গভীর সংকটে শাসকশ্রেণি ও সরকার
জনজীবনও তমসায় আচ্ছন্ন
গভীর সংকটে শাসকশ্রেণি ও সরকার
জনজীবনও তমসায় আচ্ছন্ন
আন্দোলন প্রতিবেদন
বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৪ | অনলাইন সংস্করণ
হাসিনা-আওয়ামী সরকারের সুদীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের শাসকশ্রেণির সংকট গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। রাজনৈতিক ভাবে বুর্জোয়া ব্যবস্থার প্রধানতম উপাদান বুর্জোয়া নির্বাচনি পদ্ধতিকে তারা ধ্বংস করে দেয়। তারা নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে সন্ত্রাসকে অতিমাত্রায় বিকাশ করে এবং দেশকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলে। ফলে শাসক বড় বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যকার ভাঙন চরম পর্যায়ে বিকশিত হয়। একইসাথে বিশ্ব-পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও তার সংকটে বড় প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা দূর্নীতি ও লুটপাটের এক চরম শিখরে দেশকে পৌঁছে দেয়। আর অর্জিত অর্থের বিশাল অংশ তারা বিদেশে পাচার করে দেয়। ফলশ্রুতিতে দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে। জন-জীবনের সংকট তীব্র হতে থাকে।
এসবকে নিশ্চিত করার জন্য তারা আমলাতন্ত্র, পুলিশ-মিলিটারি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচার বিভাগকে সর্বোচ্চ মাত্রায় দলীয়করণ করে। নিজেদের সংবিধানকে ছেঁড়া কাগজে পরিণত করে। দলীয় ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গুম, খুন, নির্যাতন, হামলা-মামলা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে।
এই সব পদক্ষেপ শাসকশ্রেণির মধ্যে ভাঙনকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যায় এবং তার গুরুতর সংকট ডেকে আনে।
এসবের ফলশ্রুতিতেই ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানটি ফেটে পড়ে।
কিন্তু এ অভ্যুত্থানটি ছিল একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত, ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচিবিহীন, ভবিষ্যৎ লক্ষ বিহীন এবং কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ববিহীন। একটি নির্দলীয় ব্যানার রেখে যে যেমনটা পেরেছে এতে অংশ নিয়েছে এবং হাসিনাকে বিদায় করার প্রাথমিক কাজটিতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে পরবর্তীকালে নিজেদের কীভাবে সুবিধা হতে পারে তার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এ সুযোগে শাসকশ্রেণির তথাকথিত অরাজনৈতিক তৃতীয় শক্তি– যার মাঝে রয়েছে সেনা-আমলাÑ প্রাক্তন ও বর্তমান, বেসামরিক আমলা, এনজিও কর্মকর্তা, বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি ক্ষমতা হাতে নিয়েছে। নিজেদেরকে তারা বিপ্লবী, গণ-অভ্যুত্থানের সরকার পরিচয় দিলেও তারা যে তা নয় সেটা দিন দিন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে একেবারে পশ্চাদপদ রাজনৈতিক শক্তির কাছেও। আর এটাই তাদের নতুন সংকটকে প্রকাশ করে দিচ্ছে।
প্রথমেই শুরু হয়েছে তাদের সাংবিধানিক সংকট। তারা পরিষ্কারভাবেই সাংবিধানিক সরকার নয়। একে ন্যায্য করার জন্য তাদের কেউ কেউ বিপ্লব বিপ্লব খেলাও খেলছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
