• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১০ আষাঢ় ১৪২৯
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
বুদ্ধিজীবীদের সাথে সংগ্রাম ও সম্পর্ক বিষয়ে
বুদ্ধিজীবীদের সাথে সংগ্রাম ও সম্পর্ক বিষয়ে

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২০  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনাকালে বেশ কিছু পরিচিত বুদ্ধিজীবীর মৃত্যু হয়েছে, আরো হবে ধারণা করা যায়।

কারণ, এদের অনেকেই বয়োবৃদ্ধ, বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত, বুর্জোয়া-উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণিচরিত্রের কারণে ডাক্তার-হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল। ফলে তারা অসুখ-বিসুখ নিয়েও অনেকদিন বাঁচেন। কিন্তু করোনার ধাক্কা অনেকেই সামাল দিতে পারেন না। আর তাদের আক্রান্ত হবার খবরটি প্রচারও হয় বেশি।

অনেকে সরাসরি করোনা আক্রান্ত না হলেও বা তাতে মৃত্যু না হলেও করোনা এসে শেষ ছোবলটা দিচ্ছে।

বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই বেশ পরিচিত বিশেষত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান অঙ্গনের যারা। কেউ কেউ দলবাজ সুবিধাবাদী ও গণবিরোধী রাজনীতির বাইরেও সমাজের এই অংশ বা ঐ অংশের কাছে শ্রদ্ধাভাজন। তাই, তাদের মৃত্যুর পর তাদের মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।

এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে মাঝে মাঝে বিতর্কের ঝড় ওঠে। বামপন্থী এবং আমাদের ঘরানার ব্যক্তিবর্গও অনেকে এসবে অংশ নিয়ে থাকেন। কোনো কোনো সময় সেটা প্রয়োজনীয়ও হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রায়ই প্রচুর ভুল অভিমত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন জায়গা থেকে। একদিকে দেখা যায় সব ধরনের ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রেই আলোচনা বা সংগ্রামে পুরোপুরি রাজনৈতিক চরিত্রদান, একতরফা সংগ্রাম, ব্যক্তিআক্রমণাত্মক, এমনকি সংগ্রামের নামে অশ্লীল গালাগালি যাতে প্রয়োজনীয় কৌশলগত দিকটিও অনুপস্থিত থাকে। এটা একটা পেটিবুর্জোয়া বাম ধারা। অন্যদিকে তার বিরোধিতায় বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক কথাবার্তার ছাড়ছড়িও দেখা যায়।

 

* বুদ্ধিজীবী বলতে যাদেরকে বোঝানো হয়, তারা প্রায়ই শ্রেণিচরিত্রগতভাবে বুর্জোয়া বা উচ্চমধ্যবিত্ত সুবিধাভোগী। সুতরাং তারা সাধারণত বুর্জোয়া চেতনার ধারক। অনেকেই জেনে বা না বুঝে তাদের অবস্থানগত কারণেই ব্যবস্থার পক্ষে। একটা অংশ ব্যবস্থার সংস্কার চান, কাউকে কাউকে বড় ধরনের বা আমূল পরিবর্তনকামীও মনে হয়। একটা অংশ এখনো আন্তরিকভাবে সমাজতন্ত্রেরও সমর্থক বটে। তবে তাদের মাঝে বুর্জোয়া চিন্তাধারা ও মানব সমাজের ৫ হাজার বছরের সভ্যতাকালের বহু ধরনের ভুল দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার মিশ্রণ দেখা যায়।

কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিগত কারণেই তাদের অনেকে সমাজে শ্রদ্ধেয়, তাদের বহু ভক্ত সমাজে রয়েছেন। কারণ, তারা অনেকেই জ্ঞানের চর্চায় নিবেদিত, শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান তথা জ্ঞানের জগতে তাদের কারো কারো বড় অবদানও থাকে। তাদের অনেকে ব্যক্তিগত জীবনে ত্যাগী, সংগ্রামী, সাহসী, বিবেকবান ও সহজ-সরলও বটেন। তাদের একটা অংশ বৈষয়িক কারণে বিক্রিযোগ্য হয়ে পড়লেও বা কেউ কেউ ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক বিভ্রান্তিতে ভোগা সত্ত্বেও তাদের অনেকে আবার গণবিরোধী নন। কেউ কেউ অতীতে গণস্বার্থ সংগ্রাম বা সমাজতন্ত্রের সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা রেখেছেন, যদিও বর্তমানে তাদের অনেকেই তার ধারাবাহিকতা রাখেননি।

সুতরাং বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রামের ক্ষেত্রে - তারা জীবিত হোক বা মৃত - তাদের সার্বিক ভূমিকা ও কার্যক্রমকে মাথায় রাখাটা খুবই জরুরি। তাদেরকে সংগ্রামের ক্ষেত্রে সুপার-রাজনৈতিক হওয়াটা সঠিক নয়, কারণ তাদের কর্মকাণ্ডের ভিন্নতর ক্ষেত্র রয়েছে। বা তাদের একটি/দুটি খারাপ/দুর্বল ভূমিকা বা শুধু বর্তমানকালের ভূমিকা দিয়েই তাদের সার্বিক মূল্যায়ন সঠিক নয়।

একইসাথে সাধারণভাবে একজন বুদ্ধিজীবীকে আমরা সংগ্রাম করি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মোচনের প্রয়োজনে, তার ত্রুটিকে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনে। কারণ, এসবের এক বিশাল প্রভাব থাকে সমাজে, বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও তরুণদের মাঝে, যারা আবার অনেকেই প্রকৃত সমাজতন্ত্রে আকৃষ্ট হতে পারেন, এবং যারা শ্রেণিগতভাবে মূলত শ্রমিক-বিপ্লবের মিত্র। একজন ব্যক্তিকে নিন্দা করা বা তার প্রতি ঘৃণা উদগীরণ করা বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে সাধারণত আমাদের নীতি নয়, যদিনা তার ভূমিকা খুবই গণবিরোধী হয়।

তার গুরুতর রাজনৈতিক অধঃপতন ও গণবিরোধী ভূমিকা না থাকলে তাকে ব্যক্তিগতভাবে গালাগালি করাটা আমাদের অগ্রসর রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ জাতীয় বিপ্লবাত্মক বাম গালাগালিতে যতই লাল রং দেয়া হোক না কেন সেটা নিজেই আসলে পেটি বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও কৌশল। যা আমাদের বিরোধী পক্ষকেই শক্তিশালী করে। ব্যক্তিগত আক্রমণ মতাদর্শগত-রাজনৈতিক সংগ্রামকে দুর্বল করে, বিতর্ককে বুর্জোয়া পরিসরে নিয়ে যায়, এবং আমাদের ব্রতকে ক্ষতি করে। এটা, যারা বিভ্রান্ত কিন্তু জয় করা যায়, বা অন্তত নিষ্ক্রীয় রাখা যায়, তেমন ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে শত্রুশিবিরে ঠেলে দেয়, বিপক্ষকে প্রতিরোধে শক্তি যোগায়, এবং বিপ্লবী সংগ্রামকে মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

তদুপরি একটা মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন গুরুতর রাজনৈতিক বৈরী ব্যক্তি না হলে তার ভক্তকুলকে আঘাত করাটাও আমাদের জন্য সঠিক কৌশল নয়। ব্যক্তি যদি আক্রমণ করার মত হয় তাহলেও সেক্ষেত্রে স্থান-কাল খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা না বুঝে সর্বত্র সর্বদা একই ঢিল মারা কোনো বিপ্লব-পরিচালনাকারীর কাজ নয়, সেটা শ্রমিক-কৃষক বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিজীবীরা করে থাকেন।

