• বৃহঃস্পতিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩০
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’র ২৫ বছর প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার রজতজয়ন্তী
পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’র ২৫ বছর প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার রজতজয়ন্তী

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

বৃহঃস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

২ ডিসেম্বর’২২  পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ উপলক্ষ্যে জনসংহতি সমিতি ও তিন পার্বত্য জেলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। টিভি-রেডিওতে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় আওয়ামীপন্থি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা এবং জাতিসত্তার বুদ্ধিজীবীরাও নিজ নিজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’র ২৫ বছরে তিন পার্বত্য জেলায় শান্তির নহর বইয়ে দেয়ার ফিরিস্তি রয়েছে। বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা যে ফিরিস্তি গেয়েছে তার সারসংক্ষেপ হলো–

 শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে রাস্তাঘাট, সেতু এবং শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে; অর্থনৈতিকভাবে পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে এবং পর্যটন শিল্পে বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই সব উন্নয়নের ‘সুফল’ কারা ভোগ করছেন? বাঙালি বড়ধনী শ্রেণি আর পাহাড়ি নব্য বুর্জোয়া দালাল শ্রেণি, নাকি ব্যাপক নিপীড়িত পাহাড়ি জনগণ? 

আওয়ামী সরকারের পক্ষে বলা হচ্ছে শান্তিচুক্তির ৭২ ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং ১৫টি ধারার আংশিক বায়স্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু বাকী ৯টি ধারার উপর কোনো কথা নেই। কিন্তু শান্তিচুক্তির অপর পক্ষ জনসংহতি সমিতি বলছে ৭২ ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৮টি আংশিক এবং বাকী ২৯টি সম্পূর্ণ অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তা হলে দেখা যাচ্ছে শান্তি চুক্তির পক্ষ দুটির মধ্যে তথ্যেরও বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।

 কিন্তু পাহাড়িদের মৌলিক সমস্যাগুলো– যার মাঝে রয়েছে, এ অঞ্চলের পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, সেনাপ্রত্যাহার, পুনর্বাসিত বাঙালি সমস্যার সমাধান ও বিশেষত ভূমি সমস্যার সমাধান– এসবের কিছুই কার্যত হয় নি। শান্তিচুক্তির পর পরই আমাদের “আন্দোলন” পত্রিকা বলেছিল– ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি পাহাড়ে শান্তি আনবে না, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টি করবে’ (ডিসেম্বর ’৯৭)। শত শত প্রাণহানির মধ্য দিয়ে তা এখন জাজ্বল্যমান সত্য।

* এই চুক্তির ২৫ বছর পরও পাহাড়ি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসনের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে জাতিগত সমস্যার সমাধান হয়নি। তাদের পৃথক জাতিগত সত্তাকে পর্যন্ত সাংবিধানিকভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। তারাই যে পাহাড়ের প্রকৃত ও আদি অধিবাসী, সে সত্যকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।

* নিজ বাসভূমে পাহাড়িদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করার চক্রান্তের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পুনর্বাসিত বাঙালিদের সমতলে ফেরত নেয়নি বা পাহাড়ে সেটেল হওয়া দরিদ্র বাঙালিদের সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধানও করেনি। বরং দরিদ্রশ্রেণির পাহাড়ি-বাঙালিদের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বাধিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটছে।

