‘লাল সন্ত্রাস, সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’ এক বিপ্লবী নায়কের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল মূল্যায়নের উপাখ্যান
আন্দোলন প্রতিবেদন
বুধবার, ২৫ আগস্ট ২০২১ | অনলাইন সংস্করণ
রাজনৈতিক-ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ লিখিত একুশে ফেব্রুয়ারি ২০২১ বইমেলায় বাতিঘর প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘লাল সন্ত্রাস সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’। বইয়ের লেখক গত শতাব্দীর ৬০/৭০-র দশকে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় (পরে বাংলাদেশে) কমিউনিস্ট রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নেতৃত্ব মাওবাদী নেতা সিরাজ সিকদার ও তার নেতৃত্বে গঠিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির রাজনৈতিক বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা, মূল্যায়নের পাশাপাশি, তৎকালীন পার্টির সাথে সম্পর্কিত/যুক্ত এবং নেতৃস্থানীয় কিছু ব্যক্তির সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন।
রাজনীতি সচেতন সবাই কম বেশি এই পার্টি ও তাঁর নেতৃত্ব সম্পর্কে অবগত। পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী একটি মাওবাদী পার্টি। এই পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রধান নেতা সিরাজ সিকদার। তিনি অল্প বয়সেই দেশীয় ও বৈশ্বিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বাঁক পরিবর্তনকারী সময়ে পূর্ব বাংলায় বিপ্লব সংগঠনে ভিন্ন ধারার একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে প্রয়াস নেন।
তখন সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলন রুশ-চীন মহাবিতর্কে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। দেশ-বিদেশের অনেকের মত সিরাজ সিকদারও বিপ্লবের অগ্রসর মতবাদ, মাওবাদকে, কমিউনিস্ট মতবাদের বিকাশে তৃতীয় বা উচ্চতর স্তর হিসেবে গ্রহণ করেন। এই মতবাদের আলোকে পূর্ব বাংলায় বিপ্লবের স্তর হিসেবে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পথ হিসেবে পার্লামেন্টারী পথ বর্জন করে গ্রাম ভিত্তিক দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের রাজনীতি গ্রহণ ও গোপন পার্টি গঠন করেন। অল্প সময়েই সেই পার্টির নেতৃত্বে দেশব্যাপী বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলেন।
দেশীয় শাসক শ্রেণি ও তাদের বিদেশি প্রভুদের কাছে সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টি পরিণত হয় এক মূর্তিমান আতঙ্কে। শাসক শ্রেণির ষড়যন্ত্র চক্রান্তে তিনি নিরস্ত্র অবস্থায় ‘৭৫-এর ১ জানুয়ারি গ্রেফতার হন। এবং ২ জানুয়ারি তিনি বন্দি অবস্থায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হন।
আমাদের সংগঠনদ্বয় (বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন) মাওবাদের আদর্শে বিশ্বাসী। সিরাজ সিকদারকে আমরা এদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের এক মহান নেতৃত্ব বলে মনে করি ও ঊর্ধ্বে তুলে ধরি। তাই, মহিউদ্দিন আহমেদ লিখিত সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টি সম্পর্কে লিখিত বইটি আমাদের যথেষ্ট কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। বইটিতে এমন কিছু বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন যেগুলো সম্পর্কে না বললেই নয়। সেই তাগিদ থেকেই উল্লেখিত বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে এ লেখা।
তবে সিরাজ সিকদারের পার্টির অভ্যন্তরীণ অনেক বিষয়ে যেসব বক্তব্য লেখক বা সাক্ষাতকারদাতাদের কথায় উঠে এসেছে সেসব সম্পর্কে বলার এখতিয়ার আমাদের নেই। সেসব বিষয়ে তার প্রতিষ্ঠিত পার্টিই কথা বলতে পারে, যে পার্টি এখনো এদেশে সক্রিয়। তাই, আমরা সীমাবদ্ধ থাকবো যেসব মতাদর্শগত-রাজনৈতিক বিষয় সিরাজ সিকদারের পার্টির বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় সেসব বিষয়ে। আর তার যে রচনা সংগ্রহ বাজারে পাওয়া যায় সে পুস্তক থেকেও আমরা তার লাইন ও কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু আলোচনা করবো।