তাদের আগামী পথরেখা কী হবে, বিশেষ করে নির্বাচনের বিষয়ে তা এখনো, চার মাস পরেও তারা পরিষ্কার করেনি। বলছে, তারা সংস্কার করবে, তারপর নির্বাচন দেবে। তাদেরই কেউ বলছে দেড় বছরের মধ্যে নির্বাচন, কেউবা ২০২৬ সাল, বা কেউ আবার চার বছরের কথাও বলছে। ফলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের মতভেদ ও দ্বন্দ্ব বাড়ছেই। ইতিমধ্যে বিএনপিসহ বেশ কিছু পার্টিই দ্রুত নির্বাচন চাচ্ছে।
বাস্তবে এ সরকারের সমর্থক সামাজিক শক্তির দুর্বলতা দ্রুত প্রকাশ পাচ্ছে। তারা বিএনপি’র সমর্থন পেয়েছে, জামাতসহ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের সমর্থন পেয়েছে। সবগুলো সংসদবাদী দলেরও সমর্থন পেয়েছে। সর্বোপরি সেনাবাহিনী তাদেরকে পেছন থেকে ধরে রেখেছে। কিন্তু সরকার প্রধান ড.ইউনুস বলেছেন তাকে ছাত্ররা ক্ষমতায় বসিয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্ট হাসিনার দেশত্যাগের পর জাতি তা জেনেছে প্রথম সেনাপ্রধানের ভাষণ থেকে। আবার সেই বৈষম্য-ছাত্র নেতারাও এখন আর সমগ্র ছাত্র-সমাজকে প্রতিনিধিত্ব যে করছে না সেটা বিভিন্ন ঘটনাতেই প্রকাশ পাচ্ছে। তারা একেকজন একেকবার একেক কথা বলছে।
এর কারণ হলো, বৈষম্য-বিরোধী আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। শেষ মুহূর্তে শুধু হাসিনার পতন পর্যন্ত তারা গিয়েছিল। এটুকু ম্যান্ডেট তাদের ছিল। কিন্তু এখন তারা ও এ সরকার যে বহুবিধ সংস্কারের কথা বলছে এ ম্যান্ডেট তাদের কে দিল? কেউ দেয় নি। এমন কোনো কর্মসূচি তারা আন্দোলন কালে কখনোই পেশ করেনি। তারা হাসিনার সংবিধান রেখে দিয়েছে, আবার বলছে এটা তারা বদলে ফেলবে। তারা হাসিনার সবকিছুই রেখে দিয়েছে শুধু হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও তার অতিঘনিষ্ঠ কিছু লোক ছাড়া।
ফলে এর সুযোগ নিচ্ছে হাসিনা-আওয়ামী-ভারত ফ্যাসিবাদীরা। হাসিনা ভারতে বসে ষড়যন্ত্র করছে। ভারত হিন্দু কার্ড খেলছে। আদানিকে দিয়ে বিদ্যুৎ খাতকে বিপদে ফেলতে চাইছে, সীমান্তে হত্যা শুরু করেছে, ভারতে বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচারের বন্যা বইছে, তারা সীমান্ত ঘেরাও-এর হুমকি দিচ্ছে, জাতিসংঘ বাহিনী আনার ষড়যন্ত্র করছে, আলু-পিয়াজ বন্ধ করছে, দেশের ভেতরে আমলাতন্ত্রের হাসিনা বোড়েগুলো চক্রান্ত চালাচ্ছে, হাসিনা-পুলিশের একটি বড় অংশ তেমন একটা কাজ করছে না।
এইসবকে ভালোভাবে মোকাবেলা করার কোনো বুদ্ধি বা উপায়ই এদের নেই। ফলে একবার তারা আওয়ামীপন্থিদের ছাড় দিচ্ছে, আবার তারা বিএনপি’র কথা শুনছে। অন্যদিকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী ও বিরাজনীতিকরণের ফ্যাসিবাদী কর্মসূচিকে শক্তিশালী হতে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরাও এদেরকে চাপে রেখে সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে।
সবমিলিয়ে সমগ্র শাসকশ্রেণিই পুনরায় এক সামগ্রিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে।
যেহেতু কোনো বিপ্লব হয় নি, তাই ব্যাপক জনগণের জীবনে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয় নি। বরং শাসকদের কার্যক্রমে জনগণের জীবন হয়ে পড়েছে দুর্বিসহ। দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। শীতে সবজি তরকারীর দাম কিছু কমলেও এটা অস্থায়ী। যানজটে নাগরিক জীবন দুর্বিসহ। এদের শ্রমিক-জনগণ বিরোধী কার্যক্রমের কারণে গার্মেন্ট শ্রমিক, অটো-চালক অটো মালিক, পাহাড়ি আদিবাসীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব দমনে সরকার হাসিনা সরকারের মতোই ভূমিকা রাখছে। ইতিমধ্যেই জনগণের আশাভঙ্গ ও হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে।
