চীন-ভারত দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ- উত্তেজনা আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে প্রভাব ফেলছে
আন্দোলন প্রতিবেদন
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২০ | অনলাইন সংস্করণ
গত ১৫ জুন ’২০ লাদাখের গালওয়ানা উপত্যকায় ভারত ও চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের সেনাবাহিনী হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভারতীয় ২০ সেনা নিহত এবং ৭৬ জন আহত ও অন্তত ১০ জন চীনের হাতে গ্রেফতার হয়। ভারতের দাবি অনুসারে তারাও প্রায় ৫০ জন চীনা সেনাকে হতাহত করেছে। চীন তার সেনাবাহিনীর হতাহতের ঘটনা স্বীকার করেনি। বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের সময় সর্বদাই মিথ্যা তথ্য দেয়। লাদাখ ঘটনা তার ব্যতিক্রম নয়। এ ঘটনার পর দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হলেও সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং দুই পক্ষই সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে ভারতকে মদদ দিচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প।
১৯৭৫ সালের পর ভারত-চীনের এ ধরনের সংঘর্ষ-উত্তেজনা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও তার সাথে যুক্তভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতির উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা যায়। বর্তমানে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠছে। চীন-ভারত দ্ব›দ্ব এবং চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব তাকে আরো তীব্র করে তুলছে।
১৯৬২ সালে যখন চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল তখন চীন ছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসন প্রতিহত করাই ছিল তখন তার লক্ষ্য। কিন্তু ভারত মার্কিনের উস্কানিতে সমাজতান্ত্রিক চীন আক্রমণ করেছিল, কিন্তু ভারত পুরোপুরি পরাজিত হয়েছিল। পরবর্তী বিরোধগুলোরও একই লক্ষে প্রতিহত করেছিল চীন। কিন্তু ’৭৬ পরবর্তী সংশোধনবাদী নেতৃত্ব চীনের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর পর্যায়ক্রমে চীন সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রকাশ হিসেবে ৩য় বিশ্বের দেশে দেশে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, পুঁজি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে এবং বাংলাদেশেও তা করছে। কোন কোন দেশে বিভিন্ন অজুহাতে সামরিক শক্তি বিনিয়োগ করেছে। ২০১৭ সালে চীনা পার্টির ১৯তম কংগ্রেসে ২০৫০ সালের মধ্যে চীনকে বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এসবই চীন সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করছে। যা বিশ্ব ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিনের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মার্কিন-চীন দ্বন্দ্ব বাণিজ্য যুদ্ধ, বাকযুদ্ধ, সামরিক মহড়া, চীন বিরোধী জোট গঠনের হুমকিসহ বহু পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এখন তীব্র হচ্ছে।
১৯৭৬ পর্যন্ত চীন যখন প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক দেশ ছিল তখন মার্কিন ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের মদদে ভারত চীনের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল। চীনকে ধ্বংস করার জন্য তার বিরুদ্ধে একাধিকবার আগ্রাসী আক্রমণ চালিয়েছিল। ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে পুঁজি করে তৎকালীন মার্কিন-সোভিয়েত দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের সুযোগে ভারত বাংলাদেশের ঊঠতি আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের দালাল সংগঠন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর ষড়যন্ত্র হিসেবে পাকিস্তানকে আক্রমণ করে। ‘মুক্তিযুদ্ধের’ সহযোগিতার নামে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং দালাল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসায়। এগুলো ভারতের প্রধান শত্রু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চালিত হলেও এ অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রভাব কমানো এবং বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন দমন করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল।