* আমাদের দেশে এ ধরনের কাজ বেশ বিরল। গোপন পার্টি ও তাঁর নেতৃত্ব সম্পর্কে শুধু ইতিহাস রচনায় নয়, বইটিতে পার্টির কার্যক্রম ও ব্যক্তি সিরাজ সিকদার সম্পর্কে লেখকের মূল্যায়নও প্রকাশ পেয়েছে।
লেখকের উদ্দেশ্য আমরা জানি না। তবে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে প্রত্যেকের কাজে-কর্মে থাকে তার শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গির ছাপ। আর লেখক যদি হয় রাজনীতি সচেতন তবে তার লেখনিতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ছাপও অনিবার্য। লেখক নিজে এক সময় আওয়ামী ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে জাসদের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এরপর তিনি বিভিন্ন দাতা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন।
ইতিহাস বয়ান আর ইতিহাসের বিশ্লেষণ পুরোপুরিই ভিন্ন। ‘লাল সন্ত্রাস সিরাজ সিকদার ও সর্বহারার রাজনীতি’ বইটির মধ্য দিয়ে লেখক এই পার্টির রাজনীতি ও তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকার মূল্যায়ন টেনেছেন। আর তার এই মূল্যায়নকে শক্ত ভিত্তি দিতে তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৎকালীন সময়কার পার্টির নেতৃত্বের একাংশ এবং পার্টির সাথে যুক্ত/সম্পর্কিত শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তিবর্গের। যাদের অধিকাংশই পার্টি-বিপ্লব ত্যাগকারী, অধঃপতিত, বুর্জোয়া জীবনে প্রতিষ্ঠিত। লেখকের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী বইটি মূলত একঝাঁক মেধাবী তরুণের স্বপ্নযাত্রা ও স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। জনগণ এখানে অনুপস্থিত। অর্থাৎ লেখক আজকে যেখানে পৌঁছেছেন সেই সব তরুণরাও জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি বা উপেক্ষা করে লেখকের পথ অনুসরণ করে সেখানে পৌঁছাতে পারতেন। সেই সুযোগ হেলায় বিসর্জন দিয়ে সমাজ বদলের লড়াইয়ে আত্মাহুতি, লেখকের কাছে তা জীবনের এক বড় ধরনের অপচয়। লেখক কোনোভাবেই সেটা মানতে পারেননি। অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা-সচ্ছলতা-পাওয়া/না পাওয়ার জায়গা থেকে তিনি সমাজ বিপ্লবকে দেখেছেন। বুর্জোয়া রাজনীতির মোহজালে তিনি বিপ্লবী রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। আর এ সবই এসেছে লেখকের আওয়ামী, জাসদীয় রাজনীতির চোখে সিরাজ সিকদারের রাজনীতিকে দেখার কারণে।
“বিপ্লব কোনো ভোজ-সভা, বা প্রবন্ধ রচনা বা চিত্র অঙ্কন কিংবা সূচিকর্ম নয়; এটা এত সুমার্জিত, এত ধীর-স্থির ও সুশীল, এত নম্র, দয়ালু, বিনীত, সংযত ও উদার হতে পারে না। বিপ্লব হচ্ছে বিদ্রোহÑ উগ্র বলপ্রয়োগের কাজ, যার দ্বারা এক শ্রেণি অন্য শ্রেণিকে পাল্টে দেয়”। -মাও সেতুঙ।
বিপ্লবে রক্তপাত অনিবার্য্য। মার্কসবাদের এই অমোঘ সত্যকে সত্যিকার কোন বিপ্লবীই অস্বীকার করেন না। লেখকের সমগ্র লেখায় এই সত্যকে অস্বীকার করেছেন বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবাদ দ্বারা চালিত হয়ে। সারা বিশ্বের তাবৎ বুর্জোয়ারা মুখে ‘গণতন্ত্রের’ফেনা তুললেও তারাই এর বড় হন্তারক। এ ধরনের নজির বিশ্ব রাজনীতিতে অহরহ ঘটে চলেছে। তাই তো লেখক সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পরে রেড আর্মি ও হোয়াইট আর্মির সংগঠিত কার্যকলাপকে একই মাপকাঠিতে মেপেছেন। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শ্রেণি বৈষম্যমূলক বিশ্ব ব্যবস্থায় যুদ্ধ অনিবার্য্য। আর সেই অন্যায় যুদ্ধের বিপরীতে কমিউনিস্টরা ন্যায় যুদ্ধকে ন্যায্য বলেই মানে। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুদ্ধই শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। আর তার মধ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে যুদ্ধ বা রক্তপাতের অবসান ঘটবে। লেখকের বয়ান অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। শিশু জন্মাবে প্রসব যন্ত্রনা ছাড়াই। এই ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করা ইতিহাসের সাথে মিথ্যাচারের সামিল। লেখক সে পথেই হেটেছেন। আর তাই তো সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টির রাজনীতির ইতিহাসকে তিনি খুনোখুনির ইতিহাস বলতে চেয়েছেন।