বুদ্ধিজীবীরা বহু ধরনে বিভক্ত। প্রথমত, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমন্ডল আর সরাসরি রাজনৈতিক পরিমন্ডলের নিজস্ব বৈশিষ্ট রয়েছে। সবকিছুকে একাকার করে ফেলা যায়না। বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র অংশই সরাসরি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলীয় চেতনা ধারণ করে। তবে অনেকে আবার বিবিধ রাজনৈতিক দলীয় চেতনা দ্বারা প্রভাবিত। অনেকে আবার সম্পূর্ণতই ‘রাজনীতিবিচ্ছিন্ন’ভাবে নিজেদের চিন্তা, গবেষণা ও জ্ঞানের ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করেন। সবাইকেই রাজনৈতিকভাবে এক মাত্রায় বিবেচনা করা যায়না। সুপার রাজনৈতিক হওয়াটা বহু ক্ষেত্রে বিপ্লবী নয়।

বহু বৈজ্ঞানিক অদৃষ্টবাদী বা ধর্মবাদী হয়ে থাকেন। কিন্তু তাই বলে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মবিশ্বাসের জন্য তাদের যুগান্তকারী বস্তুবাদী আবিষ্কারগুলোর অবদানকে বাতিল করা যায় না। নিউটন ব্যক্তিগতভাবে স্বার্থপর ধরনের লোক ছিলেন, এবং প্রচন্ড ধর্মবাদী ছিলেন। কিন্তু পদার্থবিদ্যায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। তাই সকল বুদ্ধিজীবীদেরকে সরাসরি রাজনৈতিক গণশত্রুদের সাথে একাকার করে দেখা যায় না প্রায় ক্ষেত্রেই। দ্বিতীয়ত, যারা অনেকেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও কাজ করেন, সচেতন মানুষ সেটা করতেই চান, যদি ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় থেকে না হয় তাহলে রাজনৈতিক না হওয়াটাই খারাপ, তারা অনেক ক্ষেত্রেই বুর্জোয়া উদারনৈতিকতা ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ধারক হন, যদিও তাদের একটা অংশ, বিশেষত সমাজতন্ত্রের বিজয়কালে নিজেদেরকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরে যুক্ত করেন।

যেমন, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক চেতনা ব্যাপকভাবেই ‘আওয়ামী ’৭১-চেতনা’ দ্বারা প্রভাবিত, যদিও তারা অনেকে আওয়ামী লীগের বহু সমালোচনাও করেন। আবার বহু লোক ভারতীয় হিন্দুত্ববাদকে বা সম্প্রসারণবাদকে বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার দিকে চলে যান, যেগুলো সারমর্মে প্রতিক্রিয়াশীল। যদিও এই উভয় পক্ষেরই বহু মানুষ সৎ, দেশপ্রেমিক, গণবিরোধী নন। যদিও আবার কেউ কেউ সে পর্যায়ে চলেও যান।

বিপ্লব যত এগোয় ততই আন্তরিক ও ত্যাগী গণমুখী ও মানবিক বুদ্ধিজীবীদেরকে সঠিক রাজনীতিতে জয় করার সুযোগ বাড়তে থাকে। কিন্তু তাদের বুর্জোয়া উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা সহজেই পুনর্গঠিত হয়না। তারা সমাজতান্ত্রিক সমাজে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের একটা বড় মজুদ শক্তি হিসেবেই থেকে যায়। কিন্তু বিপ্লবীরা যদি তাদের প্রতি সঠিক হ্যান্ডলিং করতে পারে তাহলে তাদেরকে জয় করা যায়, অনেকটা পুনর্গঠন করা যায়। এর খুবই গুরুত্ব রয়েছে, বিশেষত যতদিন না শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব বড় বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী গড়ে উঠছে। তথাপি মানসিক ও শারীরিক শ্রমের দ্বন্দ্ব সুদীর্ঘদিন থাকবে এবং বুদ্ধিজীবীরা সুদীর্ঘদিন শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবে বিবিধ ঝামেলা সৃষ্টি করে চলবেন, যদিও বিপ্লবে বিশাল ভূমিকাও তারা রেখে চলেন।

তাই বুশের যে কুখ্যাত বুর্জোয়া লাইন "হয় আমার পক্ষে, নতুবা আমার শত্রু" এই লাইনটা আমাদের জন্য উল্টো করে ব্যবহার করলেই সঠিক হবে না। সেটা বুর্জোয়া লাইনই থাকবে। যেমন, বুর্জোয়াদের মত উল্টোশ্রেণির একনায়কত্ব আমরাও চাই, কিন্তু আমরা তাদের মত করে একনায়কত্ব চালাই না। আমরাও প্রতিপক্ষ শ্রেণি হিসেবে বুর্জোয়া শ্রেণি ও তার মতবাদকে দমন করি, কিন্তু তাদের মত করে নয়। আমাদের ধরন ভিন্ন যা প্রথমত, সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির পক্ষে, দ্বিতীয়ত, সমগ্র মানবজাতিকে, সুতরাং বুর্জোয়া মতাবলম্বনকারীদেরও মুক্তির পক্ষে কাজ করে। উল্টো বুশ-লাইন বেশি বিপ্লবী শোনা যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্তভাবে বুর্জোয়া সেবাই করে।

 

* আমাদের সমাজে বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ শাসকশ্রেণির গণশত্রু পার্টিগুলোর ছত্রছায়ায় ব্যক্তিগতভাবেই অধঃপতিত ও সুবিধাবাদী হয়ে পড়ে। এটাকে অস্বীকার করা যাবেনা। এ ধরনের বুদ্ধিজীবী নামের বিক্রি হওয়া মাথাগুলোর সাথে অবশ্যই সমাজ-মানদন্ডে সৎ বা গণমুখী বুদ্ধিজীবীদের, তারা যদি বুর্জোয়া রাজনীতির বিভিন্ন ধারার বিভিন্ন চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ও মুগ্ধ থাকেন, বুর্জোয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভক্ত থাকেন, তাদের পার্থক্য করতে হবে।

তাদের বিপরীতে জনগণের পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রামকে অবশই দেখাতে হবে, তাদেরকে প্রশংসা করতে হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে পাল্টা কাউকে বাছ-বিচারহীনভাবে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। এগুলো বিশেষত তরুণদেরকে ভুল ব্যক্তিত্বের ভক্ত বানিয়ে তাদের বিপ্লবী হবার পথে প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলে।

যেমন, রাশিয়ার নিবেদিতপ্রাণ সমাজতন্ত্রী লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির শ্রমিক বিপ্লবের সপক্ষে বিশাল অবদান সত্ত্বেও ও রাজনৈতিকভাবে গোর্কিকে আদর্শ করলে সঠিক হবেনা। অনেকেই হয়তো জানেন যে, গোর্কি রুশ বিপ্লবের আগে কখনই লেনিনের সমর্থক ছিলেন না এবং তিনি বলশেভিক বিরোধী একটি উপদলে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু শ্রমিক-বিপ্লবের সপক্ষে তার অবদান ছিল বিশাল। তিনি প্রধানত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যেমনটা ছিল প্লেখানভ বা ট্রটস্কি। গোর্কি ছিলেন সাহিত্য-পরিমন্ডলের লোক - বুদ্ধিজীবী। 

