দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কষাঘাতে বিপর্যস্ত জনজীবন
আন্দোলন প্রতিবেদন
শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২ | অনলাইন সংস্করণ
করোনার ক্ষত না শুকাতেই দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে একেবারে বেসামাল করে তুলেছে। চাল-ডাল-তেল-চিনি-ছোলা-পেঁয়াজ, মাছ-মাংস-ডিম, কাঁচা তরিতরকারীর পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের দামও দফায় দফায় বেড়েই চলেছে। বিশেষত গত নভেম্বরে জ্বালানি তেলের (লিটার প্রতি ১৫ টাকা) মূল্যবৃদ্ধিতে একযোগে সব জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করে। বাড়তে বাড়তে তা এখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও কিছুকাল আগ পর্যন্তও সরকারের ‘দায়িত্বশীল’ মন্ত্রিরা তাদের চাপার জোরে, মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টা অস্বীকার করত। তাদের যুক্তি ছিল “জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির তুলনায় জনগণের আয় বেড়েছে কয়েকগুণ”। “বিশ্ব বাজারে করোনার প্রভাব”। যখন সর্বমহল থেকেই নিত্যপণ্যের অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তখন সরকার শেষপর্যন্ত স্বীকার করলেও তার দায় তারা নিজেরা নিতে রাজি নয়। সরকারের ভাষ্যমতে, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণেই দেশের বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এছাড়া বিএনপি-পন্থি অসাধু ব্যবসায়ীরাও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে”।
সরকারের এইসব যুক্তি/বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য। বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী-বিশেষজ্ঞগণও সরকারের গণবিরোধী বক্তব্যের খ-ন করছেন। বিশেষত ভোজ্যতেলের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদেরকেও টেনে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে। শ্রমজীবী-নিম্নআয়ের মানুষেরা তিনবেলার জায়গায় দু’বেলা খাচ্ছেন। টিসিবির ট্রাকের সামনে ছেলে-বুড়ো-মধ্যবয়সী নারী-পুরুষের করুণ আর্তি কঠিন হৃদয়ের মানুষকেও করে তুলছে ক্ষুব্ধ। সামান্য কমে পাবার আশায়, নিজের পরিবারের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দিতে অপেক্ষারতদের পরস্পরের প্রতি আজ অবিশ্বাসী চাহনি, যুদ্ধংদেহী মনোভাব। জনগণের জীবনমান যে আজ কোথায় পৌঁছেছে এসব চিত্র তা দেখিয়ে দেয়। সম্প্রতি সয়াবিন তেলের দাম রেকর্ড লিটার প্রতি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই তা ছিল লিটার প্রতি ১৫০/১৬০ টাকা। চিনির দাম কেজিপ্রতি ৮০/৮৫ টাকা। প্রতিটি পণ্যের দাম শ্রমজীবী জনগণের ক্রয়সীমার বাইরে। সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গলাবাজি করলেও নিত্যপণ্যের এক বড় অংশই আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যদ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করা কোম্পানিগুলোই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে তাদের খেয়াল খুশিমত দাম বাড়ায়। বিদেশে এসবের দাম কমলেও তার প্রতিফলন দেশীয় বাজারে মোটেই পড়ে না। সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপি-রাজনীতিবিদ-বুদ্ধিজীবীরা দাম বৃদ্ধির পক্ষে সাফাই গায়। নতুবা বিরোধীদের দিকে আঙ্গুল তোলে। প্রকৃত হন্তারকরা পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। আওয়ামী সরকার এসব কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। কারণ এইসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জোরেই তারা সরকার গঠন করে। বিভিন্ন মহলের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি তেল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করলেও বাজারে তার প্রভাব পড়ে নি। তেল বিক্রি হচ্ছে সেই আগের চড়া দরেই। ফলে আমদানিকারকদের এখন পোয়া বারো। বাজার মনিটরিংয়ের নামে নামকাওয়াস্তে দু’একজন পাইকার বা খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মজুতদারির অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়েই চলেছে জিনিসপত্রের দাম। সরকার ঢাকা-বরিশাল শহর বাদে দেশের ১ কোটি মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য কার্ড দিয়েছে। গণরোষ ঠেকাতে এমন পদক্ষেপ নিলেও তার বড় এক অংশ যে আওয়ামী নেতা-ব্যবসায়ীদের পকেটেই যাচ্ছে সেটা পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই