গ্যাস-বিদ্যুৎ-নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া
জনদুর্ভোগের আসল কারণ কী ?
গ্যাস-বিদ্যুৎ-নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া
জনদুর্ভোগের আসল কারণ কী ?
আন্দোলন প্রতিবেদন
শুক্রবার, ১২ মে ২০২৩ | অনলাইন সংস্করণ
করোনার সময়ে খাদ্য এবং চিকিৎসা নিয়ে জনদুর্ভোগের সীমা ছিল না। এখন করোনা নেই। কিন্তু দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগণ গ্যাস-বিদ্যুৎ-দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন বৃদ্ধির কষাঘাতে চিড়ে চ্যাপ্টা হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রীবর্গ উন্নয়নের ফিরিস্তি গেয়ে মুখে থুথু তুলে ফেলছে। কিন্তু চাল-ডাল-আটা-ভোজ্যতেল, ব্রয়লার মুরগি, ডিমের মূল্য বৃদ্ধিরোধ করতে পারছে না বহু বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও। দ্রব্যমূল্য দরিদ্র জনগণের ক্রয়সীমার বাইরে চলে গেছে। রমজানে ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ৩০০ টাকা ছুঁই ছুঁই করেছে, যা মাত্র এক বছর আগে ছিল ১২০ টাকা। দেশে উৎপাদিত তেলাপিয়া-পাঙাশ মাছের দাম ২০০ টাকা কেজি। মধ্যবিত্তরা বাজেট থেকে কাটছাঁট করে এবং মাসের শেষে ধার-দেনা করে কোনো মতে চলছেন। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠী কাটছাঁট করবেন কোথা থেকে? তাদেরতো নুন আনতেই পান্তা ফুরোয়! তাই, শহুরে দরিদ্র জনগণের একটা অংশ এখন গ্রামমুখী, যা চলমান ব্যবস্থায় উল্টোমুখী।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন বলছে, পুষ্টিকর উপাদানসমৃদ্ধ খাবার খেতে পারছে দেশের মাত্র ১৭ শতাংশ পরিবার। অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ পরিবার পুষ্টি থেকে বঞ্চিত। বুর্জোয়া পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় এমন বিকল্প উৎস যেমন সয়াবিন, শিমের বীজ, আটা-ময়দা, ছোলা বা ডাল জাতীয় খাবার থেকে প্রোটিন নিতে হবে। এই বুর্জোয়া পুষ্টিবিদদের মতে উল্লেখিত দ্রব্যগুলোর দাম তুলনামূলক কম হলেও দরিদ্র জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে নেই, তারা তা বুঝতে অক্ষম।
সরকার সারাদেশে এক কোটি জনগণকে ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে টিসিবি থেকে স্বল্প মূল্যে তেল-ডাল-চিনি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ সে কার্ড থেকে বঞ্চিত। আওয়ামী নেতাদের স্বজনপ্রীতি ও ভোটের রাজনীতিতে কার্ড বিতরণ করেছে। আমজনতার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই ঘুস নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সপ্তাহে দুইদিন আইডি কার্ড জমা দিয়ে চাল-আটা দেয়ার ব্যবস্থা করা হলেও দরিদ্র জনগণ বিশেষত নারীরা রাত একটা-দেড়টা থেকে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন পাঁচ কেজি মোটা চাল ও পাঁচ/চার কেজি আটা পাওয়ার আশায়। সকাল ১০টায় চাল-আটা দেয়া শুরু হলেও তা পাওয়ার জন্য রীতিমত মারামারি/ঠেলাঠেলি শুরু হয়। দিন শেষে ৩০/৪০ জন না পেয়েই ফেরত যান। সেই চাল-আটা পেয়ে বা না পেয়ে শেখ হাসিনাকে গালাগালি করতে বাকী রাখেন না তারা। তাদের ভাষায় “বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কম থাকলে কি তাদের এত কষ্ট করতে হয়”?