লেখককে বেশি ব্যথিত করেছে তার ছাত্র জীবনের বন্ধু রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তাকে পার্টি কর্তৃক হত্যাকান্ডে। শাসকশ্রেণির শ্রেণি স্বার্থ রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার রাষ্ট্রের বাহিনী। বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান করে। সিরাজ সিকদার সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের সেবাদাস গণবিরোধী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই জারি করেছিলেন, শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী জনগণের রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে। ফলে এ লড়াইয়ে উভয় পক্ষের প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি অনিবার্য। লেখকের মনে একবারও এ প্রশ্ন আসেনি যে, তার বন্ধু রক্ষীবাহিনীর মতো একটি গণনিপীড়ক বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ‘স্বাধীনতা’ পরবর্তী জনমনে তীব্র হতাশা আর আওয়ামী ফ্যসিবাদী সরকারের নেতৃত্বে দেশব্যাপী অত্যাচার-নির্যাতন-দখল-লুটপাট, ধর্ষণ, হত্যা-সন্ত্রাসের এক বিভৎস পরিস্থিতি। আর সেই অপকর্মের প্রধান সারথী ছিল রক্ষীবাহিনী। তারা শুধু কয়েক হাজার বামপন্থী নেতা-কর্মীদেরই হত্যা করেনি, এই নৃশংসতার শিকার হয়েছেন অগণিত দেশপ্রেমিক-সাধারণ জনগণ। লেখক ইতিহাসের সেই সময়ের কিছু কিছু বিষয়কে ছুঁয়ে গেলেও রক্ষীবাহিনীর দুঃশাসনের ব্যাপারে একবারেই নীরব থেকেছেন। সমাজের অস্থিরতা, অসন্তোষকে দেখেছেন জনগণের আকাশচুম্বী স্বপ্ন হিসেবে। এসব থেকে শেখ মুজিব সরকারকে ডিফেন্স করেছেন সদ্য ‘স্বাধীন’তা প্রাপ্ত দেশগঠনে পর্যাপ্ত সময়ের অভাব বলে। আর লেখকের ভাষায় জনগণের এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু সংখ্যক সন্ত্রাসী (বলেননি, বলতে চেয়েছেন) গণবিচ্ছিন্নভাবে দেশব্যাপী থানা-ফাঁড়ি-ব্যাংক-খাদ্য গুদাম লুট করেছেন। সিরাজ সিকদার তারই অন্যতম নেতৃত্ব।
জনগণ প্রস্তুত নয় বা গণবিচ্ছিন্নতার কথা বলে গণযুদ্ধের রাজনীতিকে খারিজ করা তাবৎ সংশোধনবাদীদের অতি পুরনো রোগ। সিরাজ সিকদার সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশব্যাপী সফলভাবে হরতাল পালন করেছিলেন। এমনকি সেই হরতালে সমর্থন ‘৭৩-সালে দিয়েছিলেন মাওলানা ভাসানীর মত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জননেতা। আজ ‘স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে’জনগণের জীবনমান আর মুষ্টিমেয় এক শ্রেণির অঢেল বিত্ত-বৈভব ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে সিরাজ সিকদার তথাকথিত স্বাধীনতার পর যে অসমাপ্ত জাতীয়-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন তা সর্বৈব সত্য বলেই প্রতিভাত হয়। বাংলাদেশ যে সাম্রাজ্যবাদের দালাল দক্ষিণ এশীয় প্রতিক্রিয়ার প্রধান খুঁটি ভারতের লুটপাট-নিপীড়ন-নিয়ন্ত্রণের এক অধীনস্ত রাজ্যে পরিণত হয়েছে তা শিশুরাও বুঝতে পারে। কিন্তু লেখক এই সহজ সত্যকে বুঝতে অপারগ।
লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন সিরাজ সিকদার ও তার পার্টির ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। আত্মনির্ভরতার ভিত্তিতে কোনো বিদেশি শক্তির সহায়তা ছাড়াই এসএস পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ গড়ে তুলেছিলেন। লেখক এ বিষয়টা আনলেও উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে মুজিবের স্বেচ্ছায় ধরা দেয়ার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে গেছেন। এসময় আওয়ামী অন্য নেতারা পালিয়ে ভারত যান। ভারতের মদদ ও ব্যবস্থাপনায় গঠিত হয় আওয়ামী প্রবাসী সরকার। লেখকের কাছে বিষয়টা ইতিবাচক হলেও সিরাজ সিকদার সঠিকভাবে ধরতে পেরেছিলেন যে পূর্ব বাংলা আন্ত:সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একইসাথে তিনি বলেছিলেন, ভারত যেখানে নিজ দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারকে টুটি চেপে ধরেছে, সেখানে পূর্ব বাংলার স্বাধীকারের প্রশ্নে এ ধরনের ‘সহযোগিতা’তাদের গোপন অভিসন্ধিরই প্রকাশ। ভারতে প্রশিক্ষিত মুজিবাহিনীকে সজ্জিত করা হয়েছিল মাওপন্থী দমনে। লেখক এ বিষয়টাকে হেঁয়ালিপূর্ণভাবে দেখাতে চেয়েছেন যেন মাওপন্থীদের শ্রেণিশত্রæ বা জাতীয় শত্রæ খতমের রাজনীতির কারণেই তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর সাথে মাওপন্থীদের সংঘাতের ঘটনা ঘটেছিল। ‘৭১-র