আমাদের দেশে গোর্কির চেয়ে কম শ্রমিক-বান্ধব বাম বুদ্ধিজীবী ড.শরীফ বা হুমায়ূন আজাদ - এদেরকে আদর্শ করার আরো বেশি প্রশ্ন আসে না। তারা বিদ্রোহী বটেন, ব্যবস্থার বিরোধীও ছিলেন, কিন্তু তারা ব্যবস্থার সাংস্কৃতিক বহু কিছুকে ধারণও করতেন। তারা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ব্যাপক বিভ্রান্তিতেও ভুগেছেন। তারা জাতীয়তাবাদেও প্রভাবিত অনেকটাই ছিলেন। কিন্তু তারা জনগণের পক্ষে ছিলেন, যদিও ড.আজাদকে শেষ পর্যায়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষাবলম্বী বুদ্ধিজীবী বলা যায় না। 

সমাজতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী বিকাশের সময়টার পর অনেক সমাজতন্ত্রী, যারা আন্তরিক ত্যাগী গণমুখী - তারা সংশোধনবাদে নিমজ্জিত হয়েছেন। কিন্তু সংশোধনবাদের জন্য তাদের সমস্ত জীবনকে কেটে ফেলাটা বুদ্ধিহীন কাজ। যেমন, গুরুতর সংশোধনবাদী বিচ্যুতি সত্ত্বেও রুশ-চীন মহাবিতর্ক পূর্ব ভারতীয়/পাকিস্তানি কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহ্য শ্রমিক-বিপ্লবেরই অংশ। তাকে পরিপূর্ণ বর্জন করে তৎপূর্ব কমিউনিস্টদের সকল ত্যাগী ও ইতিবাচক ইতিহাসকে পরবর্তী রুশ-দালালদের হাতে তুলে দেয়াটা কোনো বু্িদ্ধমত্তার কাজ নয়। এমনকি প্লোখানভের মত কট্টর বলশেভিক বিরোধী সংশোধনবাদী উচ্চ রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রেও তার সংশোধনবাদী জীবনের থেকে তার তৎপূর্ব মার্কসবাদী অবদানকে লেনিন পৃথক করে দেখিয়েছিলেন।

 

* কিন্তু এ তো গেল একদিকের বিষয়। কিন্তু উপরোক্ত পেটি বুর্জোয়া বামপন্থার বিরোধিতার নামে সর্বদাই যেমনটা ঘটে, বুর্জোয়া উদারনৈতিকতা ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পচা লাশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য থেকেই দুর্গন্ধ ছোটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যাকে অনেক মধ্যবিত্ত বাম ও ভালমানুষরা সমর্থন করতে স্বস্তি বোধ করেন, সে সম্পর্কে সতর্কতার অভাবে।

প্রথমত, তাদের মতাদর্শ-রাজনীতিটা অনেকটা খ্রিষ্টীয় সেই নীতিকথার মত যাতে বলা হচ্ছে “পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর”। কিন্তু ব্যক্তি-তো তার মতাদর্শ-রাজনীতি নিরপেক্ষ নয়। সেটা সে বলুক বা না বলুক, বুঝুক বা না বুঝুক। দেখবেন, সেলিব্রেটিরা প্রায়ই বলতে পছন্দ করে যে, ‘আমি রাজনীতি বুঝিনা’ (বিখ্যাত তসলিমা নাসরিনেরও এরকম বক্তব্য রয়েছে - আমার কাজকে হিন্দুত্ববাদীরা ব্যবহার করলে আমি কী করবো, রাজনীতি-তো আমার কাজ নয়)। কিন্তু ভোটের সময় তারা নিরংকুশভাবে এখন নৌকা বা ধানের শীষেই তো ভোট দেয়! রাজনীতি বোঝে না বটে! (অবশ্য কোদাল কাস্তে এরাও কিছু ভোট পায় বৈকি!)।

ব্যক্তিকে আক্রমণ করা যাবেনা - এটা ঠিক নয়। তাদেরকে আক্রমণ করা যাবে নিশ্চয়ই, তবে রাজনৈতিকভাবে। রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ব্যক্তিকে পৃথক করাটা বুর্জোয়া উদারনৈতিকতার একটা বড় ফতোয়া। 

যখন একজনকে ফ্যাসিবাদের সমর্থক বলে আক্রমণ করা হয়, তখনতো তার রাজনীতিক চরিত্রকে বলাই হচ্ছে। রাজাকার বললে হচ্ছেনা? নাকি সব ব্যাখ্যা তখন তখনই লাগবে? অনেকেই হয়তো জানেন যে, জামাত-নেতা মতিয়ুর নিজামীর ব্যক্তিগত চরিত্র বর্তমান আওয়ামী-বিএনপি নেতাদের চেয়ে অনেক বেশি আদর্শ-ভিত্তিক ও সামাজিকভাবে সৎ ছিল। কিন্তু তার রাজাকারী ও ফ্যাসিবাদী জামাত রাজনীতিতো আর তাতে জায়েজ হতে পারে না। হ্যাঁ, তবে কেউ যদি একজনের ফ্যাসিবাদের ব্যাখ্যা চায় সেটা আপনাকে দিতে হবে। সেটা না করলে তো কোনো মিথ্যা দিয়ে কাউকে হেনস্থা করার পর্যায়ে সেটা চলে যাবে।

এমনকি কোনো পরিপূর্ণ ধরনের রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক-বৈজ্ঞানিক চেতনার মানুষও রাজনৈতিক চরিত্র বিহীন নয়। সর্বদাই একজন বড় বুদ্ধিজীবীর সমগ্র কাজের বিশ্লেষণ করে তারপর তার মূল্যায়ন করার দাবির অর্থ হলো তার রাজনৈতিক ভুল অবস্থানের পথ করে দেয়া। 

কখনো কখনো নিপীড়িত শ্রেণি বিদ্রোহ করেন। তারা সীমা অতিক্রম করেন। দেখুন, এবারকার মার্কিনের বর্ণবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক বিদ্রোহেও বুর্জোয়া ব্যক্তিত্বদের মূর্তি ভাঙ্গার খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচিটিকে। ইতিহাসকে পুনর্লিখনের সাহসী চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু কতজন জানেন চার্চিলের ভূমিকা? ওয়াশিংটন বা জেফারসন তো আরো পরে। কিন্তু বিদ্রোহী মানুষ বুদ্ধিজীবীদের পন্ডিতি বিশ্লেষণের জন্য বসে থাকেননি। আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথের মত বিশাল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে বিশ্লেষণ ও সঠিক সংগ্রাম করে কতটা আলোচনা করা সম্ভব হয়েছে? কিন্তু বিপ্লবী ও অশিক্ষিত অমার্জিত শ্রমিক কৃষক কি সেধরনের বড় পুস্তকের জন্য বসে থাকবেন রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের জন্য? নাকি অগ্রসর বিপ্লবীরা তাদেরকে পথ দেখাবেন? রবীন্দ্রনাথ তার জীবনব্যাপী কখনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ চাননি, যদিও খুব ব্যতিক্রমভাবে ব্রিটিশের কিছু কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তার মোলায়েম সমালোচনা ও তার এই মক্কা সম্পর্কে তার হতাশা প্রকাশ পেয়েছে।