বলা চলে। করোনার প্রণোদনা থেকে যে দরিদ্র জনগণ বঞ্চিত হয়েছেন বুর্জোয়া পত্রিকায়ই তা উঠে এসেছে প্রতিনিয়ত। আওয়ামী নেতা-কর্মীরা স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। তাই এই কার্ড সিস্টেমেও দুর্নীতি চলতে বাধ্য। বাজারের এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও মন্ত্রীরা বলেই চলেছে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমান সরকারই নাকি গরিব দেশগুলোতে দান-খয়রাত করছে। যে কৃষকের ফলানো ফসল নিয়ে সরকারের এই মিথ্যা বাগাড়ম্বর, সেই কৃষককেও সার কিনতে হয় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি বস্তা ২০০-২৫০ টাকা বেশি দরে। বাজারের এ নৈরাজ্যের বলি হচ্ছেন ক্রেতা-সাধারণ জনগণ। হাসিনা সরকারের ১৩ বছরের শাসনামলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি একটি নিয়মিত ঘটনা। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধি ২০০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারের হম্বিতম্বি সত্ত্বেও প্রতি বছর রমজান আসলেই দ্রব্যমূল্য বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। যুদ্ধের পূর্ব থেকেই জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেশীয়-ব্যবসায়ীদের জন্য হয়েছে শাপে বর। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিশ্ব বাজারে মূল্যের হেরফের দেশের অভ্যন্তরে দ্রব্যমূল্য বাড়ার একটা অনুষঙ্গ হলেও মূল কারণ নয়। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টারা আজ প্রায় সবাই ব্যবসায়ী। এছাড়া আছে আমলা, পুলিশ ও মন্ত্রী-এমপিদের ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাট। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে আরও একটা বড় কারণ হলো দেশীয় শাসকশ্রেণির প্রভু,সাম্রাজ্যবাদের পরামর্শ। তারা কৃষিতে পুরোপুরিভাবে ভর্তুকি প্রত্যাহারের চাপ দিয়ে আসছে। এছাড়া শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিষেবামূলক খাতকে বাজারের উপর ছেড়ে দেয়ার কথা বলে আসছে, তাদের পুঁজি লগ্নি করার স্বার্থে। বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর চাপ সত্ত্বেও সামাজিক গণঅসন্তোষ অথবা ভোটে মসনদ হারাবার ভয় দালাল শাসকশ্রেণিকে এ কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নে বিরত রাখে। কিঞ্চিত পরিমাণে হলেও সামাজিক সুরক্ষায় সরকার কিছু পরিমাণে ভর্তুকি দিতে বাধ্য হয়। যদিও ভোটবিহীন হাসিনা সরকারের কাছে ভোটের গুরুত্ব আগেই হারিয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিদেশিদের শতভাগ দাসত্বই এখন একমাত্র পথ। ফলে সাম্রাজ্যবাদী প্রেসক্রিপশনে/মডেলে উন্নয়ন কার্যক্রম ‘মহাকর্মযজ্ঞের’ জন্য বিপুল অর্থের দোহাই পাড়ছে হাসিনা সরকার। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও জনগণের জীবনমান কোথায় পৌছবে সেদিকে না তাকিয়ে ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা জোরেসোরে বলছে। কসমেটিক এ উন্নয়নে মানুষের জীবন যে মৃতপ্রায় সেদিকে ‘বঙ্গবন্ধু’ কন্যার হুঁশ নেই।
সরকারি হিসাবে করোনার আগেও প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে ছিল। করোনাকালে দারিদ্রের হার ২১ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ (সাড়ে ছয় কোটির বেশি) হয়েছিল বলে জরিপে উল্লেখ করেছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। টিসিবি’র পণ্য কিনতে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। সরকার যে মানুষের ক্রয়ক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলছে, সেটা শ্রমজীবী মানুষের নয়। সরকার দলীয় নেতা-কর্মী, বড় ব্যবসায়ী, আমলা-পুঁজিপতি শ্রেণির হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের কাহিনিই বুঝিয়ে দেয়, ক্রয়ক্ষমতা কাদের বেড়েছে। শত-সহস্র কোটি টাকার গার্মেন্টস মালিকদের সাথে ৮ হাজার টাকা বেতন পাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতনের গড় করে দেশের মানুষের গড় আয় দেখানোটা হচ্ছে শুভঙ্করের ফাঁকি বই আর কিছু নয়। এছাড়া দেশের মোট জনসংখ্যা ২০-২২ কোটি হলেও সরকারের তরফ থেকে বলা হয় ১৬ কোটি। জনসংখ্যা কমিয়ে দেখিয়ে মাথাপিছু ইনকাম বাড়িয়ে দেখানোতেও সরকার সিদ্ধহস্ত। ফলে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ বলা আর তাতে প্রভু সাম্রাজ্যবাদীদের স্বীকারোক্তি, জনগণের দারিদ্র নিয়ে এর চেয়ে বড় উপহাস আর কী হতে পারে?