প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, রমজানে খাদ্যপণ্যের অভাব হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সিও কত টন খাদ্যপণ্য মজুত আছে, কত টন পাইপ লাইনে আছে তার ফিরিস্তি গেয়েছে। কিন্তু খাদ্যপণ্যের লাগাম টেনে ধরতে তারা পারেনি। রোজায় সবই বেড়েছে। তবে কিছু শয়তানি আছে। যেমন, মুরগির দাম ১০০ টাকা বাড়িয়ে ২০ টাকা কমানো।
মাঝে মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী গুরুগম্ভীর বাণীতে বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধই দেশে সংকট সৃষ্টি এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা-লুটপাট এবং একচেটিয়া বাণিজ্যের বাজার দখল/আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত/যুদ্ধের কষাঘাতে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটছে– তার আংশিক সত্যতা রয়েছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে যুদ্ধ/সংকট সৃষ্টির অংশীদার যে দালাল শাসকশ্রেণি, বর্তমানে তার সরকার এবং তিনি নিজে এই তথ্যটা গোপন করছে। সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী প্রভুদের স্বার্থ রক্ষায় গণবিরোধী কর্মসূচি চালিয়ে এই সংকট সৃষ্টিতে তারাই ভূমিকা রেখেছে। এর সাথে অভ্যন্তরীণভাবে নিজ গোষ্ঠীর ঘুস-দুর্নীতি, অতি মুনাফায় জনগণের পকেট কাটা, লুটপাট, বিদেশে লক্ষ কোটি টাকা পাচার– ইত্যাদিতে এই সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ গলাবাজিতে পটু প্রধানমন্ত্রীকে চালসহ সমস্ত খাদ্যপণ্যই আমদানি করতে হয়!
নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে–
জ্বালাানি সংকট : সরকার দেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং তা থেকে উৎপাদন করে জ্বালানি সমস্যা সমধান করেনি। তারা বিদেশি জ্বালানির উপর নির্ভরতা গড়ে তুলেছে। কাতার ও ওমান থেকে নির্দিষ্ট দামে জ্বালানির চুক্তি থাকলেও প্রভুদের স্বার্থে সরকার খোলাবাজার থেকে জ্বালানি কিনেছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় আন্তর্জাতিকভাবে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত গ্যাস এবং খাদ্যপণ্যের সংকট সৃষ্টি হয়েছে ও মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। ফলে ২০২২ সালের আগস্টে আওয়ামী সরকার রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে একদফা বাসভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। যা অব্যাহতভাবে বেড়েই চলছে।
মূল্যস্ফীতি-ডলার সংকট : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সাথে মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকট দেখা দেয়। ডলার সংকটের কারণে আমদানিতেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। সেই অজুহাতেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটে। ডলার সংকটের অন্যতম কারণ হচ্ছে বিদেশ কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিকরা যে রেমিটেন্স পাঠায় তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা না হয়ে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মারফত বিদেশি ব্যাংকে জমা হয়। এ জন্য গত বছর সরকার করের বিশেষ ছাড় দিয়েও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের কবল থেকে রেমিটেন্সকে মুক্ত করতে পারেনি। রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের অনেকেই রপ্তানির ডলার দেশে ফেরত না এনে বিদেশেই পাচার করছে। এরা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন সরকারের সাথেই যুক্ত।
আই এমএফ থেকে ঋণ : এই ডলার সংকট থেকে রেহাই পাওয়া এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে খুশি করতেই আওয়ামী সরকার আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার চুক্তি করেছে ৩৮টি শর্ত মেনে। তার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ-কৃষি-জ্বালানি খাতে কোনো ভতুর্কি দেয়া যাবে না। সেই শর্ত পূরণেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে গ্যাস-বিদ্যুত-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষমতা সরাসরি আওয়ামী সরকারের হাতে নিয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতাবলে সরকার এখন দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুৎ-সারের