মাও বলেছিলেন প্রথমে ধ্বংস, পরে গঠন। আসলে বিপ্লবে ধ্বংসের প্রক্রিয়াতে গঠনটি হয়, বিপরীত নয়। তিনি আরো বলেছিলেন, কোনো সঠিক রূপান্তর সীমা অতিক্রম ছাড়া হতে পারেনা। কলকাতায় নকশালপন্থীরা ’৭০-দশকে ব্রিটিশ-পন্থী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মূর্তি ভেঙ্গেছিলেন। সেখানে কৌশলগত ত্রুটি নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, যাকিনা নক্সাল আন্দোলনে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সেসময়টাতে কার্যকর ছিল। কিন্তু নীতিগত দিকটাকে না দেখে, তাকে তুলে না ধরে কৌশলগত ত্রুটি নিয়ে অতিউৎসাহ আসলে নীতিগত বিচ্যুতিরই ভিন্নরূপী প্রকাশ। যা উদারনৈতিকতার একটি বৈশিষ্ট্য।

প্রত্যেক বুদ্ধিজীবীরই সচেতন বা অসচেতন রাজনৈতিক অবস্থান থাকে, বিশেষত যারা রাজনৈতিক পরিমন্ডলে কম/বেশি বিচরণ করেন, তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভুলে গেলে চলবেনা, সেগুলোকে আড়ালে ফেলে দিলে চলবেনা। উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবীরা ‘সময় হয়নি’, ‘হঠকারী করা যাবেনা’, ‘ব্যক্তিকে আক্রমণ করা যাবেনা’ - এসব কথার আড়ালে কার্যত সেগুলোর পথ করে দেয়, এমনকি তার পক্ষাবলম্বনেও চলে যায়। সিপিবি-কে দেখুন। টলস্টয়ের মত এক সাধুসদৃশ মানবতাবাদী প্রায় বিপ্লবাত্মক বুদ্ধিজীবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করে রবীন্দ্রনাথকে শুধু পড়তেই বলেনা, বাস্তবে রবীন্দ্রনাথের জয়গানে মত্ত হয়। এসব থেকে সতর্ক না থাকলে কৃষক-শ্রমিকের পক্ষে কাজ করা যায় না।

বেশ অনেক বড় বুদ্ধিজীবীর কেউ কেউ রাজনৈতিকভাবে একেবারে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা নেন। নিশ্চয়ই তাদেরকে নিন্দা করতে হবে। এমনকি তারা সেরকম না হলেও তাদের বুর্জোয়া চিন্তাধারা বা সংস্কারবাদ ন্যায্য হয়ে যায়না। বিশেষ করে যখন এদের কেউ কেউ সমাজতন্ত্রের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির পক্ষাবলম্বনে চলে যান, কেউ কেউ নিজেদেরকে বিক্রিও করে দেন। কিন্তু সবাই সেভাবে উন্মোচিত থাকেননা। বিশেষত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত অংশটির বহু মানুষ তাদের দ্বারা প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হন।

তবে আগেই যেরকমটি বলা হয়েছে যে, সবকিছুর একটা সময় রয়েছে, স্থানকে বিবেচনা করতে হয়, আপনার অডিয়েন্সকে বিবেচনা করতে হবে, আপনাকে সত্যনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক হতে হবে, আপনাকে বুর্জোয়া অশ্লীলতা ও ব্যক্তিগত কুৎসা ছাড়নো থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সবকিছুতে কৌশলগত বিষয়ও রয়েছে। সেটা না বুঝলে আমাদের ব্রতকেই আমরা ক্ষতি করবো। সেটা যেন আমরা ভুলে না যাই। এবং কোনো ক্রমেই যেন বুর্জোয়া উদারনৈতিকতার শুভ্র মাদকে আসক্ত না হয়ে পড়ি।

 

* আরেকটা বিষয় হলো, আমরা কোথায় কতটুকু গুরুত্ব দেবো। বুর্জোয়া ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে বহু সময়েই তা নয়। সবকিছুতেই আমাদের প্রতিক্রিয়া জানানোর অভ্যাস আবারো বুর্জোয়া-মধ্যবিত্তের গন্ডিতে থাকার সুখকেই সেবা করবে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া নামের এক ফাঁদে পড়ে আমাদেরও, শিক্ষিত তরুণদের মতো, অনেকে আসক্ত। 

সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব করোনাকালে অনেকটাই বেড়েছে, বিশেষত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত অংশের মাঝে। কিন্তু আগেও যেমন ছিল, এখন তার চেয়ে বেশি করে এসবের বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় ‘স্ট্যাটাস’ নামের আবর্জনা। বাস্তবে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ কার্যত ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’র একটি বড় হাতিয়ার ব্যতীত কিছু নয়। এটা সৃজনশীল মানুষদের সময়হরণকারী এক গুরুতর আসক্তি। মানুষের সামাজিক বাস্তব সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্নকারী ‘ঘরে থাকা থেরাপি’ জাতীয় অলস তরুণদেরকে এটা ব্যাপকভাবে অধঃপাতে নিতে ভূমিকা রাখছে।

পাশাপাশি এর একটি প্রচার গুরুত্ব এই ব্যবস্থায় নিশ্চয়ই রয়েছে। বিশেষত যখন করোনার কারণে মানুষকে বাধ্যতামূলক ঘরবন্দি করা হয়েছে, এবং তরুণদেরকেও, তখন পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য এর গুরুত্ব বেড়ে গেছে। কোনো কোনো নাগরিক অভ্যুত্থানে এটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু একে কোনোক্রমেই বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিকল্প করা উচিত নয়। যেকোনো বিষয়ে কথাবার্তা চালানো, বা মধ্যবিত্তসুলভ বিতর্কে জড়ানোটা আমাদের কাজ নয়। এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এটা মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নেশা। আমাদের দেশের শ্রমিক, দরিদ্র, কৃষকরা তাদের শিক্ষাগত ও জীবিকাগত কারণেই এতে সংযুক্ত হতে পারেন না। এই ‘স্ট্যাটাস’ অভ্যাস আপনাকে আপনার মূল শ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং মধ্যবিত্তসুলভ কুবিতর্কে আসক্ত করার জন্য বিরাট নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সুতরাং বুদ্ধিজীবী মাত্রই তার উপর আমাদের কথা বলতে হবে, তাকে গুরুত্ব দিতে হবে, অযথা কূটতর্কে জড়াতে হবে, অন্যের মতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে হবে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় চলে যেতে হবে - এসব কোনোটাই আমাদের মূল কাজের জন্য উপযুক্ত নয়।

 

আমাদের কর্মীদের উচিত হবে শ্রমিক-বিপ্লবের পক্ষে/বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের আলোচনায় সম্ভব হলে সক্রিয় থাকা। কিন্তু আসল কাজ না করে - শ্রমিক-কৃষকের সাথে সরাসরি না মিশে তাদেরকে সচেতন করার কাজে অংশ না নিয়ে তাদেরকে সংগঠিত করার কাজকে অবহেলা করে - এসব কুবিতর্কে মেতে থাকাটা এক ধরনের অপসংস্কৃতি। এ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। নইলে শ্রমিক কৃষক দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের সাথে সত্যিকার মেশা ও তাদের বাস্তব জীবন সম্পর্কে আপনি ভুলে যাবেন, ধীরে ধীরে সেটাই আপনার ধারা হয়ে যাবে অভ্যাসের ও সংস্কৃতির। নিজের সর্বনাশ করবেন।

