• বৃহঃস্পতিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪৩০
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
‘বাসদ’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ছাত্রজোট ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি
‘বাসদ’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ছাত্রজোট ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

বুধবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩  |  অনলাইন সংস্করণ

সম্প্রতি বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ খালেকুজ্জামান)-এর একজন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ কয়েকজন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠে। 

ঘটনাটি সামনে আসে ৪ জুন ২০২৩, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী দিলশানা পারুলের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে। তিনি বাসদ নেতাদের বিরুদ্ধে দু'টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ পান বলে জানান। এরপর ৭ জুন ২০২৩, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শোভন রহমানও তার ফেসবুকে বাসদ-নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও প্রতারণার অভিযোগ আনেন। এর পরই প্রকাশ্যে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। 

১০ জুন ২০২৩, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ) শোভন রহমানের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে শোভন রহমানের আনীত অভিযোগগুলোকে তাদের দিক থেকে খণ্ডন করা হয়েছে। তারা জানান যে, তাদের এ সমস্যা সমাধানের জন্য ৪-৬ জুন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু শোভন রহমান তাতে অনুপস্থিত থাকেন। তার আগে প্রায় ৬ মাস ধরেই তিনি সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন বলেও তারা জানান। শোভন রহমানের সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয়তা ও সভায়  অনুপস্থিত থাকার কারণ না দর্শানোর প্রেক্ষিতে তাকে পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। এরপরই শোভন রহমান বাসদের বিরুদ্ধে ফেসবুক স্ট্যাটাসটি দেন। 

এর পর থেকেই বহু সূত্র থেকে বহু বুদ্ধিজীবী ও নারী অধিকারকর্মী বা প্রাক্তন বাসদ-কর্মীরা ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস দিতে থাকেন। যার মূল বক্তব্য ছিল বাসদ একটি নারী নিপীড়নকারী সংগঠন, তাদের নারী-নিপীড়নের নিন্দা করা দরকার, অভিযোগগুলোর তদন্তে কমিশন গঠন করা দরকার, অপরাধীদের বিচার হওয়া দরকার– ইত্যাদি। কেউ কেউ বামপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। বাসদ-বিরোধী এই ব্যাপক ফেসবুক প্রচারণার  সাথে শোভন রহমান বা এ ধরনের আরো অনেকের পরিকল্পিত তৎপরতা ও সক্রিয়তা ছিল এমনটা ধারণা করা অমূলক নয়।

এ সমস্যা আমাদের ৮-দলীয় ছাত্র-জোটেও আলোচনার সৃষ্টি করে। যার একটি শরিক সংগঠন হলো বাসদ-ছাত্রফ্রন্ট।

এই ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’ থেকে প্রথমে বাসদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিন্দা জানানোর মতো বক্তব্যের খসড়া আসে। কিন্তু  ফ্রণ্ট(মার্কসবাদী) ও আমাদের বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের বিরোধিতার কারণে সে বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়নি। তবে অন্য একটি বিবৃতি দেয়া হয়, যাতে আনীত অভিযোগগুলো তদন্তের দাবি করা হয়। এতেও বেশ ত্রুটি আছে বলেই ছাত্র-যুব আন্দোলন মনে করে। তবে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন পর্যায়ক্রমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিজ নিজ সংগঠনের নামে বাসদের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক বক্তব্য প্রচার করে।

জোটের বা শরীক বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ধরনের তৎপরতার প্রেক্ষিতে বাসদ-ছাত্রফ্রন্ট জোট ত্যাগ করে।

* জোটের শরীক একটি সংগঠন ও/বা তার মাতৃ পার্টির বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল সেগুলো হলো—

১। সমস্যাগুলো বাসদের অভ্যন্তরীণ দাবি করে তারা এসব বিতর্ককে এড়াতে চাচ্ছে কিনা। নাকি তারা অভ্যন্তরীণ ভাবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে বা নিয়ে থাকে।

২। আনীত অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে সেই পার্টি/সংগঠনের অবস্থান কী?

৩। আনীত অভিযোগগুলো কিছু ব্যক্তির কথিত ত্রুটির বিরুদ্ধে, নাকি সেগুলো ঐ পার্টির বিরুদ্ধে?

৪। কথিত ঘটনাগুলোকে দেখার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিটা কী? সামাজিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক, না বুর্জোয়া, না মার্কসবাদী?