মূল্য বৃদ্ধি করে চলেছে। গত জানুয়ারি থেকে এপর্যন্ত তিনবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করেছে (সরকার ১৪ বছরে পাইকারী পর্যায়ে ১১ বার এবং ভোক্তা পর্যায়ে ১৩ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করেছে)। এলপিজির গ্যাসের দাম ফেব্রুয়ারিতে একলাফে ২৬৬ টাকা বাড়িয়েছে। গ্যাসের দাম পরে কিছু কমলেও কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস-নিত্যপণ্য বিক্রিতে বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে বড় ব্যবসায়ীরা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি ও তাদের সাথে চুক্তি : সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ডলারে দাম ধরে চুক্তি করেছিল। এখন ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১০৫ টাকা হয়েছে। বাস্তবে তা আরো বেশি। কিন্তু ডলারে চুক্তি হলেও টাকায় মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে মার্কিন ডলারে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) আকার দেখানোর জন্য ডলারে দাম ধরে রাখা হয়েছিল। তারা ছাড়া ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। ফলে দেশি বিনিয়োগ বাড়ে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৪৮২ মেগওয়াট। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একাংশকে বসিয়ে ভাড়া দিতে হচ্ছে। বছরে এর পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা। এই ভাড়াও ডলারের হিসাবেই দিতে হয়। এ সব কারণে সরকার অর্থ সংকট কাটানোর জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে জনগণের ঘাড় মটকিয়ে তা আদায় করছে। অথচ প্রতারণামূলক ভাবে প্রধানমন্ত্রী বলছে– “আর কত গ্যাস-বিদ্যুতে ভতুর্কি দেব”।
রমজানে ব্যবসায়ীদের কারসাজি : ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার বৈঠকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য একে অপরকে দায়ী করেছেন। তারা বলেন, মিল মালিক রশিদ দেয় এক দামে কিন্তু টাকা নেয় ভিন্ন দামে। চাল-চিনি-ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের চড়া মূল্যের জন্য ক্ষুদ্র খামারিদের সংগঠনের সভাপতি সুমন হালদার দায়ী করেন বড় খামারিদের। যারা পোল্ট্রি খাদ্য ও বাচ্চা উৎপাদনকারী গুটিকয়েক বড় খামারি। তার ভাষায় তারা পোল্ট্রি ব্যবসাকে জিম্মি করে রেখেছে। প্রতি রমজানেই বড় ব্যবসায়ীরা এমন বৈঠক করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মুনাফা লুটার কাজটিই করেন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে সরকারের গণবিরোধী কর্মসূচি এবং বড় ব্যবসায়ীদের কারসাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বড় কারণ। এছাড়া চোরাকারবারী, মজুতদারী, সিন্ডিকেটতো রয়েছেই। যারা আন্তর্জাতিক চক্রের সাথেও জড়িত। এরা কারা? এই বড় ব্যবসায়ীরাই গণবিরোধী শাসকশ্রেণির অংশ এবং আওয়ামী রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। যার কারণেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এদের নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। কারণ তারাই আওয়ামী লীগের ক্ষমতার স্তম্ভ।
অতএব ঘুস-দুর্নীতি, শোষণ-লুটপাট, মজুতদারী-সিন্ডিকেট-অতিমুনাফা, বিদেশে অর্থপাচার, চোরাকারবারী, মদ-জুয়া-মাদক ব্যবসা– ইত্যাদি মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গ। বাংলাদেশে যার বর্তমান প্রতিনিধিত্ব করছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। এর কোনো কোনোটি যখন স্থুলভাবে বেরিয়ে পড়ে অথবা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আওয়ামী রোষানলে পড়ে, তখনই তাদের নিয়ে পুলিশ-প্রশাসন-বুর্জোয়া মিডিয়া কিছুদিন হৈচৈ করে। কিন্তু পর পরই তারা রণে ভঙ্গ দেয়।
তাই সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি, তার সরকার, রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদ না করে জনগণ এই রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারবে না। গণবিরোধী আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদের বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
গ্যাস-বিদ্যুৎ-নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশছোঁয়া
জনদুর্ভোগের আসল কারণ কী ?