বুদ্ধিজীবীদের সাথে সংগ্রাম ও সম্পর্ক বিষয়ে

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২০  |  অনলাইন সংস্করণ

করোনাকালে বেশ কিছু পরিচিত বুদ্ধিজীবীর মৃত্যু হয়েছে, আরো হবে ধারণা করা যায়।

কারণ, এদের অনেকেই বয়োবৃদ্ধ, বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত, বুর্জোয়া-উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণিচরিত্রের কারণে ডাক্তার-হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল। ফলে তারা অসুখ-বিসুখ নিয়েও অনেকদিন বাঁচেন। কিন্তু করোনার ধাক্কা অনেকেই সামাল দিতে পারেন না। আর তাদের আক্রান্ত হবার খবরটি প্রচারও হয় বেশি।

অনেকে সরাসরি করোনা আক্রান্ত না হলেও বা তাতে মৃত্যু না হলেও করোনা এসে শেষ ছোবলটা দিচ্ছে।

বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই বেশ পরিচিত বিশেষত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান অঙ্গনের যারা। কেউ কেউ দলবাজ সুবিধাবাদী ও গণবিরোধী রাজনীতির বাইরেও সমাজের এই অংশ বা ঐ অংশের কাছে শ্রদ্ধাভাজন। তাই, তাদের মৃত্যুর পর তাদের মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।

এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে মাঝে মাঝে বিতর্কের ঝড় ওঠে। বামপন্থী এবং আমাদের ঘরানার ব্যক্তিবর্গও অনেকে এসবে অংশ নিয়ে থাকেন। কোনো কোনো সময় সেটা প্রয়োজনীয়ও হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রায়ই প্রচুর ভুল অভিমত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন জায়গা থেকে। একদিকে দেখা যায় সব ধরনের ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রেই আলোচনা বা সংগ্রামে পুরোপুরি রাজনৈতিক চরিত্রদান, একতরফা সংগ্রাম, ব্যক্তিআক্রমণাত্মক, এমনকি সংগ্রামের নামে অশ্লীল গালাগালি যাতে প্রয়োজনীয় কৌশলগত দিকটিও অনুপস্থিত থাকে। এটা একটা পেটিবুর্জোয়া বাম ধারা। অন্যদিকে তার বিরোধিতায় বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক কথাবার্তার ছাড়ছড়িও দেখা যায়।

 

* বুদ্ধিজীবী বলতে যাদেরকে বোঝানো হয়, তারা প্রায়ই শ্রেণিচরিত্রগতভাবে বুর্জোয়া বা উচ্চমধ্যবিত্ত সুবিধাভোগী। সুতরাং তারা সাধারণত বুর্জোয়া চেতনার ধারক। অনেকেই জেনে বা না বুঝে তাদের অবস্থানগত কারণেই ব্যবস্থার পক্ষে। একটা অংশ ব্যবস্থার সংস্কার চান, কাউকে কাউকে বড় ধরনের বা আমূল পরিবর্তনকামীও মনে হয়। একটা অংশ এখনো আন্তরিকভাবে সমাজতন্ত্রেরও সমর্থক বটে। তবে তাদের মাঝে বুর্জোয়া চিন্তাধারা ও মানব সমাজের ৫ হাজার বছরের সভ্যতাকালের বহু ধরনের ভুল দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার মিশ্রণ দেখা যায়।

কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিগত কারণেই তাদের অনেকে সমাজে শ্রদ্ধেয়, তাদের বহু ভক্ত সমাজে রয়েছেন। কারণ, তারা অনেকেই জ্ঞানের চর্চায় নিবেদিত, শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান তথা জ্ঞানের জগতে তাদের কারো কারো বড় অবদানও থাকে। তাদের অনেকে ব্যক্তিগত জীবনে ত্যাগী, সংগ্রামী, সাহসী, বিবেকবান ও সহজ-সরলও বটেন। তাদের একটা অংশ বৈষয়িক কারণে বিক্রিযোগ্য হয়ে পড়লেও বা কেউ কেউ ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক বিভ্রান্তিতে ভোগা সত্ত্বেও তাদের অনেকে আবার গণবিরোধী নন। কেউ কেউ অতীতে গণস্বার্থ সংগ্রাম বা সমাজতন্ত্রের সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা রেখেছেন, যদিও বর্তমানে তাদের অনেকেই তার ধারাবাহিকতা রাখেননি।

সুতরাং বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রামের ক্ষেত্রে - তারা জীবিত হোক বা মৃত - তাদের সার্বিক ভূমিকা ও কার্যক্রমকে মাথায় রাখাটা খুবই জরুরি। তাদেরকে সংগ্রামের ক্ষেত্রে সুপার-রাজনৈতিক হওয়াটা সঠিক নয়, কারণ তাদের কর্মকাণ্ডের ভিন্নতর ক্ষেত্র রয়েছে। বা তাদের একটি/দুটি খারাপ/দুর্বল ভূমিকা বা শুধু বর্তমানকালের ভূমিকা দিয়েই তাদের সার্বিক মূল্যায়ন সঠিক নয়।

একইসাথে সাধারণভাবে একজন বুদ্ধিজীবীকে আমরা সংগ্রাম করি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মোচনের প্রয়োজনে, তার ত্রুটিকে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনে। কারণ, এসবের এক বিশাল প্রভাব থাকে সমাজে, বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও তরুণদের মাঝে, যারা আবার অনেকেই প্রকৃত সমাজতন্ত্রে আকৃষ্ট হতে পারেন, এবং যারা শ্রেণিগতভাবে মূলত শ্রমিক-বিপ্লবের মিত্র। একজন ব্যক্তিকে নিন্দা করা বা তার প্রতি ঘৃণা উদগীরণ করা বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে সাধারণত আমাদের নীতি নয়, যদিনা তার ভূমিকা খুবই গণবিরোধী হয়।

তার গুরুতর রাজনৈতিক অধঃপতন ও গণবিরোধী ভূমিকা না থাকলে তাকে ব্যক্তিগতভাবে গালাগালি করাটা আমাদের অগ্রসর রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ জাতীয় বিপ্লবাত্মক বাম গালাগালিতে যতই লাল রং দেয়া হোক না কেন সেটা নিজেই আসলে পেটি বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও কৌশল। যা আমাদের বিরোধী পক্ষকেই শক্তিশালী করে। ব্যক্তিগত আক্রমণ মতাদর্শগত-রাজনৈতিক সংগ্রামকে দুর্বল করে, বিতর্ককে বুর্জোয়া পরিসরে নিয়ে যায়, এবং আমাদের ব্রতকে ক্ষতি করে। এটা, যারা বিভ্রান্ত কিন্তু জয় করা যায়, বা অন্তত নিষ্ক্রীয় রাখা যায়, তেমন ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে শত্রুশিবিরে ঠেলে দেয়, বিপক্ষকে প্রতিরোধে শক্তি যোগায়, এবং বিপ্লবী সংগ্রামকে মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

তদুপরি একটা মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন গুরুতর রাজনৈতিক বৈরী ব্যক্তি না হলে তার ভক্তকুলকে আঘাত করাটাও আমাদের জন্য সঠিক কৌশল নয়। ব্যক্তি যদি আক্রমণ করার মত হয় তাহলেও সেক্ষেত্রে স্থান-কাল খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা না বুঝে সর্বত্র সর্বদা একই ঢিল মারা কোনো বিপ্লব-পরিচালনাকারীর কাজ নয়, সেটা শ্রমিক-কৃষক বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিজীবীরা করে থাকেন।