তাছাড়া ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করে আছে। বাংলাদেশ তার অন্যতম শিকার। এ অঞ্চলে সকল প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ভারতের সম্প্রসারণবাদী কার্যক্রমের জন্য সবগুলো দেশের জাতি ও জনগণ দ্বারা চরমভাবে ঘৃণিত। ভারতীয় শাসকশ্রেণির সবগুলো দল এবং সংশোধনবাদী সংগঠনগুলো এই সম্প্রসারণবাদী অপতৎপরতার সক্রিয় সমর্থক। যে লাদাখে চীন-ভারত সংঘর্ষ হয়েছে এবং উত্তেজনা চলছে সেটি কাশ্মীরের অংশ। কাশ্মীর নিয়ে ভারতীয় শাসকশ্রেণির এবং নরেন্দ্র মোদি সরকার যে নারকীয় ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে বিশ্ববাসী তা জানে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসন এবং সে সব দেশে জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নির্মমভাবে দমন-নিপীড়ন সম্পর্কেও সবার জানা। ভারতীয় শাসকশ্রেণির উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদ ভারতীয় জনগণকে কলুষিত করে এই সব আগ্রাসন/দখলদারিত্বের পক্ষে জনমত সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে।
বর্তমানে চীন-বিরোধী এ যুদ্ধ-তৎপরতার পেছনে ভারতের সক্রিয় সমর্থক হলো মার্কিনী ট্রাম্প প্রশাসন, যে কিনা চীনকে দুর্বল করার জন্য ভারতকে ব্যবহার করতে চাইছে। ভারতের মোদি সরকারও ক্রমান্বয়ে মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বে মার্কিনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। গত ২০ জুলাই বঙ্গোপসাগরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নৌবাহিনী সামারিক যৌথ মহড়া করেছে। আর চীনও নিজের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার এবং বিশ্বপরিসরে নিজের শক্তিমত্তার প্রদর্শন করে চলেছে।
উপরেই উল্লেখ করা হয়েছে আজকের চীন সমাজতান্ত্রিক নয়, বরং সে হলো একটি নব্য উদীয়মান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যে কিনা এখন বিশ্ব-প্রভুত্ব নিয়ে মার্কিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। আর চীন-ভারত দ্বন্দ্বে মার্কিন ও রাশিয়াÑ এই দুই পরাশক্তিই নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে তোলায় ব্যস্ত। মার্কিনসহ তার মিত্র দেশগুলো এবং রাশিয়া উভয়ে ভারতকে নিজ বলয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং অস্ত্র বিক্রির সুযোগ ব্যবহার করছে। ভারতও এই উভয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বায়না দিয়েছে। একইসাথে নিজেদের চীন-বিরোধী বড়শক্তি দেখাতে গিয়ে দেশে চীনা-পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে। এগুলো করে তারা তেমন কোনো সুবিধা করতে পারছে না। কারণ ভারত নিজেরাই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর একটি রাষ্ট্র। তারা চীনা পণ্য বর্জনের ডাক দিয়ে নিজেরাই সমস্যায় পড়েছে। কারণ ভারত যে ঔষধ তৈরি করছে তার কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করতে হয়। এছাড়া বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি তারা চীন থেকে করে যা রাতারাতি দেশীয় পণ্য দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয়। বিপুল পরিমাণ চীনা-পণ্য বর্জনের ডাক ইতিমধ্যেই ব্যর্থ প্রমাণিত হচ্ছে। উপরন্তু, এসবের মধ্য দিয়ে তারা এই করোনাকালে আরো বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনছে যার পুরো চাপটা পড়বে সেদেশের সাধারণ জনগণের উপর এবং প্রতিবেশি দেশগুলোর উপরও।
চীন-ভারত সীমান্ত দ্বন্দ্ব থেমে নেই। ইতিমধ্যেই নেপাল জনগণের চাপে এবং বর্তমান শাসকদের চীনাপন্থী অংশ এই দ্বন্দ্বের সুযোগে নেপালের মানচিত্র উপস্থাপন করেছে, যা ভারতের সাথে বিতর্কিত তিনটি এলাকায় তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি করছে। যা ছিল নেপালি জনগণের দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি। নেপালের শাসকশেণি তথা সরকারের মধ্যে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। ভারতপন্থী অংশ প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে এ সুযোগে সরিয়ে দিতে চাইছে। ভারতও নেপাল সরকারের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে সরকারকে তার পক্ষে আনার চেষ্টা করছে যা তার দুর্বলতারই প্রকাশ। চীনের শক্তিমত্তা বুঝে ভারত এসময়টাতে নেপালের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, চীনের সাথে নেপালের ক্রমবর্ধিত সম্পর্কের ভয়ে। পূর্ব লাদাখে ভারতীয় এলাকা এখনও চীনা ফৌজের দখলে রয়েছে কি না, বিরোধীদের এই প্রশ্নের মোদি সরকার স্পষ্ট জবাব দিতে পারছে না। কিন্তু গত ১৭ জুলাই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং লাদাখ সীমান্ত সফরে গিয়ে বৃথাই আস্ফালন করেছে- “ভারতের এক ইঞ্চি জায়াগাও কেউ দখলে নিতে পারবে না”।