বিশেষ পরিস্থিতিতে বরঞ্চ উল্টোটাই সত্য। আওয়ামী প্রধান নেতাদের অনুপস্থিতিতে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাওপন্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভারত ফেরত আওয়ামী মুক্তিবাহিনী দেশে ফিরেই মাওপন্থীদের প্রধান টার্গেট করে। মাওপন্থী উচ্ছেদে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে মেতে ওঠে। মুৎসুদ্দি আওয়ামী নেতৃত্ব কখনই মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালি জাতি-জনগণের সার্বিক শোষণ মুক্তির লড়াই হিসেবে দেখেনি, দেখেছে তাদের শ্রেণি বা গোষ্ঠিগত ক্ষমতার লড়াই হিসেবে। এজন্যই সত্যিকার কমিউনিস্ট বা মাওপন্থীদের প্রতি তারা এতটা বিরূপ। তাই তো দেখি সিরাজ সিকদার ও তার পার্টির আওয়ামীলীগের প্রতি খোলা চিঠি মারফত যৌথ কমান্ডে মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কোনো সাড়া মেলেনি। একইভাবে লেখকের কাছে এসবের কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই বলেই প্রতিভাত হয়েছে। কমিউনিস্ট নিধনে বিশেষত বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী ও দেশের ভিতরে অবস্থানরত কাদেরীয় বাহিনী ছিল এ প্রশ্নে সবচেয়ে সরস। লেখক নিজেও বিএলএফ’র সদস্য ছিলেন বলেই হয়ত ভারতের সেবাদাস এই মুক্তিবাহিনী কর্তৃক কমিউনিস্ট হত্যাকে বিশৃঙ্খলা দমন হিসেবেই দেখেছেন। তিনি এসব তথ্যকে তুলে ধরেছেন আওয়ামী পন্থীদের অপরাধ এড়িয়ে।
লেখক শাসক শ্রেণির প্রতিবিপ্লবী জাসদ রাজনীতিকে সর্বহারা পার্টির বিপ্লবী রাজনীতির সাথে মেলানোর অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। যে জাসদ-নেতৃত্ব বিপ্লব ধ্বংসের জন্য আওয়ামী লীগের সশস্ত্র বিটিম হিসেবে কাজ করেছে। যে সংগঠনের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের গণক্ষমতা তথা নয়াগণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার কোনো কর্মসূচি ছিল না। সেখানে কর্ণেল তাহেরের মত বিপ্লব আকাক্সক্ষী বিভ্রান্ত মধ্যবিত্ত বীরের আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমিক ও সমাজতন্ত্রমনা অসংখ্য ছাত্র-তরুণ-বুদ্ধিজীবীদের সংযুক্তি থাকলেও তার রাজনীতি, মূল নেতৃত্ব ও কর্মসূচি কখনই বিপ্লবী ছিল না। যে জাসদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সিরাজুল আলম খান, যার হাত দিয়েই রচিত হয় বাকশালের কর্মসূচি। যখন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের বাহিনী দ্বারা বিপ্লব আকাঙ্খী জাসদের তরুণেরা আত্মাহুতি দিচ্ছেন তখন সিরাজুল আলম খানের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ ছিল শেখ মুজিবের। তাকে ভারতে পালাতে সাহায্য করছে শেখ মুজিব। লেখকের তথ্য থেকেই এ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আর তাকেই কিনা লেখক তুলনা করছেন সিরাজ সিকদারের মত মহান দেশপ্রেমিক-বিপ্লবী কমিউনিস্টের সাথে। একজন যেখানে সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত অনুচর, কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী; অন্যজন ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল শাসকশ্রেণির কবর খননকারী।
তিনি সর্বহারা পার্টির চক্র-উপদল সংক্রান্ত ভুল লাইন ও পদ্ধতিকে সমালোচনা করতে গিয়ে পার্টি ও বিপ্লবের রাজনৈতিক লাইন ও মতাদর্শকে বাতিল করে দিয়েছেন। সেজন্য তিনি দেখেছেন প্রধান নেতা কমরেড সিরাজ সিকদারসহ পার্টি নেতাদের স্বৈরাচারী পরিচালনা পদ্ধতি, ভোগ-বিলাস, যৌন বিচ্যুতি, খুনোখুনি ও নেতৃত্ব দখলের লোভে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের পিচ্ছিল পথ। অথচ এই বইয়েই উল্লেখ আছে কমরেড সিরাজ সিকদারসহ অগ্রসর বিপ্লবীগণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠা ও পরিবারের ভোগ বিলাসের জীবন ত্যাগ করে শ্রমিক-কৃষকের সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য দৈহিক শ্রম থেকে শুরু করে কত কষ্টকর জীবন যাপন করেছেন।