৫। যারা এসব অভিযোগ আনছেন তাদের রাজনৈতিক অভিমত/অবস্থানটা কী?

৬। এ বিতর্কের রাজনৈতিক মর্মবস্তুটা কী?

৭। যৌন/নারী প্রশ্নে দুই পক্ষের লাইনগত অবস্থান ও পার্থক্যটি কী?

–ইত্যাদি।

সমস্যা হলো এসব বিষয়ে কোনো রকম সুগভীর আলোচনা ব্যতিরেকে, সংশ্লিষ্ট পার্টি/সংগঠনের বক্তব্যকে আমলে না নিয়ে, বিশেষত তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কার্যক্রমকে প্রাধান্য না দিয়ে, একটি বামপন্থি রাজনৈতিক পার্টির  বিরুদ্ধে এ ধরনের তৎপরতা খুবই বিপজ্জনক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা ও অবিচক্ষণতার প্রকাশ। বাসদ-ছাত্রফ্রন্টও রাজনৈতিক ভাবে এ অভিযোগকে মোকাবেলা করা অব্যাহত না রেখে জোট ত্যাগ করায় তাদের দুর্বল রাজনৈতিক চেতনা ও বিচ্যুতিরই প্রকাশ ঘটেছে। যা ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে বিরাট ক্ষতি করেছে।

* রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সামনে না এনে যৌন প্রশ্নকে সামনে আনার মাধ্যমে একটি পার্টি বা ব্যক্তিকে সহজেই কালিমালিপ্ত করা যায়। এটি একটি বুর্জোয়া/পেটিবুর্জোয়া ধারা। সামাজিক মূল্যবোধ তাকে দৃঢ় সমর্থন তো করেই। তদুপরি বামপন্থি আন্দোলনের যারা শত্রু, এনজিও-রা বা বিশেষ করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা তাকে স্বাগত জানাতে উন্মুখ থাকবে। এসব বিষয়ে সচেতন থাকাটা অতীব জরুরি।

* পাশাপাশি আমরা মনেকরি অভিযোগকারী যারা যৌন-নিপীড়নে নিপীড়িত হয়েছেন বলছেন বা বোধ করছেন তাদের অধিকার রয়েছে প্রতিবাদ করার। সেজন্য তারা যে ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ প্রয়োজন মনে করেন সেটা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু তার সাথে একটি রাজনৈতিক পার্টির বিরোধিতাকে যুক্তিযুক্ত করা যায় না। বা তার সাথে অন্য বামপন্থিরাও তাল দিতে পারে না। 

* একটি সংগঠনের সামগ্রিক মতাদর্শগত-রাজনৈতিক লাইনের অধীনস্ত একটি বিষয় হলো নারী প্রশ্ন। প্রেম-বিয়ে-যৌনতা প্রশ্নে বাসদের অনুশীলন সম্পর্কে আমরা ভাল অবগত না হলেও আমরা অনুভব করি তাদের অবস্থান ও অনুশীলনের সাথে আমাদের পার্থক্য রয়েছে। তেমনি অন্যান্য বামপন্থি সংগঠনের সামগ্রিক রাজনৈতিক-মতাদর্শগত লাইনের অংশ হিসেবে এ প্রশ্নে তাদের সাথেও আমাদের পার্থক্য রয়েছে। 

যা খুবই সম্ভব যে, বাসদের পার্টিতে যুক্ত মধ্যবিত্ত তরুণ/তরুণীরা এমনকি নেতারাও সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তির উপর এক ধরনের বুর্জোয়া প্রলেপ মাখানো লাইন অনুশীলন করেছেন/করছেন। ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌন বিচ্যুতি ঘটা ও সেগুলোর মোকাবেলায় ভুল পদ্ধতি অবলম্বন অসম্ভব নয়। যা বর্তমান সমাজ থেকে অর্জিত ক্রটি।