সরকার বিপ্লব বিপ্লব খেলা খেলছে। কিন্তু বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির বিভিন্ন অংশের বিপ্লব আর স্বাধীনতার বাণী জনগণ এবারই প্রথম দেখছেন না। তারা অতীতে বহুবার এসব শুনেছেন। আর প্রতিবারই তারা দেখেছেন সেগুলো তাদের জীবনে কোনো সুবিধা এনে দেয়নি। এর মূল কারণ হলো, রাষ্ট্রক্ষমতা কখনোই শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ নিপীড়িত জনগণের হাতে যায় নি। তার জন্য প্রথম প্রয়োজন তাদের শ্রেণিশত্রু বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণিগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতাকে উচ্ছেদ করা। আর সেজন্য সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের শোষণ-নিয়ন্ত্রণও উচ্ছেদ করা। সেগুলোকে সযত্নে রেখে দিয়ে জনগণের জীবনের সংকট ও অন্ধকার দূর হতে পারে না।
তাই শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসী-ছাত্র সমাজকে তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। তারা বারবার রক্ত দিয়েছেন। লড়াই করেছেন বীরের মতো। ত্যাগ করেছেন। এবারও। তারা হাসিনা তাড়িয়েছেন। কিন্তু সত্যিকার কোনো বিজয় তাদের হয় নি। এটা না বোঝা পর্যন্ত তাদের ও জনগণের জীবন সংকটের কোনো প্রকৃত উত্তর তারা পাবেন না। জনগণকে সত্যিকার স্বাধীনতা, মুক্তি ও বিপ্লবের কর্মসূচিতে সচেতন হয়ে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালাতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
গভীর সংকটে শাসকশ্রেণি ও সরকার
জনজীবনও তমসায় আচ্ছন্ন
হাসিনা-আওয়ামী সরকারের সুদীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের শাসকশ্রেণির সংকট গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। রাজনৈতিক ভাবে বুর্জোয়া ব্যবস্থার প্রধানতম উপাদান বুর্জোয়া নির্বাচনি পদ্ধতিকে তারা ধ্বংস করে দেয়। তারা নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে সন্ত্রাসকে অতিমাত্রায় বিকাশ করে এবং দেশকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলে। ফলে শাসক বড় বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যকার ভাঙন চরম পর্যায়ে বিকশিত হয়। একইসাথে বিশ্ব-পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও তার সংকটে বড় প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা দূর্নীতি ও লুটপাটের এক চরম শিখরে দেশকে পৌঁছে দেয়। আর অর্জিত অর্থের বিশাল অংশ তারা বিদেশে পাচার করে দেয়। ফলশ্রুতিতে দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে। জন-জীবনের সংকট তীব্র হতে থাকে।
এসবকে নিশ্চিত করার জন্য তারা আমলাতন্ত্র, পুলিশ-মিলিটারি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচার বিভাগকে সর্বোচ্চ মাত্রায় দলীয়করণ করে। নিজেদের সংবিধানকে ছেঁড়া কাগজে পরিণত করে। দলীয় ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গুম, খুন, নির্যাতন, হামলা-মামলা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে।