বুদ্ধিজীবীরা বহু ধরনে বিভক্ত। প্রথমত, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমন্ডল আর সরাসরি রাজনৈতিক পরিমন্ডলের নিজস্ব বৈশিষ্ট রয়েছে। সবকিছুকে একাকার করে ফেলা যায়না। বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র অংশই সরাসরি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলীয় চেতনা ধারণ করে। তবে অনেকে আবার বিবিধ রাজনৈতিক দলীয় চেতনা দ্বারা প্রভাবিত। অনেকে আবার সম্পূর্ণতই ‘রাজনীতিবিচ্ছিন্ন’ভাবে নিজেদের চিন্তা, গবেষণা ও জ্ঞানের ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করেন। সবাইকেই রাজনৈতিকভাবে এক মাত্রায় বিবেচনা করা যায়না। সুপার রাজনৈতিক হওয়াটা বহু ক্ষেত্রে বিপ্লবী নয়।

বহু বৈজ্ঞানিক অদৃষ্টবাদী বা ধর্মবাদী হয়ে থাকেন। কিন্তু তাই বলে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মবিশ্বাসের জন্য তাদের যুগান্তকারী বস্তুবাদী আবিষ্কারগুলোর অবদানকে বাতিল করা যায় না। নিউটন ব্যক্তিগতভাবে স্বার্থপর ধরনের লোক ছিলেন, এবং প্রচন্ড ধর্মবাদী ছিলেন। কিন্তু পদার্থবিদ্যায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। তাই সকল বুদ্ধিজীবীদেরকে সরাসরি রাজনৈতিক গণশত্রুদের সাথে একাকার করে দেখা যায় না প্রায় ক্ষেত্রেই। দ্বিতীয়ত, যারা অনেকেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও কাজ করেন, সচেতন মানুষ সেটা করতেই চান, যদি ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় থেকে না হয় তাহলে রাজনৈতিক না হওয়াটাই খারাপ, তারা অনেক ক্ষেত্রেই বুর্জোয়া উদারনৈতিকতা ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ধারক হন, যদিও তাদের একটা অংশ, বিশেষত সমাজতন্ত্রের বিজয়কালে নিজেদেরকে সমাজতান্ত্রিক শিবিরে যুক্ত করেন।

যেমন, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক চেতনা ব্যাপকভাবেই ‘আওয়ামী ’৭১-চেতনা’ দ্বারা প্রভাবিত, যদিও তারা অনেকে আওয়ামী লীগের বহু সমালোচনাও করেন। আবার বহু লোক ভারতীয় হিন্দুত্ববাদকে বা সম্প্রসারণবাদকে বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার দিকে চলে যান, যেগুলো সারমর্মে প্রতিক্রিয়াশীল। যদিও এই উভয় পক্ষেরই বহু মানুষ সৎ, দেশপ্রেমিক, গণবিরোধী নন। যদিও আবার কেউ কেউ সে পর্যায়ে চলেও যান।

বিপ্লব যত এগোয় ততই আন্তরিক ও ত্যাগী গণমুখী ও মানবিক বুদ্ধিজীবীদেরকে সঠিক রাজনীতিতে জয় করার সুযোগ বাড়তে থাকে। কিন্তু তাদের বুর্জোয়া উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা সহজেই পুনর্গঠিত হয়না। তারা সমাজতান্ত্রিক সমাজে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের একটা বড় মজুদ শক্তি হিসেবেই থেকে যায়। কিন্তু বিপ্লবীরা যদি তাদের প্রতি সঠিক হ্যান্ডলিং করতে পারে তাহলে তাদেরকে জয় করা যায়, অনেকটা পুনর্গঠন করা যায়। এর খুবই গুরুত্ব রয়েছে, বিশেষত যতদিন না শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব বড় বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী গড়ে উঠছে। তথাপি মানসিক ও শারীরিক শ্রমের দ্বন্দ্ব সুদীর্ঘদিন থাকবে এবং বুদ্ধিজীবীরা সুদীর্ঘদিন শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবে বিবিধ ঝামেলা সৃষ্টি করে চলবেন, যদিও বিপ্লবে বিশাল ভূমিকাও তারা রেখে চলেন।

তাই বুশের যে কুখ্যাত বুর্জোয়া লাইন "হয় আমার পক্ষে, নতুবা আমার শত্রু" এই লাইনটা আমাদের জন্য উল্টো করে ব্যবহার করলেই সঠিক হবে না। সেটা বুর্জোয়া লাইনই থাকবে। যেমন, বুর্জোয়াদের মত উল্টোশ্রেণির একনায়কত্ব আমরাও চাই, কিন্তু আমরা তাদের মত করে একনায়কত্ব চালাই না। আমরাও প্রতিপক্ষ শ্রেণি হিসেবে বুর্জোয়া শ্রেণি ও তার মতবাদকে দমন করি, কিন্তু তাদের মত করে নয়। আমাদের ধরন ভিন্ন যা প্রথমত, সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির পক্ষে, দ্বিতীয়ত, সমগ্র মানবজাতিকে, সুতরাং বুর্জোয়া মতাবলম্বনকারীদেরও মুক্তির পক্ষে কাজ করে। উল্টো বুশ-লাইন বেশি বিপ্লবী শোনা যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্তভাবে বুর্জোয়া সেবাই করে।

 

* আমাদের সমাজে বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ শাসকশ্রেণির গণশত্রু পার্টিগুলোর ছত্রছায়ায় ব্যক্তিগতভাবেই অধঃপতিত ও সুবিধাবাদী হয়ে পড়ে। এটাকে অস্বীকার করা যাবেনা। এ ধরনের বুদ্ধিজীবী নামের বিক্রি হওয়া মাথাগুলোর সাথে অবশ্যই সমাজ-মানদন্ডে সৎ বা গণমুখী বুদ্ধিজীবীদের, তারা যদি বুর্জোয়া রাজনীতির বিভিন্ন ধারার বিভিন্ন চেতনা দ্বারা প্রভাবিত ও মুগ্ধ থাকেন, বুর্জোয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভক্ত থাকেন, তাদের পার্থক্য করতে হবে।

তাদের বিপরীতে জনগণের পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রামকে অবশই দেখাতে হবে, তাদেরকে প্রশংসা করতে হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে পাল্টা কাউকে বাছ-বিচারহীনভাবে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। এগুলো বিশেষত তরুণদেরকে ভুল ব্যক্তিত্বের ভক্ত বানিয়ে তাদের বিপ্লবী হবার পথে প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলে।

যেমন, রাশিয়ার নিবেদিতপ্রাণ সমাজতন্ত্রী লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির শ্রমিক বিপ্লবের সপক্ষে বিশাল অবদান সত্ত্বেও ও রাজনৈতিকভাবে গোর্কিকে আদর্শ করলে সঠিক হবেনা। অনেকেই হয়তো জানেন যে, গোর্কি রুশ বিপ্লবের আগে কখনই লেনিনের সমর্থক ছিলেন না এবং তিনি বলশেভিক বিরোধী একটি উপদলে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু শ্রমিক-বিপ্লবের সপক্ষে তার অবদান ছিল বিশাল। তিনি প্রধানত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যেমনটা ছিল প্লেখানভ বা ট্রটস্কি। গোর্কি ছিলেন সাহিত্য-পরিমন্ডলের লোক - বুদ্ধিজীবী। 