* পরিবার-বিয়ে-যৌন প্রশ্নে সামাজিক নৈতিকতাকে বিপ্লবীরা গ্রহণ করে না। পাশাপাশি নতুন বৈপ্লবিক নৈতিকতা বিকশিত করা, তাতে নেতা-কর্মী ও জনগণকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষিত করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাতে কেন্দ্রবিন্দু হবে বিপ্লবের স্বার্থ, বিপ্লবী সম্পর্ক, অগ্রসর প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষত নারী প্রশ্নে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। সংস্কারবাদী পেটিবুর্জোয়া পার্টিগুলোতে এই প্রশ্নে সামাজিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধকে বর্জন করাটা দুর্বল হতে বাধ্য। কাজেই সেখানে একদিকে থেকে যায় সামাজিক পশ্চাৎপদ মূল্যবোধ, অন্যদিকে এর যা কিছু প্রতিস্থাপন তা হয় কিছু ক্ষেত্রে ত্যাগের মানবতাবাদী মতাদর্শ দ্বারা, অথবা বুর্জোয়া মূল্যবোধ দ্বারা। এগুলো প্রকৃত বিপ্লবী মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিকাশ করতে পারে না। তাই বিবিধ কারণে বাসদ থেকে দলছুট কর্মীরা সামাজিক মূল্যবোধকে পুঁজি করেই মাঠে নামেন। মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা অসম্ভব।

 

বর্তমানে ভারত-ফিলিপাইনে, আগে পেরু-নেপালে, মাওবাদী আন্দোলনে, হাজার হাজার তরুণ-তরুণী বিপ্লবী ও যোদ্ধা একত্রে বিপ্লবের জন্য কাজ করেছেন ও করছেন। তাদের মধ্যে যৌন ও নারী প্রশ্নে এক অগ্রসর ও উচ্চ নৈতিকতা কাজ করে। সেখানেও বিচ্যুতি কখনো বা কারো হয় না বা হতে পারে না তা নয়। কিন্তু প্রকৃত বিপ্লবী পার্টিগুলো রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে উচ্চতর মার্কসবাদী আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গিতে সেগুলোকে মীমাংসা করে থাকেন। এভাবে তারা যেমন নিজেদেরকে পুনর্গঠিত করেন, তেমনি পুনর্গঠন করেন সমাজ ও জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির। সুতরাং যারা বাসদে ছিলেন বা রয়েছেন, কিন্তু আন্তরিকভাবে বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী, যারা ক্ষুদে বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া ব্যক্তি-স্বার্থকেন্দ্রিক জীবনকে মহিমান্বিত করে প্রগতিশীল রাজনীতিকে কলঙ্কিত করতে চান না, তাদেরকে মাওবাদের আদর্শে শিক্ষিত হতে হবে এবং প্রকৃত বিপ্লবী কাজে জীবন উৎসর্গ করতে হবে।

‘বাসদ’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ছাত্রজোট ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
বুধবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩  |  অনলাইন সংস্করণ

সম্প্রতি বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ খালেকুজ্জামান)-এর একজন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ কয়েকজন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠে। 

ঘটনাটি সামনে আসে ৪ জুন ২০২৩, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী দিলশানা পারুলের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে। তিনি বাসদ নেতাদের বিরুদ্ধে দু'টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ পান বলে জানান। এরপর ৭ জুন ২০২৩, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শোভন রহমানও তার ফেসবুকে বাসদ-নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও প্রতারণার অভিযোগ আনেন। এর পরই প্রকাশ্যে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। 

১০ জুন ২০২৩, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ) শোভন রহমানের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে শোভন রহমানের আনীত অভিযোগগুলোকে তাদের দিক থেকে খণ্ডন করা হয়েছে। তারা জানান যে, তাদের এ সমস্যা সমাধানের জন্য ৪-৬ জুন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু শোভন রহমান তাতে অনুপস্থিত থাকেন। তার আগে প্রায় ৬ মাস ধরেই তিনি সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন বলেও তারা জানান। শোভন রহমানের সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয়তা ও সভায়  অনুপস্থিত থাকার কারণ না দর্শানোর প্রেক্ষিতে তাকে পদ থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। এরপরই শোভন রহমান বাসদের বিরুদ্ধে ফেসবুক স্ট্যাটাসটি দেন। 

এর পর থেকেই বহু সূত্র থেকে বহু বুদ্ধিজীবী ও নারী অধিকারকর্মী বা প্রাক্তন বাসদ-কর্মীরা ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস দিতে থাকেন। যার মূল বক্তব্য ছিল বাসদ একটি নারী নিপীড়নকারী সংগঠন, তাদের নারী-নিপীড়নের নিন্দা করা দরকার, অভিযোগগুলোর তদন্তে কমিশন গঠন করা দরকার, অপরাধীদের বিচার হওয়া দরকার– ইত্যাদি। কেউ কেউ বামপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। বাসদ-বিরোধী এই ব্যাপক ফেসবুক প্রচারণার  সাথে শোভন রহমান বা এ ধরনের আরো অনেকের পরিকল্পিত তৎপরতা ও সক্রিয়তা ছিল এমনটা ধারণা করা অমূলক নয়।