ভারত-চীন সার্বিক কোনো যুদ্ধ বেধে যাবে কিনা সেটা বহু বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। এই সুযোগে চীন আরেকটি উত্তেজনাকর জায়গা দোকলামে তার শক্তি বাড়িয়েছে। অনেক আগে থেকেই চীন অরুণাচল দাবি করে আসছিল, যা একবার সমাজতান্ত্রিক চীন দখলও করেছিল, কিন্তু শান্তির স্বার্থে তখন ছেড়ে দিলেও দাবি কখনো ছাড়েনি। এখন সাম্রাজ্যবাদী চীন জোরালোভাবে তা তুলে ধরছে। চীন লাদাখের যে অংশ দখল করেছে তাতে ভারত সামরিকভাবে সমস্যায় পড়েছে, যা মার্কিনের জন্যও মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই, সমস্যা আরো তীব্র হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখনি যুদ্ধ বেধে যাবার সম্ভাবনা কম, তবে সেটা মার্কিনের পরিকল্পনার সাথেই অনেকটা জড়িত।
অন্যদিকে রাশিয়া সমঝোতার চেষ্টা করছে, তাতে ভারতের শাসকশ্রেণির রুশপন্থী অংশ যদি মোদি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে তা হলে হয়তো তা কাজে আসতে পারে। যদি ভারত মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান সংকটগুলো উপলব্ধি করে আপসে রাজী হয়। রাশিয়া এই সুযোগ নিতে চাইছে। তবে ঘটনাপ্রবাহ সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের পরিকল্পনা মতোই আগায় না। তাদের মধ্যকার মূল দ্বন্দ্ব তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেওবিকশিত হতে থাকে। সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তা বুঝা যাবে বিশ্ব-পরিসরে ক্রমবর্ধমান চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব সম্পর্কে নজর দিলে।
সম্প্রতি খবরে প্রকাশ যুক্তরাষ্ট্র চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির কথা সক্রিয়ভাবে ভাবছে। চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য বিরোধের পর রাজনৈতিক বিরোধও শুরু হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তাজনিত কৌশলের বিপরীতে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী অবস্থান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের তথ্য গোপনের অভিযোগ, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের উদ্ভাবন চুরি ও প্রতিযোগিতায় অন্যায় সুবিধা গ্রহণ, সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলমানদের জাতিগত নিপীড়ন এবং হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসনের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অভিযোগ। ইতিমধ্যে সংবাদ মাধ্যমের উপর পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পরস্পরের কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। চীনা ৩ নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্র গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো দুটি যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকাকে অস্ট্রেলিয়া ও জাপান স্বাগত জানিয়েছে। মার্কিন মিত্র বৃটেন ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক নির্মাণ কাজ থেকে চীনের প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন ট্রাম্পের চীন বিরোধিতা তার নির্বাচনী কৌশল। ব্যর্থতার কারণে তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভোট পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে ৩০%। এখন যদি ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে পারে অথবা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে তার পুননির্বাচিত হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।
অন্যদিকে চীনও বসে নেই। সম্প্রতি ইরানে ভারতের দ্বারা বন্দর নির্মাণের চুক্তি ইরান বাতিল করেছে। চীনা পণ্য আমদানী ও চীনে তেল রপ্তানির নতুন চুক্তি হয়েছে চীন ও ইরানের মধ্যে। তাতে যে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের ইরানের সাথে ঘনিষ্টতার বৃদ্ধি এবং তার বলয়ে টানার প্রায়াস তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি, বিশেষত আওয়ামী সরকার এ অবস্থায় একটি বড় সংকটে পড়েছে। আওয়ামী লীগ ভারতের মদদ ও হস্তক্ষেপে একনাগাড়ে তিন তিন বার ক্ষমতাসীন হয়েছে এবং আছে। ভারতের বিরুদ্ধে তাদের যাওয়া কঠিন গদীরক্ষার স্বার্থে। কিন্তু চীনের সাথে রয়েছে তার বহু অর্থনৈতিক স্বার্থ। পদ্মাসেতুসহ বাংলাদেশে বিশাল বিশাল অবকাঠামো নির্মাণে রয়েছে চীনা অর্থনৈতিক ও কারিগরি সাহায্য। চীন-ভারত সংঘর্ষের একদিন পরই চীন বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১টি পণ্য রপ্তানিতে ৯৭ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে এবং সম্প্রতি চীনের রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের আরো ৩, হাজার ৯৫ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বলে খবরে