আমাদের দেশে গোর্কির চেয়ে কম শ্রমিক-বান্ধব বাম বুদ্ধিজীবী ড.শরীফ বা হুমায়ূন আজাদ - এদেরকে আদর্শ করার আরো বেশি প্রশ্ন আসে না। তারা বিদ্রোহী বটেন, ব্যবস্থার বিরোধীও ছিলেন, কিন্তু তারা ব্যবস্থার সাংস্কৃতিক বহু কিছুকে ধারণও করতেন। তারা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ব্যাপক বিভ্রান্তিতেও ভুগেছেন। তারা জাতীয়তাবাদেও প্রভাবিত অনেকটাই ছিলেন। কিন্তু তারা জনগণের পক্ষে ছিলেন, যদিও ড.আজাদকে শেষ পর্যায়ে সমাজতন্ত্রের পক্ষাবলম্বী বুদ্ধিজীবী বলা যায় না। 

সমাজতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী বিকাশের সময়টার পর অনেক সমাজতন্ত্রী, যারা আন্তরিক ত্যাগী গণমুখী - তারা সংশোধনবাদে নিমজ্জিত হয়েছেন। কিন্তু সংশোধনবাদের জন্য তাদের সমস্ত জীবনকে কেটে ফেলাটা বুদ্ধিহীন কাজ। যেমন, গুরুতর সংশোধনবাদী বিচ্যুতি সত্ত্বেও রুশ-চীন মহাবিতর্ক পূর্ব ভারতীয়/পাকিস্তানি কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহ্য শ্রমিক-বিপ্লবেরই অংশ। তাকে পরিপূর্ণ বর্জন করে তৎপূর্ব কমিউনিস্টদের সকল ত্যাগী ও ইতিবাচক ইতিহাসকে পরবর্তী রুশ-দালালদের হাতে তুলে দেয়াটা কোনো বু্িদ্ধমত্তার কাজ নয়। এমনকি প্লোখানভের মত কট্টর বলশেভিক বিরোধী সংশোধনবাদী উচ্চ রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রেও তার সংশোধনবাদী জীবনের থেকে তার তৎপূর্ব মার্কসবাদী অবদানকে লেনিন পৃথক করে দেখিয়েছিলেন।

 

* কিন্তু এ তো গেল একদিকের বিষয়। কিন্তু উপরোক্ত পেটি বুর্জোয়া বামপন্থার বিরোধিতার নামে সর্বদাই যেমনটা ঘটে, বুর্জোয়া উদারনৈতিকতা ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পচা লাশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য থেকেই দুর্গন্ধ ছোটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যাকে অনেক মধ্যবিত্ত বাম ও ভালমানুষরা সমর্থন করতে স্বস্তি বোধ করেন, সে সম্পর্কে সতর্কতার অভাবে।

প্রথমত, তাদের মতাদর্শ-রাজনীতিটা অনেকটা খ্রিষ্টীয় সেই নীতিকথার মত যাতে বলা হচ্ছে “পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর”। কিন্তু ব্যক্তি-তো তার মতাদর্শ-রাজনীতি নিরপেক্ষ নয়। সেটা সে বলুক বা না বলুক, বুঝুক বা না বুঝুক। দেখবেন, সেলিব্রেটিরা প্রায়ই বলতে পছন্দ করে যে, ‘আমি রাজনীতি বুঝিনা’ (বিখ্যাত তসলিমা নাসরিনেরও এরকম বক্তব্য রয়েছে - আমার কাজকে হিন্দুত্ববাদীরা ব্যবহার করলে আমি কী করবো, রাজনীতি-তো আমার কাজ নয়)। কিন্তু ভোটের সময় তারা নিরংকুশভাবে এখন নৌকা বা ধানের শীষেই তো ভোট দেয়! রাজনীতি বোঝে না বটে! (অবশ্য কোদাল কাস্তে এরাও কিছু ভোট পায় বৈকি!)।

ব্যক্তিকে আক্রমণ করা যাবেনা - এটা ঠিক নয়। তাদেরকে আক্রমণ করা যাবে নিশ্চয়ই, তবে রাজনৈতিকভাবে। রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ব্যক্তিকে পৃথক করাটা বুর্জোয়া উদারনৈতিকতার একটা বড় ফতোয়া। 

যখন একজনকে ফ্যাসিবাদের সমর্থক বলে আক্রমণ করা হয়, তখনতো তার রাজনীতিক চরিত্রকে বলাই হচ্ছে। রাজাকার বললে হচ্ছেনা? নাকি সব ব্যাখ্যা তখন তখনই লাগবে? অনেকেই হয়তো জানেন যে, জামাত-নেতা মতিয়ুর নিজামীর ব্যক্তিগত চরিত্র বর্তমান আওয়ামী-বিএনপি নেতাদের চেয়ে অনেক বেশি আদর্শ-ভিত্তিক ও সামাজিকভাবে সৎ ছিল। কিন্তু তার রাজাকারী ও ফ্যাসিবাদী জামাত রাজনীতিতো আর তাতে জায়েজ হতে পারে না। হ্যাঁ, তবে কেউ যদি একজনের ফ্যাসিবাদের ব্যাখ্যা চায় সেটা আপনাকে দিতে হবে। সেটা না করলে তো কোনো মিথ্যা দিয়ে কাউকে হেনস্থা করার পর্যায়ে সেটা চলে যাবে।

এমনকি কোনো পরিপূর্ণ ধরনের রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক-বৈজ্ঞানিক চেতনার মানুষও রাজনৈতিক চরিত্র বিহীন নয়। সর্বদাই একজন বড় বুদ্ধিজীবীর সমগ্র কাজের বিশ্লেষণ করে তারপর তার মূল্যায়ন করার দাবির অর্থ হলো তার রাজনৈতিক ভুল অবস্থানের পথ করে দেয়া। 

কখনো কখনো নিপীড়িত শ্রেণি বিদ্রোহ করেন। তারা সীমা অতিক্রম করেন। দেখুন, এবারকার মার্কিনের বর্ণবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক বিদ্রোহেও বুর্জোয়া ব্যক্তিত্বদের মূর্তি ভাঙ্গার খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচিটিকে। ইতিহাসকে পুনর্লিখনের সাহসী চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু কতজন জানেন চার্চিলের ভূমিকা? ওয়াশিংটন বা জেফারসন তো আরো পরে। কিন্তু বিদ্রোহী মানুষ বুদ্ধিজীবীদের পন্ডিতি বিশ্লেষণের জন্য বসে থাকেননি। আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথের মত বিশাল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে বিশ্লেষণ ও সঠিক সংগ্রাম করে কতটা আলোচনা করা সম্ভব হয়েছে? কিন্তু বিপ্লবী ও অশিক্ষিত অমার্জিত শ্রমিক কৃষক কি সেধরনের বড় পুস্তকের জন্য বসে থাকবেন রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের জন্য? নাকি অগ্রসর বিপ্লবীরা তাদেরকে পথ দেখাবেন? রবীন্দ্রনাথ তার জীবনব্যাপী কখনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ চাননি, যদিও খুব ব্যতিক্রমভাবে ব্রিটিশের কিছু কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তার মোলায়েম সমালোচনা ও তার এই মক্কা সম্পর্কে তার হতাশা প্রকাশ পেয়েছে।