স্বল্প সময়ের বিপ্লবী অনুশীলনে প্রেম-বিয়ে-যৌন প্রশ্নকে বিপ্লবী স্বার্থের অধীনে রেখেছেন। এক সঙ্গে একাধিক স্ত্রী রাখাকে বিরোধিতা করেছেন। প্রয়োজনীয় বিবাহ বিচ্ছেদকে সহজতর করেছেন। যারা পুনর্গঠন হতে পারেনি তারাই পার্টি ও নেতৃত্বকে আক্রমণ করেছে। বিপ্লব ত্যাগকারীদেরকেই লেখক হাতিয়ার বানিয়েছে। পুঁজিবাদী-সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় একাধিক স্ত্রী রাখা, হোটেল পতিতালয়ে গমন, স্ত্রী নিপীড়ন, হত্যা-ধর্ষণ, বাল্য বিবাহের নরক যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে এসে পার্টি ও বিপ্লবী স্বার্থের অধীনে নারী-পুরুষের প্রেম-ভালবাসার স্বেচ্ছামূলক সম্পর্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়াস নিঃসন্দেহে অনুসরণযোগ্য। এক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতিকে বিপ্লবী সংগ্রামকে অব্যাহত রেখেই সারসংকলন করা যায়। কমরেড সিরাজ সিকদার এভাবেই ব্যক্তিগত সব কিছুকেই দেখেছেন। এখানে যৌন কাতরতা, ভোগ-বিলাসের কিছু নেই।
তিনি এসএস পরবর্তী ও পার্টির স্বল্পকালীন প্রধান নেতা কমরেড মতিনকে এসএস-এর গ্রেফতারের জন্য দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। যিনি বহু সীমাবদ্ধতা এবং ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্তে¡ও সংকটময় পরিস্থিতিতে পার্টির বিপ্লবী ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তত্ত¡ ও অনুশীলনে অতীতের সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি থেকে মুক্ত হয়ে অগ্রসর হতে না পারলেও তিনি বিপ্লব ত্যাগ করেন নি। তিনি আমৃত্যু সিরাজ সিকদার ও মাওবাদের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন।
যাদের মুখ দিয়ে কমরেড মতিনকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে তারাই পার্টি ও বিপ্লব ত্যাগ করেছেন, পার্টি ভাঙার ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করেছেন বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে শাসক শ্রেণির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন। রইসউদ্দিন আরিফের কথা এক্ষেত্রে খুব প্রযোজ্য। জিয়াউদ্দিন যিনি এসএস পরবর্তী মাওবাদ বর্জন করে হোক্সাপন্থা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের সহায়তায় ব্যক্তি জীবনে পুনর্বাসিত হন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদও গ্রহণ করেছিলেন।
লেখক সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর তার পার্টির বিভক্তি ও বিভক্ত অংশগুলোর বর্ণনায় একটি মাত্র পক্ষের বক্তব্যকেই তুলে ধরেছেন, যারা কিনা পরবর্তীতে সিরাজ-বিরোধী রাজনীতির প্রচারক। এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, সিরাজের মৃত্যুর পর তার রাজনীতি-অনুসারী তার পার্টি ও অনেক ব্যক্তি/গোষ্ঠী এখনো সক্রিয়। তাদের কোনো বক্তব্য সংগ্রহের চেষ্টা লেখক করেছেন বলে মনে হয়নি। এ থেকেও লেখকের রাজনৈতিক মতাবস্থান বোঝা যায়, যা প্রকৃত ইতিহাস নির্মাণে অসততা ছাড়া কিছু নয়।
* সিরাজ সিকদারের গ্রেফতার ও বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর জন্য আওয়ামী সরকার ও তার প্রধান শেখ মুজিব দায়ী। গ্রেফতার জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়ায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ইএ চৌধুরি, এসপি মাহবুব, রক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে আনোয়ার উল আলম, সরোয়ার মোল্লা, নূরুজ্জামান দায়ী।
লেখক শেখ মুজিব, পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তাদের অভিযোগ থেকে রক্ষার জন্য মিথ্যা তথ্যের অবতারণা করেছেন। সেজন্য সংসদে দাঁড়িয়ে ‘কোথায় আজ সিরাজ সিকদার’ বলে মুজিব যে সিরাজ সিকদারের হত্যার দায় স্বীকার করেছিল সে অভিযোগ থেকে দায়মুক্ত করে লেখক শেখ হাসিনার মুখ দিয়ে বের করেছেন ‘তোরা ওকে বাঁচতে দিলি না’। এই তোরাটা কারা? লেখক সেটা আবিষ্কার করেননি। তাছাড়া শেখ হাসিনার বয়ানে পুলিশ বাহিনীর মধ্যকার মুজিব বিরোধীদের ক্রসফায়ারে সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর নতুন কাহিনী সাজিয়েছেন। এটা এক জঘন্য প্রতারণা।
লেখক কার্যত সিরাজ সিকদার গ্রেফতার ও হত্যার ক্ষেত্রে যারা তার হত্যাকারী সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তা-ব্যক্তিদের তথ্যকেই প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তাতেই আস্থা স্থাপন করেছেন। এ থেকেই লেখকের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যায়।