প্রকাশ। এগুলো বাংলাদেশকে পক্ষে রাখার জন্য চীনা পদেক্ষেপ। ফলে এই সংঘর্ষে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সরাসরি ভারতের পক্ষ নিয়ে কথা বলা মুশকিল। ভারতের অন্যান্য গণবিরোধী তৎপরতায় ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’-এর অজুহাতে ভারতকে সমর্থন করলেও এবার তারা এখনো পর্যন্ত মুখ বন্ধ রেখেছে। তারা কৌশলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমধানের কথা বলছে। তাদের থিংক ট্যাংক’রাও উভয়ের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখার নসিহত করেছে, যা বিশ্ব-পরিসরে দ্বন্দ্বের আরো বিকাশের পরিস্থিতিতে সম্ভব না-ও হতে পারে। বিশেষত, হাসিনা সরকারের পক্ষে ভারতের মদদ ছাড়া সরকার টিকিয়ে রাখা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে দলে ও সরকারের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বকে বৃদ্ধি করবে এবং কট্টর ভারতপন্থীরা নিরপেক্ষ থাকার বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারে। ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছে যে, বাংলাদেশের মতো বন্ধু ভারতের আর কেউ নেই। আওয়ামীপন্থী কিছু সংগঠন প্রথমদিকে ভারতের পক্ষে এবং চীনের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে দাবি তুলেছিল বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী জোরদার করতে হবে, তারা পুনরায় মাঠে নামবে।
যদি চীন-ভারত দ্বন্দ্ব আরো তীব্র হয়, এমনকি যুদ্ধ বেধে যায় এবং ভারতের সাথে মার্কিনের সম্পর্ক আরো জোরদার হয়ে ওঠে, তাহলে আওয়ামী-হাসিনা সরকার গুরুতর বিপদে পড়বে তাদের প্রভু নির্ধারণের বিষয়ে। চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং ভারত-মার্কিন এদেশে তাদের অনুকূলে শাসক-বদলের উদ্যোগ নিতে পারে তাদের স্বার্থে। আবার সরকার যদি চীনকে বর্জন করে তাহলে অর্থনৈতিক সংকট তার আরো বাড়বে এবং চীনও শাসক-বদলের পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু চীন মার্কিনের মতো অতটা দক্ষ এখনো হয়ে উঠেনি।
উপরন্তু, করোনাকালে যে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে সরকার পড়তে চলেছে এবং সরকারের গণবিরোধিতা ও ব্যর্থতা যেভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। তাতে গণবিক্ষোভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও বাড়ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিরোধী পক্ষগুলো সরকার পতনের বিভিন্নমুখী পদেক্ষেপ নিতে পারে।
বিপ্লবীদের উচিত হবে শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরে বেড়ে চলা দ্বন্দ্বকে কাজে লাগানো, পরিস্থিতির সুযোগ নেয়া এবং ভারতের সম্প্রসারণবাদী ও চীনের বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র এবং মার্কিন-চীন তথা অান্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব উন্মোচন করা; জনগণকে সঠিক পথ দেখানো। লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারতের যুদ্ধ-উত্তেজনা হচ্ছে চীনা সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ- এই দুই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব বা কামড়াকামড়ি। এতে ভারত ও চীনা জনগণের কোনো স্বার্থ নেই। নেই বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের কোনো দেশের জনগণের স্বার্থ। এই দেশ দুটোর জনগণের করণীয় হলো, নিজ নিজ দেশে ‘পরাজয়বাদী’ লাইন গ্রহণ করা এবং পরাজয় বরণের জন্য চীনা সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে বাধ্য করা। একই সাথে জনগণের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সংগ্রামকে বেগবান করা।
এই অঞ্চলে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস-ঐতিহ্য রয়েছে যা এখনও বিদ্যমান এবং ভারতে বিকাশমান। তাই এই অঞ্চল বিপ্লবের ঝটিকা কেন্দ্র হবার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামকে তথাকথিত ‘দেশদ্রোহীতা’র তকমা দিয়ে শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্র আক্রমণ করবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীন-ভারতের এই দ্বন্দ্ব মোকাবেলায় নামে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে সর্বদলীয় ঐক্য চেয়েছিল। ভারতের শাসকশ্রেণির সব পার্টি ইতিমধ্যে এক হয়েছে ‘চীন-বিরোধী’ হুজুগ তুলে এবং তাকে পরিচালিত করতে চাচ্ছে প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক ও মাওবাদী শক্তির বিরুদ্ধে, যারা এই দ্বন্দ্বে জনগণের স্বার্থকে তুলে ধরছে। ভারতসহ এ অঞ্চলের জনগণকে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদকে সংগ্রাম করতে হবে এবং বিপ্লবী সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