মাও বলেছিলেন প্রথমে ধ্বংস, পরে গঠন। আসলে বিপ্লবে ধ্বংসের প্রক্রিয়াতে গঠনটি হয়, বিপরীত নয়। তিনি আরো বলেছিলেন, কোনো সঠিক রূপান্তর সীমা অতিক্রম ছাড়া হতে পারেনা। কলকাতায় নকশালপন্থীরা ’৭০-দশকে ব্রিটিশ-পন্থী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মূর্তি ভেঙ্গেছিলেন। সেখানে কৌশলগত ত্রুটি নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, যাকিনা নক্সাল আন্দোলনে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সেসময়টাতে কার্যকর ছিল। কিন্তু নীতিগত দিকটাকে না দেখে, তাকে তুলে না ধরে কৌশলগত ত্রুটি নিয়ে অতিউৎসাহ আসলে নীতিগত বিচ্যুতিরই ভিন্নরূপী প্রকাশ। যা উদারনৈতিকতার একটি বৈশিষ্ট্য।

প্রত্যেক বুদ্ধিজীবীরই সচেতন বা অসচেতন রাজনৈতিক অবস্থান থাকে, বিশেষত যারা রাজনৈতিক পরিমন্ডলে কম/বেশি বিচরণ করেন, তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভুলে গেলে চলবেনা, সেগুলোকে আড়ালে ফেলে দিলে চলবেনা। উদারনৈতিক বুদ্ধিজীবীরা ‘সময় হয়নি’, ‘হঠকারী করা যাবেনা’, ‘ব্যক্তিকে আক্রমণ করা যাবেনা’ - এসব কথার আড়ালে কার্যত সেগুলোর পথ করে দেয়, এমনকি তার পক্ষাবলম্বনেও চলে যায়। সিপিবি-কে দেখুন। টলস্টয়ের মত এক সাধুসদৃশ মানবতাবাদী প্রায় বিপ্লবাত্মক বুদ্ধিজীবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করে রবীন্দ্রনাথকে শুধু পড়তেই বলেনা, বাস্তবে রবীন্দ্রনাথের জয়গানে মত্ত হয়। এসব থেকে সতর্ক না থাকলে কৃষক-শ্রমিকের পক্ষে কাজ করা যায় না।

বেশ অনেক বড় বুদ্ধিজীবীর কেউ কেউ রাজনৈতিকভাবে একেবারে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা নেন। নিশ্চয়ই তাদেরকে নিন্দা করতে হবে। এমনকি তারা সেরকম না হলেও তাদের বুর্জোয়া চিন্তাধারা বা সংস্কারবাদ ন্যায্য হয়ে যায়না। বিশেষ করে যখন এদের কেউ কেউ সমাজতন্ত্রের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির পক্ষাবলম্বনে চলে যান, কেউ কেউ নিজেদেরকে বিক্রিও করে দেন। কিন্তু সবাই সেভাবে উন্মোচিত থাকেননা। বিশেষত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত অংশটির বহু মানুষ তাদের দ্বারা প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হন।

তবে আগেই যেরকমটি বলা হয়েছে যে, সবকিছুর একটা সময় রয়েছে, স্থানকে বিবেচনা করতে হয়, আপনার অডিয়েন্সকে বিবেচনা করতে হবে, আপনাকে সত্যনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক হতে হবে, আপনাকে বুর্জোয়া অশ্লীলতা ও ব্যক্তিগত কুৎসা ছাড়নো থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সবকিছুতে কৌশলগত বিষয়ও রয়েছে। সেটা না বুঝলে আমাদের ব্রতকেই আমরা ক্ষতি করবো। সেটা যেন আমরা ভুলে না যাই। এবং কোনো ক্রমেই যেন বুর্জোয়া উদারনৈতিকতার শুভ্র মাদকে আসক্ত না হয়ে পড়ি।

 

* আরেকটা বিষয় হলো, আমরা কোথায় কতটুকু গুরুত্ব দেবো। বুর্জোয়া ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে বহু সময়েই তা নয়। সবকিছুতেই আমাদের প্রতিক্রিয়া জানানোর অভ্যাস আবারো বুর্জোয়া-মধ্যবিত্তের গন্ডিতে থাকার সুখকেই সেবা করবে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া নামের এক ফাঁদে পড়ে আমাদেরও, শিক্ষিত তরুণদের মতো, অনেকে আসক্ত। 

সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব করোনাকালে অনেকটাই বেড়েছে, বিশেষত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত অংশের মাঝে। কিন্তু আগেও যেমন ছিল, এখন তার চেয়ে বেশি করে এসবের বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় ‘স্ট্যাটাস’ নামের আবর্জনা। বাস্তবে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ কার্যত ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’র একটি বড় হাতিয়ার ব্যতীত কিছু নয়। এটা সৃজনশীল মানুষদের সময়হরণকারী এক গুরুতর আসক্তি। মানুষের সামাজিক বাস্তব সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্নকারী ‘ঘরে থাকা থেরাপি’ জাতীয় অলস তরুণদেরকে এটা ব্যাপকভাবে অধঃপাতে নিতে ভূমিকা রাখছে।

পাশাপাশি এর একটি প্রচার গুরুত্ব এই ব্যবস্থায় নিশ্চয়ই রয়েছে। বিশেষত যখন করোনার কারণে মানুষকে বাধ্যতামূলক ঘরবন্দি করা হয়েছে, এবং তরুণদেরকেও, তখন পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য এর গুরুত্ব বেড়ে গেছে। কোনো কোনো নাগরিক অভ্যুত্থানে এটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু একে কোনোক্রমেই বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিকল্প করা উচিত নয়। যেকোনো বিষয়ে কথাবার্তা চালানো, বা মধ্যবিত্তসুলভ বিতর্কে জড়ানোটা আমাদের কাজ নয়। এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এটা মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নেশা। আমাদের দেশের শ্রমিক, দরিদ্র, কৃষকরা তাদের শিক্ষাগত ও জীবিকাগত কারণেই এতে সংযুক্ত হতে পারেন না। এই ‘স্ট্যাটাস’ অভ্যাস আপনাকে আপনার মূল শ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং মধ্যবিত্তসুলভ কুবিতর্কে আসক্ত করার জন্য বিরাট নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সুতরাং বুদ্ধিজীবী মাত্রই তার উপর আমাদের কথা বলতে হবে, তাকে গুরুত্ব দিতে হবে, অযথা কূটতর্কে জড়াতে হবে, অন্যের মতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে হবে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় চলে যেতে হবে - এসব কোনোটাই আমাদের মূল কাজের জন্য উপযুক্ত নয়।

 

আমাদের কর্মীদের উচিত হবে শ্রমিক-বিপ্লবের পক্ষে/বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের আলোচনায় সম্ভব হলে সক্রিয় থাকা। কিন্তু আসল কাজ না করে - শ্রমিক-কৃষকের সাথে সরাসরি না মিশে তাদেরকে সচেতন করার কাজে অংশ না নিয়ে তাদেরকে সংগঠিত করার কাজকে অবহেলা করে - এসব কুবিতর্কে মেতে থাকাটা এক ধরনের অপসংস্কৃতি। এ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। নইলে শ্রমিক কৃষক দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের সাথে সত্যিকার মেশা ও তাদের বাস্তব জীবন সম্পর্কে আপনি ভুলে যাবেন, ধীরে ধীরে সেটাই আপনার ধারা হয়ে যাবে অভ্যাসের ও সংস্কৃতির। নিজের সর্বনাশ করবেন।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র