এ সমস্যা আমাদের ৮-দলীয় ছাত্র-জোটেও আলোচনার সৃষ্টি করে। যার একটি শরিক সংগঠন হলো বাসদ-ছাত্রফ্রন্ট।

এই ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’ থেকে প্রথমে বাসদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিন্দা জানানোর মতো বক্তব্যের খসড়া আসে। কিন্তু  ফ্রণ্ট(মার্কসবাদী) ও আমাদের বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের বিরোধিতার কারণে সে বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়নি। তবে অন্য একটি বিবৃতি দেয়া হয়, যাতে আনীত অভিযোগগুলো তদন্তের দাবি করা হয়। এতেও বেশ ত্রুটি আছে বলেই ছাত্র-যুব আন্দোলন মনে করে। তবে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন পর্যায়ক্রমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিজ নিজ সংগঠনের নামে বাসদের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক বক্তব্য প্রচার করে।

জোটের বা শরীক বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ধরনের তৎপরতার প্রেক্ষিতে বাসদ-ছাত্রফ্রন্ট জোট ত্যাগ করে।

* জোটের শরীক একটি সংগঠন ও/বা তার মাতৃ পার্টির বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল সেগুলো হলো—

১। সমস্যাগুলো বাসদের অভ্যন্তরীণ দাবি করে তারা এসব বিতর্ককে এড়াতে চাচ্ছে কিনা। নাকি তারা অভ্যন্তরীণ ভাবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে বা নিয়ে থাকে।

২। আনীত অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে সেই পার্টি/সংগঠনের অবস্থান কী?

৩। আনীত অভিযোগগুলো কিছু ব্যক্তির কথিত ত্রুটির বিরুদ্ধে, নাকি সেগুলো ঐ পার্টির বিরুদ্ধে?

৪। কথিত ঘটনাগুলোকে দেখার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিটা কী? সামাজিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক, না বুর্জোয়া, না মার্কসবাদী?

৫। যারা এসব অভিযোগ আনছেন তাদের রাজনৈতিক অভিমত/অবস্থানটা কী?

৬। এ বিতর্কের রাজনৈতিক মর্মবস্তুটা কী?

৭। যৌন/নারী প্রশ্নে দুই পক্ষের লাইনগত অবস্থান ও পার্থক্যটি কী?

–ইত্যাদি।

সমস্যা হলো এসব বিষয়ে কোনো রকম সুগভীর আলোচনা ব্যতিরেকে, সংশ্লিষ্ট পার্টি/সংগঠনের বক্তব্যকে আমলে না নিয়ে, বিশেষত তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কার্যক্রমকে প্রাধান্য না দিয়ে, একটি বামপন্থি রাজনৈতিক পার্টির  বিরুদ্ধে এ ধরনের তৎপরতা খুবই বিপজ্জনক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা ও অবিচক্ষণতার প্রকাশ। বাসদ-ছাত্রফ্রন্টও রাজনৈতিক ভাবে এ অভিযোগকে মোকাবেলা করা অব্যাহত না রেখে জোট ত্যাগ করায় তাদের দুর্বল রাজনৈতিক চেতনা ও বিচ্যুতিরই প্রকাশ ঘটেছে। যা ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে বিরাট ক্ষতি করেছে।

* রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সামনে না এনে যৌন প্রশ্নকে সামনে আনার মাধ্যমে একটি পার্টি বা ব্যক্তিকে সহজেই কালিমালিপ্ত করা যায়। এটি একটি বুর্জোয়া/পেটিবুর্জোয়া ধারা। সামাজিক মূল্যবোধ তাকে দৃঢ় সমর্থন তো করেই। তদুপরি বামপন্থি আন্দোলনের যারা শত্রু, এনজিও-রা বা বিশেষ করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা তাকে স্বাগত জানাতে উন্মুখ থাকবে। এসব বিষয়ে সচেতন থাকাটা অতীব জরুরি।

* পাশাপাশি আমরা মনেকরি অভিযোগকারী যারা যৌন-নিপীড়নে নিপীড়িত হয়েছেন বলছেন বা বোধ করছেন তাদের অধিকার রয়েছে প্রতিবাদ করার। সেজন্য তারা যে ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ প্রয়োজন মনে করেন সেটা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু তার সাথে একটি রাজনৈতিক পার্টির বিরোধিতাকে যুক্তিযুক্ত করা যায় না। বা তার সাথে অন্য বামপন্থিরাও তাল দিতে পারে না। 