চীন-ভারত দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ- উত্তেজনা আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে প্রভাব ফেলছে
গত ১৫ জুন ’২০ লাদাখের গালওয়ানা উপত্যকায় ভারত ও চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের সেনাবাহিনী হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভারতীয় ২০ সেনা নিহত এবং ৭৬ জন আহত ও অন্তত ১০ জন চীনের হাতে গ্রেফতার হয়। ভারতের দাবি অনুসারে তারাও প্রায় ৫০ জন চীনা সেনাকে হতাহত করেছে। চীন তার সেনাবাহিনীর হতাহতের ঘটনা স্বীকার করেনি। বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের সময় সর্বদাই মিথ্যা তথ্য দেয়। লাদাখ ঘটনা তার ব্যতিক্রম নয়। এ ঘটনার পর দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হলেও সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং দুই পক্ষই সীমান্তে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে ভারতকে মদদ দিচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প।
১৯৭৫ সালের পর ভারত-চীনের এ ধরনের সংঘর্ষ-উত্তেজনা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও তার সাথে যুক্তভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতির উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা যায়। বর্তমানে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠছে। চীন-ভারত দ্ব›দ্ব এবং চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব তাকে আরো তীব্র করে তুলছে।
১৯৬২ সালে যখন চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল তখন চীন ছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসন প্রতিহত করাই ছিল তখন তার লক্ষ্য। কিন্তু ভারত মার্কিনের উস্কানিতে সমাজতান্ত্রিক চীন আক্রমণ করেছিল, কিন্তু ভারত পুরোপুরি পরাজিত হয়েছিল। পরবর্তী বিরোধগুলোরও একই লক্ষে প্রতিহত করেছিল চীন। কিন্তু ’৭৬ পরবর্তী সংশোধনবাদী নেতৃত্ব চীনের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর পর্যায়ক্রমে চীন সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রকাশ হিসেবে ৩য় বিশ্বের দেশে দেশে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, পুঁজি বিনিয়োগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে এবং বাংলাদেশেও তা করছে। কোন কোন দেশে বিভিন্ন অজুহাতে সামরিক শক্তি বিনিয়োগ করেছে। ২০১৭ সালে চীনা পার্টির ১৯তম কংগ্রেসে ২০৫০ সালের মধ্যে চীনকে বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এসবই চীন সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করছে। যা বিশ্ব ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিনের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মার্কিন-চীন দ্বন্দ্ব বাণিজ্য যুদ্ধ, বাকযুদ্ধ, সামরিক মহড়া, চীন বিরোধী জোট গঠনের হুমকিসহ বহু পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এখন তীব্র হচ্ছে।
১৯৭৬ পর্যন্ত চীন যখন প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক দেশ ছিল তখন মার্কিন ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের মদদে ভারত চীনের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল। চীনকে ধ্বংস করার জন্য তার বিরুদ্ধে একাধিকবার আগ্রাসী আক্রমণ চালিয়েছিল। ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে পুঁজি করে তৎকালীন মার্কিন-সোভিয়েত দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের সুযোগে ভারত বাংলাদেশের ঊঠতি আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের দালাল সংগঠন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর ষড়যন্ত্র হিসেবে পাকিস্তানকে আক্রমণ করে। ‘মুক্তিযুদ্ধের’ সহযোগিতার নামে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং দালাল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসায়। এগুলো ভারতের প্রধান শত্রু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চালিত হলেও এ অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রভাব কমানো এবং বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন দমন করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল।