* পাহাড়িদের ভূমি সমস্যার কোনো সমাধান করেনি। জমির দলিল থাক বা না থাক পাহাড়ি জমিতে বসবাসরত পাহাড়িরাই জমির প্রকৃত মালিক– এই নীতির ভিত্তিতে ভূমি সমস্যার কোনো সমাধান করেনি। নামকাওয়াস্তে যে ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে তারা বিগত ২৫ বছরেও ভূমির সমস্যা সমাধান করেনি, করতে পারবেও না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কাছে (১ ডিসেম্বর’২২ তথ্যমতে) ২২ হাজারের অধিক আবেদন জমা পড়ে আছে, যার একটিরও সমাধান হয় নি। কারণ কমিশনের বিধিমালা প্রণীত হয়নি। বরং বিভিন্ন সন্ত্রাসসহ রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পাহাড়িদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনী, ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পার্বত্য এলাকার হাজার হাজার একর জমি লিজ নিয়ে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে সেখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট গড়ে তুলছে। এভাবে তারা পাহাড়ের বিপুল বৈচিত্রসম্পন্ন পরিবেশ ও প্রকৃতিরও সর্বনাশ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়– বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ এবং লামা উপজেলার দুর্গম ম্রো পাড়ায় রাবার কোম্পানির লোকেরা জুমের বাগান পুড়িয়ে দেয়া। লামায় আগুনে প্রায় এক শ একর জুমের ধানসহ বিভিন্ন ফলদ বাগান পুড়ে যায়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণে বহু পাহাড়ি গ্রাম উচ্ছেদ হওয়ার আতঙ্কে রয়েছে। এই এলাকার বসতিরা ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধের ফলে উদ্বাস্তু হয়ে এই সীমান্ত এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। শুধু পাহাড়ি গ্রামই নয়, পাহাড় ও অসংখ্য বন, গাছ কাটা পড়বে। এতে পাহাড়িদের জীবন-জীবিকা ছাড়াও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও হুমকির সম্মুখীন হবে।

* পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়নি এবং কল্পনা চাকমা সহ হাজার হাজার পাহাড়ি জনগণের হত্যাকারী, ধর্ষণকারী, বাড়িঘর ধ্বংসকারীদের বিচারের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

বিগত শান্তি চুক্তির ২৫ বছরেও পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। চুক্তির বিরোধিতা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে প্রসিত খীসার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে গড়ে ওঠে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রোটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ইউপিডিএফ সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি, সেনাবাহিনী তথা রাষ্ট্র এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার উচ্ছেদের সংগ্রামে পাহাড়িদের সংগঠিত করে না। বরং কিছু সংস্কারবাদী দাবিদাওয়ার আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকে। মার্কিনসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করতে ভয় পায়। এটিও ২০১৭ সালে বিভক্ত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠেছে। জনসংহতি ও ইউপিডিএফসহ এই গ্রুপগুলো সশস্ত্র ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পাহাড়ে খুন-অপহরণ হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এগুলোকে মদদের সাথে সেনাবাহিনী সহ বাঙালি ধনীরা যুক্ত। যার মাধ্যমে “ভাগ কর এবং শাসন কর”– এই সাম্রাজ্যবাদী নীতি প্রয়োগ হচ্ছে। এই সংগঠনগুলোর অনেকে শাসকশ্রেণির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে।

জনসংহতি সমিতি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি নিপীড়িত জনগণের সাথে বিশ্বঘাতকতা করেছে এবং বাঙালি শাসকশ্রেণির পদলেহন করে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পাচ্ছে। ইউপিডিএফ সহ অন্য সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সশস্ত্র সংঘাত করলেও পাহাড়িদের আসল শত্রু সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক শোষকদেরকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছে না। তাদেরকে উচ্ছেদে বিপ্লবী সংগ্রাম করছে না। অথচ জানা যায় যে, সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে তারা ঠিকই সশস্ত্রতা প্রয়োগ করে চাঁদাবাজি করছে এবং ভিন্নমতের পাহাড়িদেরকে হত্যা করছে।

২৫ বছর আগে শান্তি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিনই পাহাড়ি জনগণের ব্যাপক অংশ খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে কালো পতাকা প্রদর্শন করে শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। হাসিনা সরকার ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির  চুক্তিকে পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের ব্যাপক জনগণ বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাই শান্তিচুক্তির ২৫ বছর হলো প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার রজতজয়ন্তী। একে নিপীড়িত পাহাড়িদের উৎসব হিসেবে না দেখে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এবং নিপীড়িত বাঙালি-পাহাড়িদের অভিন্ন শত্রুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলো মাওবাদী আদর্শে সজ্জিত হয়ে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তোলা।

পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’র ২৫ বছর প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার রজতজয়ন্তী

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
বৃহঃস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

২ ডিসেম্বর’২২  পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ উপলক্ষ্যে জনসংহতি সমিতি ও তিন পার্বত্য জেলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। টিভি-রেডিওতে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় আওয়ামীপন্থি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা এবং জাতিসত্তার বুদ্ধিজীবীরাও নিজ নিজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে পার্বত্য ‘শান্তি চুক্তি’র ২৫ বছরে তিন পার্বত্য জেলায় শান্তির নহর বইয়ে দেয়ার ফিরিস্তি রয়েছে। বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা যে ফিরিস্তি গেয়েছে তার সারসংক্ষেপ হলো–

 শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে রাস্তাঘাট, সেতু এবং শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে; অর্থনৈতিকভাবে পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে এবং পর্যটন শিল্পে বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই সব উন্নয়নের ‘সুফল’ কারা ভোগ করছেন? বাঙালি বড়ধনী শ্রেণি আর পাহাড়ি নব্য বুর্জোয়া দালাল শ্রেণি, নাকি ব্যাপক নিপীড়িত পাহাড়ি জনগণ? 

আওয়ামী সরকারের পক্ষে বলা হচ্ছে শান্তিচুক্তির ৭২ ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং ১৫টি ধারার আংশিক বায়স্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু বাকী ৯টি ধারার উপর কোনো কথা নেই। কিন্তু শান্তিচুক্তির অপর পক্ষ জনসংহতি সমিতি বলছে ৭২ ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৮টি আংশিক এবং বাকী ২৯টি সম্পূর্ণ অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তা হলে দেখা যাচ্ছে শান্তি চুক্তির পক্ষ দুটির মধ্যে তথ্যেরও বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।

 কিন্তু পাহাড়িদের মৌলিক সমস্যাগুলো– যার মাঝে রয়েছে, এ অঞ্চলের পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, সেনাপ্রত্যাহার, পুনর্বাসিত বাঙালি সমস্যার সমাধান ও বিশেষত ভূমি সমস্যার সমাধান– এসবের কিছুই কার্যত হয় নি। শান্তিচুক্তির পর পরই আমাদের “আন্দোলন” পত্রিকা বলেছিল– ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি পাহাড়ে শান্তি আনবে না, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সৃষ্টি করবে’ (ডিসেম্বর ’৯৭)। শত শত প্রাণহানির মধ্য দিয়ে তা এখন জাজ্বল্যমান সত্য।

* এই চুক্তির ২৫ বছর পরও পাহাড়ি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসনের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে জাতিগত সমস্যার সমাধান হয়নি। তাদের পৃথক জাতিগত সত্তাকে পর্যন্ত সাংবিধানিকভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। তারাই যে পাহাড়ের প্রকৃত ও আদি অধিবাসী, সে সত্যকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।

* নিজ বাসভূমে পাহাড়িদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করার চক্রান্তের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পুনর্বাসিত বাঙালিদের সমতলে ফেরত নেয়নি বা পাহাড়ে সেটেল হওয়া দরিদ্র বাঙালিদের সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধানও করেনি। বরং দরিদ্রশ্রেণির পাহাড়ি-বাঙালিদের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বাধিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটছে।