* লেখক তার সমগ্র বইতে সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টির মতবাদ-রাজনীতি-কর্মসূচি হালকা চালে নিয়ে এসেছেন। তার বইতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সিরাজ সিকদার ও তাঁর উত্তরাধিকারদের ব্যক্তিগত জীবনাচারণ-প্রেম-বিয়ের নানা কেচ্ছাকাহিনী। বুর্জোয়ারা যেভাবে তাদের বিরোধীপক্ষকে ঘায়েল করতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নানান গল্প সাজিয়ে চরিত্র হননের চেষ্টা করে, লেখকও সেই নোংরা পথ অনুসরণ করেছেন। এসএস-এর অনুপস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে এমন চারিত্রিক কালিমালেপন রাজনৈতিক বা সামাজিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। দেশে ও বিশ্বে যখন পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা তার কদর্য ফ্যাসিবাদী রূপের কারণে জনগণ এ ব্যবস্থার প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন মহান একজন বিপ্লবী নেতৃত্ব সম্পর্কে এ ধরনের কালিমালেপনে লেখকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। আমাদের দেশের শ্রমজীবী জনগণ ও প্রগতিশীল ছাত্র-তরুণ-বুদ্ধিজীবীদের কাছে এই সংকটকালে সিরাজ সিকদার আজও এক আলোর দিশারী। তখন লেখকের এ ধরনের উদ্যোগ অসৎ মনোভাবাপন্নেরই প্রকাশ। লেখক ‘লাল সন্ত্রাস’ বইটিকে সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টির ইতিহাস বললেও কার্যত ইতিহাসের জঘন্য বিকৃতি ও মিথ্যাচারের দলিল হিসেবেই পাঠক মহলে এটি জায়গা পাবে। নাসিরুদ্দিন নীলুরা যেমন স্ট্যালিনকে বিকৃতি করে নাটক নির্মাণ করে সাম্রাজ্যবাদীদের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে, সেখানে মহিউদ্দিন সাহেব অন্তত বর্তমান দেশীয় শাসক গোষ্ঠীর আশীর্বাদ পাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
‘লাল সন্ত্রাস, সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’ এক বিপ্লবী নায়কের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল মূল্যায়নের উপাখ্যান
রাজনৈতিক-ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ লিখিত একুশে ফেব্রুয়ারি ২০২১ বইমেলায় বাতিঘর প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘লাল সন্ত্রাস সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি’। বইয়ের লেখক গত শতাব্দীর ৬০/৭০-র দশকে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় (পরে বাংলাদেশে) কমিউনিস্ট রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নেতৃত্ব মাওবাদী নেতা সিরাজ সিকদার ও তার নেতৃত্বে গঠিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির রাজনৈতিক বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা, মূল্যায়নের পাশাপাশি, তৎকালীন পার্টির সাথে সম্পর্কিত/যুক্ত এবং নেতৃস্থানীয় কিছু ব্যক্তির সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন।
রাজনীতি সচেতন সবাই কম বেশি এই পার্টি ও তাঁর নেতৃত্ব সম্পর্কে অবগত। পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী একটি মাওবাদী পার্টি। এই পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রধান নেতা সিরাজ সিকদার। তিনি অল্প বয়সেই দেশীয় ও বৈশ্বিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বাঁক পরিবর্তনকারী সময়ে পূর্ব বাংলায় বিপ্লব সংগঠনে ভিন্ন ধারার একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে প্রয়াস নেন।
তখন সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলন রুশ-চীন মহাবিতর্কে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। দেশ-বিদেশের অনেকের মত সিরাজ সিকদারও বিপ্লবের অগ্রসর মতবাদ, মাওবাদকে, কমিউনিস্ট মতবাদের বিকাশে তৃতীয় বা উচ্চতর স্তর হিসেবে গ্রহণ করেন। এই মতবাদের আলোকে পূর্ব বাংলায় বিপ্লবের স্তর হিসেবে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পথ হিসেবে পার্লামেন্টারী পথ বর্জন করে গ্রাম ভিত্তিক দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের রাজনীতি গ্রহণ ও গোপন পার্টি গঠন করেন। অল্প সময়েই সেই পার্টির নেতৃত্বে দেশব্যাপী বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলেন।