এই সব পদক্ষেপ শাসকশ্রেণির মধ্যে ভাঙনকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যায় এবং তার গুরুতর সংকট ডেকে আনে।
এসবের ফলশ্রুতিতেই ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানটি ফেটে পড়ে।
কিন্তু এ অভ্যুত্থানটি ছিল একেবারে স্বতঃস্ফূর্ত, ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচিবিহীন, ভবিষ্যৎ লক্ষ বিহীন এবং কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ববিহীন। একটি নির্দলীয় ব্যানার রেখে যে যেমনটা পেরেছে এতে অংশ নিয়েছে এবং হাসিনাকে বিদায় করার প্রাথমিক কাজটিতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে পরবর্তীকালে নিজেদের কীভাবে সুবিধা হতে পারে তার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এ সুযোগে শাসকশ্রেণির তথাকথিত অরাজনৈতিক তৃতীয় শক্তি– যার মাঝে রয়েছে সেনা-আমলাÑ প্রাক্তন ও বর্তমান, বেসামরিক আমলা, এনজিও কর্মকর্তা, বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি ক্ষমতা হাতে নিয়েছে। নিজেদেরকে তারা বিপ্লবী, গণ-অভ্যুত্থানের সরকার পরিচয় দিলেও তারা যে তা নয় সেটা দিন দিন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে একেবারে পশ্চাদপদ রাজনৈতিক শক্তির কাছেও। আর এটাই তাদের নতুন সংকটকে প্রকাশ করে দিচ্ছে।
প্রথমেই শুরু হয়েছে তাদের সাংবিধানিক সংকট। তারা পরিষ্কারভাবেই সাংবিধানিক সরকার নয়। একে ন্যায্য করার জন্য তাদের কেউ কেউ বিপ্লব বিপ্লব খেলাও খেলছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
তাদের আগামী পথরেখা কী হবে, বিশেষ করে নির্বাচনের বিষয়ে তা এখনো, চার মাস পরেও তারা পরিষ্কার করেনি। বলছে, তারা সংস্কার করবে, তারপর নির্বাচন দেবে। তাদেরই কেউ বলছে দেড় বছরের মধ্যে নির্বাচন, কেউবা ২০২৬ সাল, বা কেউ আবার চার বছরের কথাও বলছে। ফলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের মতভেদ ও দ্বন্দ্ব বাড়ছেই। ইতিমধ্যে বিএনপিসহ বেশ কিছু পার্টিই দ্রুত নির্বাচন চাচ্ছে।
বাস্তবে এ সরকারের সমর্থক সামাজিক শক্তির দুর্বলতা দ্রুত প্রকাশ পাচ্ছে। তারা বিএনপি’র সমর্থন পেয়েছে, জামাতসহ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের সমর্থন পেয়েছে। সবগুলো সংসদবাদী দলেরও সমর্থন পেয়েছে। সর্বোপরি সেনাবাহিনী তাদেরকে পেছন থেকে ধরে রেখেছে। কিন্তু সরকার প্রধান ড.ইউনুস বলেছেন তাকে ছাত্ররা ক্ষমতায় বসিয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্ট হাসিনার দেশত্যাগের পর জাতি তা জেনেছে প্রথম সেনাপ্রধানের ভাষণ থেকে। আবার সেই বৈষম্য-ছাত্র নেতারাও এখন আর সমগ্র ছাত্র-সমাজকে প্রতিনিধিত্ব যে করছে না সেটা বিভিন্ন ঘটনাতেই প্রকাশ পাচ্ছে। তারা একেকজন একেকবার একেক কথা বলছে।
এর কারণ হলো, বৈষম্য-বিরোধী আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। শেষ মুহূর্তে শুধু হাসিনার পতন পর্যন্ত তারা গিয়েছিল। এটুকু ম্যান্ডেট তাদের ছিল। কিন্তু এখন তারা ও এ সরকার যে বহুবিধ সংস্কারের কথা বলছে এ ম্যান্ডেট তাদের কে দিল? কেউ দেয় নি। এমন কোনো কর্মসূচি তারা আন্দোলন কালে কখনোই পেশ করেনি। তারা হাসিনার সংবিধান রেখে দিয়েছে, আবার বলছে এটা তারা বদলে ফেলবে। তারা হাসিনার সবকিছুই রেখে দিয়েছে শুধু হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও তার অতিঘনিষ্ঠ কিছু লোক ছাড়া।