* পাহাড়িদের ভূমি সমস্যার কোনো সমাধান করেনি। জমির দলিল থাক বা না থাক পাহাড়ি জমিতে বসবাসরত পাহাড়িরাই জমির প্রকৃত মালিক– এই নীতির ভিত্তিতে ভূমি সমস্যার কোনো সমাধান করেনি। নামকাওয়াস্তে যে ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে তারা বিগত ২৫ বছরেও ভূমির সমস্যা সমাধান করেনি, করতে পারবেও না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কাছে (১ ডিসেম্বর’২২ তথ্যমতে) ২২ হাজারের অধিক আবেদন জমা পড়ে আছে, যার একটিরও সমাধান হয় নি। কারণ কমিশনের বিধিমালা প্রণীত হয়নি। বরং বিভিন্ন সন্ত্রাসসহ রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পাহাড়িদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনী, ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পার্বত্য এলাকার হাজার হাজার একর জমি লিজ নিয়ে পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে সেখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট গড়ে তুলছে। এভাবে তারা পাহাড়ের বিপুল বৈচিত্রসম্পন্ন পরিবেশ ও প্রকৃতিরও সর্বনাশ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়– বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ এবং লামা উপজেলার দুর্গম ম্রো পাড়ায় রাবার কোম্পানির লোকেরা জুমের বাগান পুড়িয়ে দেয়া। লামায় আগুনে প্রায় এক শ একর জুমের ধানসহ বিভিন্ন ফলদ বাগান পুড়ে যায়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণে বহু পাহাড়ি গ্রাম উচ্ছেদ হওয়ার আতঙ্কে রয়েছে। এই এলাকার বসতিরা ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধের ফলে উদ্বাস্তু হয়ে এই সীমান্ত এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। শুধু পাহাড়ি গ্রামই নয়, পাহাড় ও অসংখ্য বন, গাছ কাটা পড়বে। এতে পাহাড়িদের জীবন-জীবিকা ছাড়াও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও হুমকির সম্মুখীন হবে।

* পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়নি এবং কল্পনা চাকমা সহ হাজার হাজার পাহাড়ি জনগণের হত্যাকারী, ধর্ষণকারী, বাড়িঘর ধ্বংসকারীদের বিচারের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

বিগত শান্তি চুক্তির ২৫ বছরেও পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। চুক্তির বিরোধিতা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে প্রসিত খীসার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে গড়ে ওঠে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রোটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ইউপিডিএফ সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি, সেনাবাহিনী তথা রাষ্ট্র এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার উচ্ছেদের সংগ্রামে পাহাড়িদের সংগঠিত করে না। বরং কিছু সংস্কারবাদী দাবিদাওয়ার আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকে। মার্কিনসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করতে ভয় পায়। এটিও ২০১৭ সালে বিভক্ত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন গড়ে উঠেছে। জনসংহতি ও ইউপিডিএফসহ এই গ্রুপগুলো সশস্ত্র ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পাহাড়ে খুন-অপহরণ হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এগুলোকে মদদের সাথে সেনাবাহিনী সহ বাঙালি ধনীরা যুক্ত। যার মাধ্যমে “ভাগ কর এবং শাসন কর”– এই সাম্রাজ্যবাদী নীতি প্রয়োগ হচ্ছে। এই সংগঠনগুলোর অনেকে শাসকশ্রেণির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে।

জনসংহতি সমিতি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি নিপীড়িত জনগণের সাথে বিশ্বঘাতকতা করেছে এবং বাঙালি শাসকশ্রেণির পদলেহন করে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পাচ্ছে। ইউপিডিএফ সহ অন্য সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সশস্ত্র সংঘাত করলেও পাহাড়িদের আসল শত্রু সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক শোষকদেরকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছে না। তাদেরকে উচ্ছেদে বিপ্লবী সংগ্রাম করছে না। অথচ জানা যায় যে, সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে তারা ঠিকই সশস্ত্রতা প্রয়োগ করে চাঁদাবাজি করছে এবং ভিন্নমতের পাহাড়িদেরকে হত্যা করছে।

২৫ বছর আগে শান্তি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিনই পাহাড়ি জনগণের ব্যাপক অংশ খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে কালো পতাকা প্রদর্শন করে শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। হাসিনা সরকার ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির  চুক্তিকে পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের ব্যাপক জনগণ বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাই শান্তিচুক্তির ২৫ বছর হলো প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার রজতজয়ন্তী। একে নিপীড়িত পাহাড়িদের উৎসব হিসেবে না দেখে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এবং নিপীড়িত বাঙালি-পাহাড়িদের অভিন্ন শত্রুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলো মাওবাদী আদর্শে সজ্জিত হয়ে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তোলা।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র