* একটি সংগঠনের সামগ্রিক মতাদর্শগত-রাজনৈতিক লাইনের অধীনস্ত একটি বিষয় হলো নারী প্রশ্ন। প্রেম-বিয়ে-যৌনতা প্রশ্নে বাসদের অনুশীলন সম্পর্কে আমরা ভাল অবগত না হলেও আমরা অনুভব করি তাদের অবস্থান ও অনুশীলনের সাথে আমাদের পার্থক্য রয়েছে। তেমনি অন্যান্য বামপন্থি সংগঠনের সামগ্রিক রাজনৈতিক-মতাদর্শগত লাইনের অংশ হিসেবে এ প্রশ্নে তাদের সাথেও আমাদের পার্থক্য রয়েছে। 

যা খুবই সম্ভব যে, বাসদের পার্টিতে যুক্ত মধ্যবিত্ত তরুণ/তরুণীরা এমনকি নেতারাও সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তির উপর এক ধরনের বুর্জোয়া প্রলেপ মাখানো লাইন অনুশীলন করেছেন/করছেন। ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌন বিচ্যুতি ঘটা ও সেগুলোর মোকাবেলায় ভুল পদ্ধতি অবলম্বন অসম্ভব নয়। যা বর্তমান সমাজ থেকে অর্জিত ক্রটি।

* পরিবার-বিয়ে-যৌন প্রশ্নে সামাজিক নৈতিকতাকে বিপ্লবীরা গ্রহণ করে না। পাশাপাশি নতুন বৈপ্লবিক নৈতিকতা বিকশিত করা, তাতে নেতা-কর্মী ও জনগণকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষিত করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাতে কেন্দ্রবিন্দু হবে বিপ্লবের স্বার্থ, বিপ্লবী সম্পর্ক, অগ্রসর প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষত নারী প্রশ্নে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। সংস্কারবাদী পেটিবুর্জোয়া পার্টিগুলোতে এই প্রশ্নে সামাজিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধকে বর্জন করাটা দুর্বল হতে বাধ্য। কাজেই সেখানে একদিকে থেকে যায় সামাজিক পশ্চাৎপদ মূল্যবোধ, অন্যদিকে এর যা কিছু প্রতিস্থাপন তা হয় কিছু ক্ষেত্রে ত্যাগের মানবতাবাদী মতাদর্শ দ্বারা, অথবা বুর্জোয়া মূল্যবোধ দ্বারা। এগুলো প্রকৃত বিপ্লবী মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিকাশ করতে পারে না। তাই বিবিধ কারণে বাসদ থেকে দলছুট কর্মীরা সামাজিক মূল্যবোধকে পুঁজি করেই মাঠে নামেন। মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা অসম্ভব।

 

বর্তমানে ভারত-ফিলিপাইনে, আগে পেরু-নেপালে, মাওবাদী আন্দোলনে, হাজার হাজার তরুণ-তরুণী বিপ্লবী ও যোদ্ধা একত্রে বিপ্লবের জন্য কাজ করেছেন ও করছেন। তাদের মধ্যে যৌন ও নারী প্রশ্নে এক অগ্রসর ও উচ্চ নৈতিকতা কাজ করে। সেখানেও বিচ্যুতি কখনো বা কারো হয় না বা হতে পারে না তা নয়। কিন্তু প্রকৃত বিপ্লবী পার্টিগুলো রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে উচ্চতর মার্কসবাদী আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গিতে সেগুলোকে মীমাংসা করে থাকেন। এভাবে তারা যেমন নিজেদেরকে পুনর্গঠিত করেন, তেমনি পুনর্গঠন করেন সমাজ ও জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির। সুতরাং যারা বাসদে ছিলেন বা রয়েছেন, কিন্তু আন্তরিকভাবে বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী, যারা ক্ষুদে বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া ব্যক্তি-স্বার্থকেন্দ্রিক জীবনকে মহিমান্বিত করে প্রগতিশীল রাজনীতিকে কলঙ্কিত করতে চান না, তাদেরকে মাওবাদের আদর্শে শিক্ষিত হতে হবে এবং প্রকৃত বিপ্লবী কাজে জীবন উৎসর্গ করতে হবে।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র