করোনার সময়ে খাদ্য এবং চিকিৎসা নিয়ে জনদুর্ভোগের সীমা ছিল না। এখন করোনা নেই। কিন্তু দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগণ গ্যাস-বিদ্যুৎ-দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন বৃদ্ধির কষাঘাতে চিড়ে চ্যাপ্টা হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রীবর্গ উন্নয়নের ফিরিস্তি গেয়ে মুখে থুথু তুলে ফেলছে। কিন্তু চাল-ডাল-আটা-ভোজ্যতেল, ব্রয়লার মুরগি, ডিমের মূল্য বৃদ্ধিরোধ করতে পারছে না বহু বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও। দ্রব্যমূল্য দরিদ্র জনগণের ক্রয়সীমার বাইরে চলে গেছে। রমজানে ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ৩০০ টাকা ছুঁই ছুঁই করেছে, যা মাত্র এক বছর আগে ছিল ১২০ টাকা। দেশে উৎপাদিত তেলাপিয়া-পাঙাশ মাছের দাম ২০০ টাকা কেজি। মধ্যবিত্তরা বাজেট থেকে কাটছাঁট করে এবং মাসের শেষে ধার-দেনা করে কোনো মতে চলছেন। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠী কাটছাঁট করবেন কোথা থেকে? তাদেরতো নুন আনতেই পান্তা ফুরোয়! তাই, শহুরে দরিদ্র জনগণের একটা অংশ এখন গ্রামমুখী, যা চলমান ব্যবস্থায় উল্টোমুখী।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন বলছে, পুষ্টিকর উপাদানসমৃদ্ধ খাবার খেতে পারছে দেশের মাত্র ১৭ শতাংশ পরিবার। অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ পরিবার পুষ্টি থেকে বঞ্চিত। বুর্জোয়া পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় এমন বিকল্প উৎস যেমন সয়াবিন, শিমের বীজ, আটা-ময়দা, ছোলা বা ডাল জাতীয় খাবার থেকে প্রোটিন নিতে হবে। এই বুর্জোয়া পুষ্টিবিদদের মতে উল্লেখিত দ্রব্যগুলোর দাম তুলনামূলক কম হলেও দরিদ্র জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে নেই, তারা তা বুঝতে অক্ষম।
সরকার সারাদেশে এক কোটি জনগণকে ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে টিসিবি থেকে স্বল্প মূল্যে তেল-ডাল-চিনি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ সে কার্ড থেকে বঞ্চিত। আওয়ামী নেতাদের স্বজনপ্রীতি ও ভোটের রাজনীতিতে কার্ড বিতরণ করেছে। আমজনতার থেকে অনেক ক্ষেত্রেই ঘুস নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সপ্তাহে দুইদিন আইডি কার্ড জমা দিয়ে চাল-আটা দেয়ার ব্যবস্থা করা হলেও দরিদ্র জনগণ বিশেষত নারীরা রাত একটা-দেড়টা থেকে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন পাঁচ কেজি মোটা চাল ও পাঁচ/চার কেজি আটা পাওয়ার আশায়। সকাল ১০টায় চাল-আটা দেয়া শুরু হলেও তা পাওয়ার জন্য রীতিমত মারামারি/ঠেলাঠেলি শুরু হয়। দিন শেষে ৩০/৪০ জন না পেয়েই ফেরত যান। সেই চাল-আটা পেয়ে বা না পেয়ে শেখ হাসিনাকে গালাগালি করতে বাকী রাখেন না তারা। তাদের ভাষায় “বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কম থাকলে কি তাদের এত কষ্ট করতে হয়”?