সরকার-শাসকশ্রেণির গণবিরোধী কর্মকা-ের ফলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বিবিধ সমস্যা আজ জনগণের গলায় ফাঁসের মত চেপে বসেছে। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক এ মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনকে করে তুলেছে হুমকির সম্মুখীন। জনগণের ঐক্যবদ্ধ তীব্র আন্দোলন-সংগ্রামই পারে সরকার-শাসকশ্রেণির গণবিরোধিতাকে কিছুটা হলেও সংযত করতে।
* শ্রমজীবী মানুষের আয় শতগুণ বাড়লেও তাতে কোনো লাভ নেই, যদি মূল্যস্ফীতি, অর্থাৎ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। - আকবর আলী খান, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। * আইএলও বলছে, ১০ বছরে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশিহারে প্রকৃত নিম্নতম মজুরি কমেছে বাংলাদেশে।
* অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ভাষায় জনগোষ্ঠীর এই অংশ ছিল ‘শরীর নিমজ্জিত রেখে নাক ভাসিয়ে’।
* সরকার বলছে দেশ অনেক এগিয়েছে, মানুষের আয় বেড়েছে। কিন্তু টিসিবির ট্রাকের পেছনে মানুষের লাইন দেখলেই বোঝা যায় মানুষ কতটা ভালো আছে। কেবল সরকারি দলের লোকেরাই ভাল অছেন - জি এম কাদের, জাপা চেয়ারম্যান।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কষাঘাতে বিপর্যস্ত জনজীবন
করোনার ক্ষত না শুকাতেই দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে একেবারে বেসামাল করে তুলেছে। চাল-ডাল-তেল-চিনি-ছোলা-পেঁয়াজ, মাছ-মাংস-ডিম, কাঁচা তরিতরকারীর পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের দামও দফায় দফায় বেড়েই চলেছে। বিশেষত গত নভেম্বরে জ্বালানি তেলের (লিটার প্রতি ১৫ টাকা) মূল্যবৃদ্ধিতে একযোগে সব জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করে। বাড়তে বাড়তে তা এখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও কিছুকাল আগ পর্যন্তও সরকারের ‘দায়িত্বশীল’ মন্ত্রিরা তাদের চাপার জোরে, মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টা অস্বীকার করত। তাদের যুক্তি ছিল “জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির তুলনায় জনগণের আয় বেড়েছে কয়েকগুণ”। “বিশ্ব বাজারে করোনার প্রভাব”। যখন সর্বমহল থেকেই নিত্যপণ্যের অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধির সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তখন সরকার শেষপর্যন্ত স্বীকার করলেও তার দায় তারা নিজেরা নিতে রাজি নয়। সরকারের ভাষ্যমতে, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণেই দেশের বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এছাড়া বিএনপি-পন্থি অসাধু ব্যবসায়ীরাও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে”।
সরকারের এইসব যুক্তি/বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য। বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী-বিশেষজ্ঞগণও সরকারের গণবিরোধী বক্তব্যের খ-ন করছেন। বিশেষত ভোজ্যতেলের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদেরকেও টেনে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে। শ্রমজীবী-নিম্নআয়ের মানুষেরা তিনবেলার জায়গায় দু’বেলা খাচ্ছেন। টিসিবির ট্রাকের সামনে ছেলে-বুড়ো-মধ্যবয়সী নারী-পুরুষের করুণ আর্তি কঠিন হৃদয়ের মানুষকেও করে তুলছে ক্ষুব্ধ। সামান্য কমে পাবার আশায়, নিজের পরিবারের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দিতে অপেক্ষারতদের পরস্পরের প্রতি আজ অবিশ্বাসী চাহনি, যুদ্ধংদেহী মনোভাব। জনগণের জীবনমান যে আজ কোথায় পৌঁছেছে এসব চিত্র তা দেখিয়ে দেয়। সম্প্রতি সয়াবিন তেলের দাম রেকর্ড লিটার প্রতি ২০০ টাকা ছাড়িয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই তা ছিল লিটার প্রতি ১৫০/১৬০ টাকা। চিনির দাম কেজিপ্রতি ৮০/৮৫ টাকা। প্রতিটি পণ্যের দাম শ্রমজীবী জনগণের ক্রয়সীমার বাইরে। সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গলাবাজি করলেও নিত্যপণ্যের এক বড় অংশই আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যদ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করা কোম্পানিগুলোই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে তাদের খেয়াল খুশিমত দাম বাড়ায়। বিদেশে এসবের দাম কমলেও তার প্রতিফলন দেশীয় বাজারে মোটেই পড়ে না। সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপি-রাজনীতিবিদ-বুদ্ধিজীবীরা দাম বৃদ্ধির পক্ষে সাফাই গায়। নতুবা বিরোধীদের দিকে আঙ্গুল তোলে। প্রকৃত হন্তারকরা পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। আওয়ামী সরকার এসব কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। কারণ এইসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জোরেই তারা সরকার গঠন করে। বিভিন্ন মহলের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি তেল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করলেও বাজারে তার প্রভাব পড়ে নি। তেল বিক্রি হচ্ছে সেই আগের চড়া দরেই। ফলে আমদানিকারকদের এখন পোয়া বারো। বাজার মনিটরিংয়ের নামে নামকাওয়াস্তে দু’একজন পাইকার বা খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মজুতদারির অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়েই চলেছে জিনিসপত্রের দাম। সরকার ঢাকা-বরিশাল শহর বাদে দেশের ১ কোটি মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য কার্ড দিয়েছে। গণরোষ ঠেকাতে এমন পদক্ষেপ নিলেও তার বড় এক অংশ যে আওয়ামী নেতা-ব্যবসায়ীদের পকেটেই যাচ্ছে সেটা পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকেই বলা চলে। করোনার প্রণোদনা থেকে যে দরিদ্র জনগণ বঞ্চিত হয়েছেন বুর্জোয়া পত্রিকায়ই তা উঠে এসেছে প্রতিনিয়ত। আওয়ামী নেতা-কর্মীরা স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। তাই এই কার্ড সিস্টেমেও দুর্নীতি চলতে বাধ্য। বাজারের এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও মন্ত্রীরা বলেই চলেছে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমান সরকারই নাকি গরিব দেশগুলোতে দান-খয়রাত করছে। যে কৃষকের ফলানো ফসল নিয়ে সরকারের এই মিথ্যা বাগাড়ম্বর, সেই কৃষককেও সার কিনতে হয় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি বস্তা ২০০-২৫০ টাকা বেশি দরে। বাজারের এ নৈরাজ্যের বলি হচ্ছেন ক্রেতা-সাধারণ জনগণ। হাসিনা সরকারের ১৩ বছরের শাসনামলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি একটি নিয়মিত ঘটনা। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধি ২০০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারের হম্বিতম্বি সত্ত্বেও প্রতি বছর রমজান আসলেই দ্রব্যমূল্য বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। যুদ্ধের পূর্ব থেকেই জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেশীয়-ব্যবসায়ীদের জন্য হয়েছে শাপে বর। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিশ্ব বাজারে মূল্যের হেরফের দেশের অভ্যন্তরে দ্রব্যমূল্য বাড়ার একটা অনুষঙ্গ হলেও মূল কারণ নয়। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টারা আজ প্রায় সবাই ব্যবসায়ী। এছাড়া আছে আমলা, পুলিশ ও মন্ত্রী-এমপিদের ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাট। