব বাড়াতে চায়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাদেরকে জানান দেয়া যে, মার্কিনের সহযোগিতা ছাড়া ইউরোপ অনিরাপদ। সুতরাং তাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই আমেরিকার সাথে গাঁটছড়া বাধা ছাড়া ইউরোপের গত্যন্তর নেই। তারপরও ইউরোপের কেউ কেউ মার্কিনের প্রতি তাদের এই নতজানু নীতি থেকে বের হয়ে আসতে চায়। মার্কিনের ইন্ধনে যুদ্ধের ধাক্কা গোটা ইউরোপকে যেভাবে কাঁপিয়ে তুলেছে তাতে ইউরোপের জনগণও আমেরিকার প্রতি চরমভাবে রুষ্ট। ইতিমধ্যেই ইউরোপ বুঝে উঠেছে যুদ্ধে আমেরিকার তুলনায় তাদেরকেই বেশি মূল্য চুকাতে হচ্ছে। 

ইউক্রেন ইস্যুতে মার্কিন বিরোধী অবস্থান থেকে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী চীন কূটনৈতিকভাবে রাশিয়াকে সমর্থন যোগাচ্ছে। চীন সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও ধীরে চলো নীতিতে বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিক-সামরিক আধিপত্য বিস্তারে মগ্ন। তাবৎ বিশ্ব যখন যুদ্ধ জ্বরে কম-বেশি কাহিল, চীনের গায়ে এর আঁচড়টি পর্যন্ত লাগেনি। বরং  সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যকার কামড়াকামড়িকে কাজে লাগিয়ে সে আর্থিক বা রাজনৈতিকভাবে অনেকটা লাভবান হয়েছে। এশিয়া-আফ্রিকার পরে চীন এখন মধ্যপ্রাচ্যেও তার প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছে। সৌদির ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীন সক্রিয় সহায়তা দিচ্ছে। বিনিময়ে সৌদির কাছ থেকে সে পাচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী থাকা সত্ত্বেও সৌদির আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল। ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় তা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্য ক্ষুণ্ন হয়, তাই আমেরিকা সৌদিকে তাদের অগ্রসর প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হস্তান্তর করবে না বলে গত বছর সেপ্টেম্বরে জানিয়ে দেয়। খাসোগী হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজের সরাসরি সম্পৃক্ততার খবর প্রকাশ পেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদির পক্ষ নেয়নি। চীন এটিকে সৌদির অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যায়। ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জালানি সংকটের সময় বাইডেন প্রশাসন ওপেক প্লাসের প্রতি তেল উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললেও সৌদি তাতে কর্ণপাত করেনি, বাইডেনের হুমকি সত্ত্বেও। যা সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক ফাটলের প্রকাশ। চীন যেটাকে নিঃসন্দেহে কাজে লাগাচ্ছে। এসব ঘটনা সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের মধ্যে নতুন মেরুকরণেরই আভাস। 

মার্কিনও বসে নেই। চীনকে মোকাবেলায় তারা তাইওয়ান ইস্যুকে ব্যবহার করছে। চীনা রাষ্ট্রকে আপাত অনেকটা সুসংহত মনে হলেও জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নেই। জনগণের ভেতর ধুমায়িত ক্ষোভ যে কোনো ঘটনায় বিস্ফোরণ্মুখ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কমিউনিস্ট শাসনের নামে সেখানে আসলে চলছে পুঁজিবাদী একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসন। এর বিরুদ্ধে চীনের জনগণের যে কোনো ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে চীন বিরোধী পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে উন্মুখ। তাইওয়ান, হংকং, উইঘুর, করোনা ইস্যুগুলোতে এটাই দেখা যাচ্ছে।

গত শতাব্দীর ৮০-দশকের পর মার্কিনের নেতৃত্বে এক মেরু বিশ্বের বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদ আজ বহু কেন্দ্রে বিভক্ত। মার্কিন নিরঙ্কুশ এককেন্দ্রীক আধিপত্য হারালেও একটা কেন্দ্রের অধিপতি হিসেবে সে ভূমিকা রাখছে। মার্কিনের সাথে ই.ইউ, জাপান, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল থাকলেও এ সম্পর্কগুলো আগের মতো সরল নয়। জার্মানি, ফ্রান্স, ইটালির মতো কেউ কেউ বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাবমুক্তি কাটাতে চায়। যুদ্ধে ইউরোপের কেউ কেউ রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের বিপক্ষে। অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, ভেনিজুয়েলা, সিরিয়া একদিকে অবস্থান করলেও ন্যাটোর মতো কোনো সামরিক জোট হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারে নি। যা ন্যাটো জোটকে চীনা বলয় থেকে কিছু মাত্রায় এগিয়ে রেখেছে। তারপরেও বৈশ্বিক জটিল রাজনীতির সমীকরণে মার্কিন মিত্ররা আর একই সুরে রেওয়াজ করছে না। মার্কিনের সাথে মার্চ করার আগে তাদের নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসেব নিকেশ করছে। কম-বেশি মাত্রায় মার্কিনের প্রভাব বলয় সংকুচিত হচ্ছে। সে সুযোগে চীন ধীর লয়ে তার প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে। যা বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থায় পুনর্বিন্যাসের জরুরিত্বকে সামনে আনছে। এবারের জলবায়ু সম্মেলনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাবে ৭৩টি দেশ পক্ষে এবং ১৪টি দেশ বিপক্ষে ভোট দিলেও বাংলাদেশসহ বিরাট সংখ্যক দেশ ভোট দানে বিরত ছিল। এসবই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় নয়া মেরুকরণের আভাস। যা কখনও কখনও মার্কিন-চীনকে মুখোমুখি করে তুলছে। হাসিনা পর্যন্ত আমেরিকাকে খুনির লালনকর্তা বলার সাহস দেখাচ্ছে। ভারতের প্রভাবে রাশিয়ার সাথে ব্যালেন্স করার চেষ্টাতেই সে এটা করছে। বিশ্ব-ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে মার্কিনী একক কর্তৃত্বে যে কতখানি আলগা হয়ে গেছে এসব তার নমুনা। 

এই নয়া মেরুকরণে বিশ্ব রাজনীতিতে মোড়ল মার্কিনই থাকবে, না তার স্থলাবিষিক্ত হবে চীন বা অন্য কেউ তার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আর এ সমস্যা সমাধানে সাম্রাজ্যবাদের কাছে যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোনো পথ খোলা নেই– হোক সেটা আঞ্চলিক যুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধ। এমনকি সেটা সীমিত বা সার্বিক মুখোমুখি লড়াইয়েও পর্যবসিত হতে পারে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যা প্রকাশিত। লেনিন বহুপূর্বেই বলেছিলেন– ‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের মুমূর্ষু স্তর’ আর ‘সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ’। তাই আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের নয়া মেরুকরণের অংশ না হয়ে যে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা সকল সংকটের মূল, তাকে উচ্ছেদের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে পরিচালিত ন্যায় যুদ্ধই পারে বিশ্বকে চিরতরে যুদ্ধ মুক্ত করতে। 

–  ৬ ডিসেম্বর ’২২

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র