দেশীয় শাসক শ্রেণি ও তাদের বিদেশি প্রভুদের কাছে সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টি পরিণত হয় এক মূর্তিমান আতঙ্কে। শাসক শ্রেণির ষড়যন্ত্র চক্রান্তে তিনি নিরস্ত্র অবস্থায় ‘৭৫-এর ১ জানুয়ারি গ্রেফতার হন। এবং ২ জানুয়ারি তিনি বন্দি অবস্থায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হন।
আমাদের সংগঠনদ্বয় (বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন) মাওবাদের আদর্শে বিশ্বাসী। সিরাজ সিকদারকে আমরা এদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের এক মহান নেতৃত্ব বলে মনে করি ও ঊর্ধ্বে তুলে ধরি। তাই, মহিউদ্দিন আহমেদ লিখিত সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টি সম্পর্কে লিখিত বইটি আমাদের যথেষ্ট কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। বইটিতে এমন কিছু বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন যেগুলো সম্পর্কে না বললেই নয়। সেই তাগিদ থেকেই উল্লেখিত বইয়ের কিছু বিষয় নিয়ে এ লেখা।
তবে সিরাজ সিকদারের পার্টির অভ্যন্তরীণ অনেক বিষয়ে যেসব বক্তব্য লেখক বা সাক্ষাতকারদাতাদের কথায় উঠে এসেছে সেসব সম্পর্কে বলার এখতিয়ার আমাদের নেই। সেসব বিষয়ে তার প্রতিষ্ঠিত পার্টিই কথা বলতে পারে, যে পার্টি এখনো এদেশে সক্রিয়। তাই, আমরা সীমাবদ্ধ থাকবো যেসব মতাদর্শগত-রাজনৈতিক বিষয় সিরাজ সিকদারের পার্টির বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় সেসব বিষয়ে। আর তার যে রচনা সংগ্রহ বাজারে পাওয়া যায় সে পুস্তক থেকেও আমরা তার লাইন ও কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু আলোচনা করবো।
* আমাদের দেশে এ ধরনের কাজ বেশ বিরল। গোপন পার্টি ও তাঁর নেতৃত্ব সম্পর্কে শুধু ইতিহাস রচনায় নয়, বইটিতে পার্টির কার্যক্রম ও ব্যক্তি সিরাজ সিকদার সম্পর্কে লেখকের মূল্যায়নও প্রকাশ পেয়েছে।
লেখকের উদ্দেশ্য আমরা জানি না। তবে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে প্রত্যেকের কাজে-কর্মে থাকে তার শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গির ছাপ। আর লেখক যদি হয় রাজনীতি সচেতন তবে তার লেখনিতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ছাপও অনিবার্য। লেখক নিজে এক সময় আওয়ামী ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে জাসদের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এরপর তিনি বিভিন্ন দাতা সংস্থায় কর্মরত ছিলেন।
ইতিহাস বয়ান আর ইতিহাসের বিশ্লেষণ পুরোপুরিই ভিন্ন। ‘লাল সন্ত্রাস সিরাজ সিকদার ও সর্বহারার রাজনীতি’ বইটির মধ্য দিয়ে লেখক এই পার্টির রাজনীতি ও তাঁর নেতৃত্বের ভূমিকার মূল্যায়ন টেনেছেন। আর তার এই মূল্যায়নকে শক্ত ভিত্তি দিতে তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৎকালীন সময়কার পার্টির নেতৃত্বের একাংশ এবং পার্টির সাথে যুক্ত/সম্পর্কিত শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তিবর্গের। যাদের অধিকাংশই পার্টি-বিপ্লব ত্যাগকারী, অধঃপতিত, বুর্জোয়া জীবনে প্রতিষ্ঠিত। লেখকের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী বইটি মূলত একঝাঁক মেধাবী তরুণের স্বপ্নযাত্রা ও স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। জনগণ এখানে অনুপস্থিত। অর্থাৎ লেখক আজকে যেখানে পৌঁছেছেন সেই সব তরুণরাও জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি বা উপেক্ষা করে লেখকের পথ অনুসরণ করে সেখানে পৌঁছাতে পারতেন। সেই সুযোগ হেলায় বিসর্জন দিয়ে সমাজ বদলের লড়াইয়ে আত্মাহুতি, লেখকের কাছে তা জীবনের এক বড় ধরনের অপচয়। লেখক কোনোভাবেই সেটা মানতে পারেননি। অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা-সচ্ছলতা-পাওয়া/না পাওয়ার জায়গা থেকে তিনি সমাজ বিপ্লবকে দেখেছেন। বুর্জোয়া রাজনীতির মোহজালে তিনি বিপ্লবী রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। আর এ সবই এসেছে লেখকের আওয়ামী, জাসদীয় রাজনীতির চোখে সিরাজ সিকদারের রাজনীতিকে দেখার কারণে।
“বিপ্লব কোনো ভোজ-সভা, বা প্রবন্ধ রচনা বা চিত্র অঙ্কন কিংবা সূচিকর্ম নয়; এটা এত সুমার্জিত, এত ধীর-স্থির ও সুশীল, এত নম্র, দয়ালু, বিনীত, সংযত ও উদার হতে পারে না। বিপ্লব হচ্ছে বিদ্রোহÑ উগ্র বলপ্রয়োগের কাজ, যার দ্বারা এক শ্রেণি অন্য শ্রেণিকে পাল্টে দেয়”। -মাও সেতুঙ।