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে আরও একটা বড় কারণ হলো দেশীয় শাসকশ্রেণির প্রভু,সাম্রাজ্যবাদের পরামর্শ। তারা কৃষিতে পুরোপুরিভাবে ভর্তুকি প্রত্যাহারের চাপ দিয়ে আসছে। এছাড়া শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিষেবামূলক খাতকে বাজারের উপর ছেড়ে দেয়ার কথা বলে আসছে, তাদের পুঁজি লগ্নি করার স্বার্থে। বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর চাপ সত্ত্বেও সামাজিক গণঅসন্তোষ অথবা ভোটে মসনদ হারাবার ভয় দালাল শাসকশ্রেণিকে এ কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নে বিরত রাখে। কিঞ্চিত পরিমাণে হলেও সামাজিক সুরক্ষায় সরকার কিছু পরিমাণে ভর্তুকি দিতে বাধ্য হয়। যদিও ভোটবিহীন হাসিনা সরকারের কাছে ভোটের গুরুত্ব আগেই হারিয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিদেশিদের শতভাগ দাসত্বই এখন একমাত্র পথ। ফলে সাম্রাজ্যবাদী প্রেসক্রিপশনে/মডেলে উন্নয়ন কার্যক্রম ‘মহাকর্মযজ্ঞের’ জন্য বিপুল অর্থের দোহাই পাড়ছে হাসিনা সরকার। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও জনগণের জীবনমান কোথায় পৌছবে সেদিকে না তাকিয়ে ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা জোরেসোরে বলছে। কসমেটিক এ উন্নয়নে মানুষের জীবন যে মৃতপ্রায় সেদিকে ‘বঙ্গবন্ধু’ কন্যার হুঁশ নেই।
সরকারি হিসাবে করোনার আগেও প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে ছিল। করোনাকালে দারিদ্রের হার ২১ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ (সাড়ে ছয় কোটির বেশি) হয়েছিল বলে জরিপে উল্লেখ করেছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। টিসিবি’র পণ্য কিনতে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। সরকার যে মানুষের ক্রয়ক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলছে, সেটা শ্রমজীবী মানুষের নয়। সরকার দলীয় নেতা-কর্মী, বড় ব্যবসায়ী, আমলা-পুঁজিপতি শ্রেণির হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের কাহিনিই বুঝিয়ে দেয়, ক্রয়ক্ষমতা কাদের বেড়েছে। শত-সহস্র কোটি টাকার গার্মেন্টস মালিকদের সাথে ৮ হাজার টাকা বেতন পাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতনের গড় করে দেশের মানুষের গড় আয় দেখানোটা হচ্ছে শুভঙ্করের ফাঁকি বই আর কিছু নয়। এছাড়া দেশের মোট জনসংখ্যা ২০-২২ কোটি হলেও সরকারের তরফ থেকে বলা হয় ১৬ কোটি। জনসংখ্যা কমিয়ে দেখিয়ে মাথাপিছু ইনকাম বাড়িয়ে দেখানোতেও সরকার সিদ্ধহস্ত। ফলে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ বলা আর তাতে প্রভু সাম্রাজ্যবাদীদের স্বীকারোক্তি, জনগণের দারিদ্র নিয়ে এর চেয়ে বড় উপহাস আর কী হতে পারে?
সরকার-শাসকশ্রেণির গণবিরোধী কর্মকা-ের ফলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ বিবিধ সমস্যা আজ জনগণের গলায় ফাঁসের মত চেপে বসেছে। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক এ মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনকে করে তুলেছে হুমকির সম্মুখীন। জনগণের ঐক্যবদ্ধ তীব্র আন্দোলন-সংগ্রামই পারে সরকার-শাসকশ্রেণির গণবিরোধিতাকে কিছুটা হলেও সংযত করতে।
* শ্রমজীবী মানুষের আয় শতগুণ বাড়লেও তাতে কোনো লাভ নেই, যদি মূল্যস্ফীতি, অর্থাৎ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। - আকবর আলী খান, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। * আইএলও বলছে, ১০ বছরে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশিহারে প্রকৃত নিম্নতম মজুরি কমেছে বাংলাদেশে।
* অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের ভাষায় জনগোষ্ঠীর এই অংশ ছিল ‘শরীর নিমজ্জিত রেখে নাক ভাসিয়ে’।
* সরকার বলছে দেশ অনেক এগিয়েছে, মানুষের আয় বেড়েছে। কিন্তু টিসিবির ট্রাকের পেছনে মানুষের লাইন দেখলেই বোঝা যায় মানুষ কতটা ভালো আছে। কেবল সরকারি দলের লোকেরাই ভাল অছেন - জি এম কাদের, জাপা চেয়ারম্যান।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র