ফলে এর সুযোগ নিচ্ছে হাসিনা-আওয়ামী-ভারত ফ্যাসিবাদীরা। হাসিনা ভারতে বসে ষড়যন্ত্র করছে। ভারত হিন্দু কার্ড খেলছে। আদানিকে দিয়ে বিদ্যুৎ খাতকে বিপদে ফেলতে চাইছে, সীমান্তে হত্যা শুরু করেছে, ভারতে বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচারের বন্যা বইছে, তারা সীমান্ত ঘেরাও-এর হুমকি দিচ্ছে, জাতিসংঘ বাহিনী আনার ষড়যন্ত্র করছে, আলু-পিয়াজ বন্ধ করছে, দেশের ভেতরে আমলাতন্ত্রের হাসিনা বোড়েগুলো চক্রান্ত চালাচ্ছে, হাসিনা-পুলিশের একটি বড় অংশ তেমন একটা কাজ করছে না।
এইসবকে ভালোভাবে মোকাবেলা করার কোনো বুদ্ধি বা উপায়ই এদের নেই। ফলে একবার তারা আওয়ামীপন্থিদের ছাড় দিচ্ছে, আবার তারা বিএনপি’র কথা শুনছে। অন্যদিকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী ও বিরাজনীতিকরণের ফ্যাসিবাদী কর্মসূচিকে শক্তিশালী হতে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরাও এদেরকে চাপে রেখে সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে।
সবমিলিয়ে সমগ্র শাসকশ্রেণিই পুনরায় এক সামগ্রিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে।
যেহেতু কোনো বিপ্লব হয় নি, তাই ব্যাপক জনগণের জীবনে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয় নি। বরং শাসকদের কার্যক্রমে জনগণের জীবন হয়ে পড়েছে দুর্বিসহ। দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। শীতে সবজি তরকারীর দাম কিছু কমলেও এটা অস্থায়ী। যানজটে নাগরিক জীবন দুর্বিসহ। এদের শ্রমিক-জনগণ বিরোধী কার্যক্রমের কারণে গার্মেন্ট শ্রমিক, অটো-চালক অটো মালিক, পাহাড়ি আদিবাসীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব দমনে সরকার হাসিনা সরকারের মতোই ভূমিকা রাখছে। ইতিমধ্যেই জনগণের আশাভঙ্গ ও হতাশা প্রকাশ পাচ্ছে।
সরকার বিপ্লব বিপ্লব খেলা খেলছে। কিন্তু বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির বিভিন্ন অংশের বিপ্লব আর স্বাধীনতার বাণী জনগণ এবারই প্রথম দেখছেন না। তারা অতীতে বহুবার এসব শুনেছেন। আর প্রতিবারই তারা দেখেছেন সেগুলো তাদের জীবনে কোনো সুবিধা এনে দেয়নি। এর মূল কারণ হলো, রাষ্ট্রক্ষমতা কখনোই শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ নিপীড়িত জনগণের হাতে যায় নি। তার জন্য প্রথম প্রয়োজন তাদের শ্রেণিশত্রু বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণিগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতাকে উচ্ছেদ করা। আর সেজন্য সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের শোষণ-নিয়ন্ত্রণও উচ্ছেদ করা। সেগুলোকে সযত্নে রেখে দিয়ে জনগণের জীবনের সংকট ও অন্ধকার দূর হতে পারে না।
তাই শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসী-ছাত্র সমাজকে তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। তারা বারবার রক্ত দিয়েছেন। লড়াই করেছেন বীরের মতো। ত্যাগ করেছেন। এবারও। তারা হাসিনা তাড়িয়েছেন। কিন্তু সত্যিকার কোনো বিজয় তাদের হয় নি। এটা না বোঝা পর্যন্ত তাদের ও জনগণের জীবন সংকটের কোনো প্রকৃত উত্তর তারা পাবেন না। জনগণকে সত্যিকার স্বাধীনতা, মুক্তি ও বিপ্লবের কর্মসূচিতে সচেতন হয়ে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালাতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র