তাছাড়া ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করে আছে। বাংলাদেশ তার অন্যতম শিকার। এ অঞ্চলে সকল প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ভারতের সম্প্রসারণবাদী কার্যক্রমের জন্য সবগুলো দেশের জাতি ও জনগণ দ্বারা চরমভাবে ঘৃণিত। ভারতীয় শাসকশ্রেণির সবগুলো দল এবং সংশোধনবাদী সংগঠনগুলো এই সম্প্রসারণবাদী অপতৎপরতার সক্রিয় সমর্থক। যে লাদাখে চীন-ভারত সংঘর্ষ হয়েছে এবং উত্তেজনা চলছে সেটি কাশ্মীরের অংশ। কাশ্মীর নিয়ে ভারতীয় শাসকশ্রেণির এবং নরেন্দ্র মোদি সরকার যে নারকীয় ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে বিশ্ববাসী তা জানে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসন এবং সে সব দেশে জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নির্মমভাবে দমন-নিপীড়ন সম্পর্কেও সবার জানা। ভারতীয় শাসকশ্রেণির উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদ ভারতীয় জনগণকে কলুষিত করে এই সব আগ্রাসন/দখলদারিত্বের পক্ষে জনমত সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে।
বর্তমানে চীন-বিরোধী এ যুদ্ধ-তৎপরতার পেছনে ভারতের সক্রিয় সমর্থক হলো মার্কিনী ট্রাম্প প্রশাসন, যে কিনা চীনকে দুর্বল করার জন্য ভারতকে ব্যবহার করতে চাইছে। ভারতের মোদি সরকারও ক্রমান্বয়ে মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বে মার্কিনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। গত ২০ জুলাই বঙ্গোপসাগরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের নৌবাহিনী সামারিক যৌথ মহড়া করেছে। আর চীনও নিজের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার এবং বিশ্বপরিসরে নিজের শক্তিমত্তার প্রদর্শন করে চলেছে।
উপরেই উল্লেখ করা হয়েছে আজকের চীন সমাজতান্ত্রিক নয়, বরং সে হলো একটি নব্য উদীয়মান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যে কিনা এখন বিশ্ব-প্রভুত্ব নিয়ে মার্কিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। আর চীন-ভারত দ্বন্দ্বে মার্কিন ও রাশিয়াÑ এই দুই পরাশক্তিই নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে তোলায় ব্যস্ত। মার্কিনসহ তার মিত্র দেশগুলো এবং রাশিয়া উভয়ে ভারতকে নিজ বলয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং অস্ত্র বিক্রির সুযোগ ব্যবহার করছে। ভারতও এই উভয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বায়না দিয়েছে। একইসাথে নিজেদের চীন-বিরোধী বড়শক্তি দেখাতে গিয়ে দেশে চীনা-পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে। এগুলো করে তারা তেমন কোনো সুবিধা করতে পারছে না। কারণ ভারত নিজেরাই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর একটি রাষ্ট্র। তারা চীনা পণ্য বর্জনের ডাক দিয়ে নিজেরাই সমস্যায় পড়েছে। কারণ ভারত যে ঔষধ তৈরি করছে তার কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করতে হয়। এছাড়া বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি তারা চীন থেকে করে যা রাতারাতি দেশীয় পণ্য দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয়। বিপুল পরিমাণ চীনা-পণ্য বর্জনের ডাক ইতিমধ্যেই ব্যর্থ প্রমাণিত হচ্ছে। উপরন্তু, এসবের মধ্য দিয়ে তারা এই করোনাকালে আরো বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনছে যার পুরো চাপটা পড়বে সেদেশের সাধারণ জনগণের উপর এবং প্রতিবেশি দেশগুলোর উপরও।
চীন-ভারত সীমান্ত দ্বন্দ্ব থেমে নেই। ইতিমধ্যেই নেপাল জনগণের চাপে এবং বর্তমান শাসকদের চীনাপন্থী অংশ এই দ্বন্দ্বের সুযোগে নেপালের মানচিত্র উপস্থাপন করেছে, যা ভারতের সাথে বিতর্কিত তিনটি এলাকায় তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি করছে। যা ছিল নেপালি জনগণের দীর্ঘদিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি। নেপালের শাসকশেণি তথা সরকারের মধ্যে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। ভারতপন্থী অংশ প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে এ সুযোগে সরিয়ে দিতে চাইছে। ভারতও নেপাল সরকারের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে সরকারকে তার পক্ষে আনার চেষ্টা করছে যা তার দুর্বলতারই প্রকাশ। চীনের শক্তিমত্তা বুঝে ভারত এসময়টাতে নেপালের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, চীনের সাথে নেপালের ক্রমবর্ধিত সম্পর্কের ভয়ে। পূর্ব লাদাখে ভারতীয় এলাকা এখনও চীনা ফৌজের দখলে রয়েছে কি না, বিরোধীদের এই প্রশ্নের মোদি সরকার স্পষ্ট জবাব দিতে পারছে না। কিন্তু গত ১৭ জুলাই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং লাদাখ সীমান্ত সফরে গিয়ে বৃথাই আস্ফালন করেছে- “ভারতের এক ইঞ্চি জায়াগাও কেউ দখলে নিতে পারবে না”।