প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, রমজানে খাদ্যপণ্যের অভাব হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সিও কত টন খাদ্যপণ্য মজুত আছে, কত টন পাইপ লাইনে আছে তার ফিরিস্তি গেয়েছে। কিন্তু খাদ্যপণ্যের লাগাম টেনে ধরতে তারা পারেনি। রোজায় সবই বেড়েছে। তবে কিছু শয়তানি আছে। যেমন, মুরগির দাম ১০০ টাকা বাড়িয়ে ২০ টাকা কমানো।
মাঝে মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী গুরুগম্ভীর বাণীতে বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধই দেশে সংকট সৃষ্টি এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মুনাফা-লুটপাট এবং একচেটিয়া বাণিজ্যের বাজার দখল/আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত/যুদ্ধের কষাঘাতে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটছে– তার আংশিক সত্যতা রয়েছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে যুদ্ধ/সংকট সৃষ্টির অংশীদার যে দালাল শাসকশ্রেণি, বর্তমানে তার সরকার এবং তিনি নিজে এই তথ্যটা গোপন করছে। সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী প্রভুদের স্বার্থ রক্ষায় গণবিরোধী কর্মসূচি চালিয়ে এই সংকট সৃষ্টিতে তারাই ভূমিকা রেখেছে। এর সাথে অভ্যন্তরীণভাবে নিজ গোষ্ঠীর ঘুস-দুর্নীতি, অতি মুনাফায় জনগণের পকেট কাটা, লুটপাট, বিদেশে লক্ষ কোটি টাকা পাচার– ইত্যাদিতে এই সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ গলাবাজিতে পটু প্রধানমন্ত্রীকে চালসহ সমস্ত খাদ্যপণ্যই আমদানি করতে হয়!
নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে–
জ্বালাানি সংকট : সরকার দেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং তা থেকে উৎপাদন করে জ্বালানি সমস্যা সমধান করেনি। তারা বিদেশি জ্বালানির উপর নির্ভরতা গড়ে তুলেছে। কাতার ও ওমান থেকে নির্দিষ্ট দামে জ্বালানির চুক্তি থাকলেও প্রভুদের স্বার্থে সরকার খোলাবাজার থেকে জ্বালানি কিনেছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় আন্তর্জাতিকভাবে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত গ্যাস এবং খাদ্যপণ্যের সংকট সৃষ্টি হয়েছে ও মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। ফলে ২০২২ সালের আগস্টে আওয়ামী সরকার রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে একদফা বাসভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। যা অব্যাহতভাবে বেড়েই চলছে।
মূল্যস্ফীতি-ডলার সংকট : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সাথে মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকট দেখা দেয়। ডলার সংকটের কারণে আমদানিতেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। সেই অজুহাতেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটে। ডলার সংকটের অন্যতম কারণ হচ্ছে বিদেশ কর্মরত বাংলাদেশের শ্রমিকরা যে রেমিটেন্স পাঠায় তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা না হয়ে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মারফত বিদেশি ব্যাংকে জমা হয়। এ জন্য গত বছর সরকার করের বিশেষ ছাড় দিয়েও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের কবল থেকে রেমিটেন্সকে মুক্ত করতে পারেনি। রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের অনেকেই রপ্তানির ডলার দেশে ফেরত না এনে বিদেশেই পাচার করছে। এরা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন সরকারের সাথেই যুক্ত।
আই এমএফ থেকে ঋণ : এই ডলার সংকট থেকে রেহাই পাওয়া এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে খুশি করতেই আওয়ামী সরকার আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার চুক্তি করেছে ৩৮টি শর্ত মেনে। তার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ-কৃষি-জ্বালানি খাতে কোনো ভতুর্কি দেয়া যাবে না। সেই শর্ত পূরণেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে গ্যাস-বিদ্যুত-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষমতা সরাসরি আওয়ামী সরকারের হাতে নিয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতাবলে সরকার এখন দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুৎ-সারের মূল্য বৃদ্ধি করে চলেছে। গত জানুয়ারি থেকে এপর্যন্ত তিনবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করেছে (সরকার ১৪ বছরে পাইকারী পর্যায়ে ১১ বার এবং ভোক্তা পর্যায়ে ১৩ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করেছে)। এলপিজির গ্যাসের দাম ফেব্রুয়ারিতে একলাফে ২৬৬ টাকা বাড়িয়েছে। গ্যাসের দাম পরে কিছু কমলেও কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস-নিত্যপণ্য বিক্রিতে বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে বড় ব্যবসায়ীরা।
বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি ও তাদের সাথে চুক্তি : সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ডলারে দাম ধরে চুক্তি করেছিল। এখন ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১০৫ টাকা হয়েছে। বাস্তবে তা আরো বেশি। কিন্তু ডলারে চুক্তি হলেও টাকায় মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে মার্কিন ডলারে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) আকার দেখানোর জন্য ডলারে দাম ধরে রাখা হয়েছিল। তারা ছাড়া ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। ফলে দেশি বিনিয়োগ বাড়ে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৪৮২ মেগওয়াট। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একাংশকে বসিয়ে ভাড়া দিতে হচ্ছে। বছরে এর পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা। এই ভাড়াও ডলারের হিসাবেই দিতে হয়। এ সব কারণে সরকার অর্থ সংকট কাটানোর জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে জনগণের ঘাড় মটকিয়ে তা আদায় করছে। অথচ প্রতারণামূলক ভাবে প্রধানমন্ত্রী বলছে– “আর কত গ্যাস-বিদ্যুতে ভতুর্কি দেব”।
রমজানে ব্যবসায়ীদের কারসাজি : ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার বৈঠকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য একে অপরকে দায়ী করেছেন। তারা বলেন, মিল মালিক রশিদ দেয় এক দামে কিন্তু টাকা নেয় ভিন্ন দামে। চাল-চিনি-ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের চড়া মূল্যের জন্য ক্ষুদ্র খামারিদের সংগঠনের সভাপতি সুমন হালদার দায়ী করেন বড় খামারিদের। যারা পোল্ট্রি খাদ্য ও বাচ্চা উৎপাদনকারী গুটিকয়েক বড় খামারি। তার ভাষায় তারা পোল্ট্রি ব্যবসাকে জিম্মি করে রেখেছে। প্রতি রমজানেই বড় ব্যবসায়ীরা এমন বৈঠক করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মুনাফা লুটার কাজটিই করেন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে সরকারের গণবিরোধী কর্মসূচি এবং বড় ব্যবসায়ীদের কারসাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বড় কারণ। এছাড়া চোরাকারবারী, মজুতদারী, সিন্ডিকেটতো রয়েছেই। যারা আন্তর্জাতিক চক্রের সাথেও জড়িত। এরা কারা? এই বড় ব্যবসায়ীরাই গণবিরোধী শাসকশ্রেণির অংশ এবং আওয়ামী রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। যার কারণেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এদের নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। কারণ তারাই আওয়ামী লীগের ক্ষমতার স্তম্ভ।
অতএব ঘুস-দুর্নীতি, শোষণ-লুটপাট, মজুতদারী-সিন্ডিকেট-অতিমুনাফা, বিদেশে অর্থপাচার, চোরাকারবারী, মদ-জুয়া-মাদক ব্যবসা– ইত্যাদি মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গ। বাংলাদেশে যার বর্তমান প্রতিনিধিত্ব করছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। এর কোনো কোনোটি যখন স্থুলভাবে বেরিয়ে পড়ে অথবা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আওয়ামী রোষানলে পড়ে, তখনই তাদের নিয়ে পুলিশ-প্রশাসন-বুর্জোয়া মিডিয়া কিছুদিন হৈচৈ করে। কিন্তু পর পরই তারা রণে ভঙ্গ দেয়।
তাই সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণি, তার সরকার, রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদ না করে জনগণ এই রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারবে না। গণবিরোধী আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদের বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র