ভারত-চীন সার্বিক কোনো যুদ্ধ বেধে যাবে কিনা সেটা বহু বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। এই সুযোগে চীন আরেকটি উত্তেজনাকর জায়গা দোকলামে তার শক্তি বাড়িয়েছে। অনেক আগে থেকেই চীন অরুণাচল দাবি করে আসছিল, যা একবার সমাজতান্ত্রিক চীন দখলও করেছিল, কিন্তু শান্তির স্বার্থে তখন ছেড়ে দিলেও দাবি কখনো ছাড়েনি। এখন সাম্রাজ্যবাদী চীন জোরালোভাবে তা তুলে ধরছে। চীন লাদাখের যে অংশ দখল করেছে তাতে ভারত সামরিকভাবে সমস্যায় পড়েছে, যা মার্কিনের জন্যও মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই, সমস্যা আরো তীব্র হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখনি যুদ্ধ বেধে যাবার সম্ভাবনা কম, তবে সেটা মার্কিনের পরিকল্পনার সাথেই অনেকটা জড়িত।
অন্যদিকে রাশিয়া সমঝোতার চেষ্টা করছে, তাতে ভারতের শাসকশ্রেণির রুশপন্থী অংশ যদি মোদি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে তা হলে হয়তো তা কাজে আসতে পারে। যদি ভারত মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান সংকটগুলো উপলব্ধি করে আপসে রাজী হয়। রাশিয়া এই সুযোগ নিতে চাইছে। তবে ঘটনাপ্রবাহ সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের পরিকল্পনা মতোই আগায় না। তাদের মধ্যকার মূল দ্বন্দ্ব তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেওবিকশিত হতে থাকে। সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তা বুঝা যাবে বিশ্ব-পরিসরে ক্রমবর্ধমান চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব সম্পর্কে নজর দিলে।
সম্প্রতি খবরে প্রকাশ যুক্তরাষ্ট্র চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির কথা সক্রিয়ভাবে ভাবছে। চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য বিরোধের পর রাজনৈতিক বিরোধও শুরু হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তাজনিত কৌশলের বিপরীতে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী অবস্থান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের তথ্য গোপনের অভিযোগ, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের উদ্ভাবন চুরি ও প্রতিযোগিতায় অন্যায় সুবিধা গ্রহণ, সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলমানদের জাতিগত নিপীড়ন এবং হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসনের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অভিযোগ। ইতিমধ্যে সংবাদ মাধ্যমের উপর পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পরস্পরের কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। চীনা ৩ নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্র গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো দুটি যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকাকে অস্ট্রেলিয়া ও জাপান স্বাগত জানিয়েছে। মার্কিন মিত্র বৃটেন ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক নির্মাণ কাজ থেকে চীনের প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন ট্রাম্পের চীন বিরোধিতা তার নির্বাচনী কৌশল। ব্যর্থতার কারণে তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভোট পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে ৩০%। এখন যদি ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে পারে অথবা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে তার পুননির্বাচিত হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।
অন্যদিকে চীনও বসে নেই। সম্প্রতি ইরানে ভারতের দ্বারা বন্দর নির্মাণের চুক্তি ইরান বাতিল করেছে। চীনা পণ্য আমদানী ও চীনে তেল রপ্তানির নতুন চুক্তি হয়েছে চীন ও ইরানের মধ্যে। তাতে যে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের ইরানের সাথে ঘনিষ্টতার বৃদ্ধি এবং তার বলয়ে টানার প্রায়াস তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি, বিশেষত আওয়ামী সরকার এ অবস্থায় একটি বড় সংকটে পড়েছে। আওয়ামী লীগ ভারতের মদদ ও হস্তক্ষেপে একনাগাড়ে তিন তিন বার ক্ষমতাসীন হয়েছে এবং আছে। ভারতের বিরুদ্ধে তাদের যাওয়া কঠিন গদীরক্ষার স্বার্থে। কিন্তু চীনের সাথে রয়েছে তার বহু অর্থনৈতিক স্বার্থ। পদ্মাসেতুসহ বাংলাদেশে বিশাল বিশাল অবকাঠামো নির্মাণে রয়েছে চীনা অর্থনৈতিক ও কারিগরি সাহায্য। চীন-ভারত সংঘর্ষের একদিন পরই চীন বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১টি পণ্য রপ্তানিতে ৯৭ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে এবং সম্প্রতি চীনের রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের আরো ৩, হাজার ৯৫ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বলে খবরে প্রকাশ। এগুলো বাংলাদেশকে পক্ষে রাখার জন্য চীনা পদেক্ষেপ। ফলে এই সংঘর্ষে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সরাসরি ভারতের পক্ষ নিয়ে কথা বলা মুশকিল। ভারতের অন্যান্য গণবিরোধী তৎপরতায় ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’-এর অজুহাতে ভারতকে সমর্থন করলেও এবার তারা এখনো পর্যন্ত মুখ বন্ধ রেখেছে। তারা কৌশলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমধানের কথা বলছে। তাদের থিংক ট্যাংক’রাও উভয়ের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখার নসিহত করেছে, যা বিশ্ব-পরিসরে দ্বন্দ্বের আরো বিকাশের পরিস্থিতিতে সম্ভব না-ও হতে পারে। বিশেষত, হাসিনা সরকারের পক্ষে ভারতের মদদ ছাড়া সরকার টিকিয়ে রাখা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে দলে ও সরকারের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বকে বৃদ্ধি করবে এবং কট্টর ভারতপন্থীরা নিরপেক্ষ থাকার বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারে। ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছে যে, বাংলাদেশের মতো বন্ধু ভারতের আর কেউ নেই। আওয়ামীপন্থী কিছু সংগঠন প্রথমদিকে ভারতের পক্ষে এবং চীনের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে দাবি তুলেছিল বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী জোরদার করতে হবে, তারা পুনরায় মাঠে নামবে।
যদি চীন-ভারত দ্বন্দ্ব আরো তীব্র হয়, এমনকি যুদ্ধ বেধে যায় এবং ভারতের সাথে মার্কিনের সম্পর্ক আরো জোরদার হয়ে ওঠে, তাহলে আওয়ামী-হাসিনা সরকার গুরুতর বিপদে পড়বে তাদের প্রভু নির্ধারণের বিষয়ে। চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং ভারত-মার্কিন এদেশে তাদের অনুকূলে শাসক-বদলের উদ্যোগ নিতে পারে তাদের স্বার্থে। আবার সরকার যদি চীনকে বর্জন করে তাহলে অর্থনৈতিক সংকট তার আরো বাড়বে এবং চীনও শাসক-বদলের পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু চীন মার্কিনের মতো অতটা দক্ষ এখনো হয়ে উঠেনি।
উপরন্তু, করোনাকালে যে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে সরকার পড়তে চলেছে এবং সরকারের গণবিরোধিতা ও ব্যর্থতা যেভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। তাতে গণবিক্ষোভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও বাড়ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিরোধী পক্ষগুলো সরকার পতনের বিভিন্নমুখী পদেক্ষেপ নিতে পারে।
বিপ্লবীদের উচিত হবে শাসকশ্রেণির অভ্যন্তরে বেড়ে চলা দ্বন্দ্বকে কাজে লাগানো, পরিস্থিতির সুযোগ নেয়া এবং ভারতের সম্প্রসারণবাদী ও চীনের বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র এবং মার্কিন-চীন তথা অান্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব উন্মোচন করা; জনগণকে সঠিক পথ দেখানো। লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারতের যুদ্ধ-উত্তেজনা হচ্ছে চীনা সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ- এই দুই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব বা কামড়াকামড়ি। এতে ভারত ও চীনা জনগণের কোনো স্বার্থ নেই। নেই বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের কোনো দেশের জনগণের স্বার্থ। এই দেশ দুটোর জনগণের করণীয় হলো, নিজ নিজ দেশে ‘পরাজয়বাদী’ লাইন গ্রহণ করা এবং পরাজয় বরণের জন্য চীনা সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে বাধ্য করা। একই সাথে জনগণের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সংগ্রামকে বেগবান করা।
এই অঞ্চলে দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাস-ঐতিহ্য রয়েছে যা এখনও বিদ্যমান এবং ভারতে বিকাশমান। তাই এই অঞ্চল বিপ্লবের ঝটিকা কেন্দ্র হবার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামকে তথাকথিত ‘দেশদ্রোহীতা’র তকমা দিয়ে শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্র আক্রমণ করবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীন-ভারতের এই দ্বন্দ্ব মোকাবেলায় নামে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে সর্বদলীয় ঐক্য চেয়েছিল। ভারতের শাসকশ্রেণির সব পার্টি ইতিমধ্যে এক হয়েছে ‘চীন-বিরোধী’ হুজুগ তুলে এবং তাকে পরিচালিত করতে চাচ্ছে প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক ও মাওবাদী শক্তির বিরুদ্ধে, যারা এই দ্বন্দ্বে জনগণের স্বার্থকে তুলে ধরছে। ভারতসহ এ অঞ্চলের জনগণকে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদকে সংগ্রাম করতে হবে এবং বিপ্লবী সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র