বিপ্লবে রক্তপাত অনিবার্য্য। মার্কসবাদের এই অমোঘ সত্যকে সত্যিকার কোন বিপ্লবীই অস্বীকার করেন না। লেখকের সমগ্র লেখায় এই সত্যকে অস্বীকার করেছেন বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবাদ দ্বারা চালিত হয়ে। সারা বিশ্বের তাবৎ বুর্জোয়ারা মুখে ‘গণতন্ত্রের’ফেনা তুললেও তারাই এর বড় হন্তারক। এ ধরনের নজির বিশ্ব রাজনীতিতে অহরহ ঘটে চলেছে। তাই তো লেখক সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লবের পরে রেড আর্মি ও হোয়াইট আর্মির সংগঠিত কার্যকলাপকে একই মাপকাঠিতে মেপেছেন। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শ্রেণি বৈষম্যমূলক বিশ্ব ব্যবস্থায় যুদ্ধ অনিবার্য্য। আর সেই অন্যায় যুদ্ধের বিপরীতে কমিউনিস্টরা ন্যায় যুদ্ধকে ন্যায্য বলেই মানে। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুদ্ধই শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। আর তার মধ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে যুদ্ধ বা রক্তপাতের অবসান ঘটবে। লেখকের বয়ান অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। শিশু জন্মাবে প্রসব যন্ত্রনা ছাড়াই। এই ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করা ইতিহাসের সাথে মিথ্যাচারের সামিল। লেখক সে পথেই হেটেছেন। আর তাই তো সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টির রাজনীতির ইতিহাসকে তিনি খুনোখুনির ইতিহাস বলতে চেয়েছেন।
লেখককে বেশি ব্যথিত করেছে তার ছাত্র জীবনের বন্ধু রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তাকে পার্টি কর্তৃক হত্যাকান্ডে। শাসকশ্রেণির শ্রেণি স্বার্থ রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার রাষ্ট্রের বাহিনী। বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান করে। সিরাজ সিকদার সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের সেবাদাস গণবিরোধী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই জারি করেছিলেন, শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী জনগণের রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে। ফলে এ লড়াইয়ে উভয় পক্ষের প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি অনিবার্য। লেখকের মনে একবারও এ প্রশ্ন আসেনি যে, তার বন্ধু রক্ষীবাহিনীর মতো একটি গণনিপীড়ক বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ‘স্বাধীনতা’ পরবর্তী জনমনে তীব্র হতাশা আর আওয়ামী ফ্যসিবাদী সরকারের নেতৃত্বে দেশব্যাপী অত্যাচার-নির্যাতন-দখল-লুটপাট, ধর্ষণ, হত্যা-সন্ত্রাসের এক বিভৎস পরিস্থিতি। আর সেই অপকর্মের প্রধান সারথী ছিল রক্ষীবাহিনী। তারা শুধু কয়েক হাজার বামপন্থী নেতা-কর্মীদেরই হত্যা করেনি, এই নৃশংসতার শিকার হয়েছেন অগণিত দেশপ্রেমিক-সাধারণ জনগণ। লেখক ইতিহাসের সেই সময়ের কিছু কিছু বিষয়কে ছুঁয়ে গেলেও রক্ষীবাহিনীর দুঃশাসনের ব্যাপারে একবারেই নীরব থেকেছেন। সমাজের অস্থিরতা, অসন্তোষকে দেখেছেন জনগণের আকাশচুম্বী স্বপ্ন হিসেবে। এসব থেকে শেখ মুজিব সরকারকে ডিফেন্স করেছেন সদ্য ‘স্বাধীন’তা প্রাপ্ত দেশগঠনে পর্যাপ্ত সময়ের অভাব বলে। আর লেখকের ভাষায় জনগণের এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু সংখ্যক সন্ত্রাসী (বলেননি, বলতে চেয়েছেন) গণবিচ্ছিন্নভাবে দেশব্যাপী থানা-ফাঁড়ি-ব্যাংক-খাদ্য গুদাম লুট করেছেন। সিরাজ সিকদার তারই অন্যতম নেতৃত্ব।
জনগণ প্রস্তুত নয় বা গণবিচ্ছিন্নতার কথা বলে গণযুদ্ধের রাজনীতিকে খারিজ করা তাবৎ সংশোধনবাদীদের অতি পুরনো রোগ। সিরাজ সিকদার সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশব্যাপী সফলভাবে হরতাল পালন করেছিলেন। এমনকি সেই হরতালে সমর্থন ‘৭৩-সালে দিয়েছিলেন মাওলানা ভাসানীর মত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জননেতা। আজ ‘স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে’জনগণের জীবনমান আর মুষ্টিমেয় এক শ্রেণির অঢেল বিত্ত-বৈভব ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে সিরাজ সিকদার তথাকথিত স্বাধীনতার পর যে অসমাপ্ত জাতীয়-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন তা সর্বৈব সত্য বলেই প্রতিভাত হয়। বাংলাদেশ যে সাম্রাজ্যবাদের দালাল দক্ষিণ এশীয় প্রতিক্রিয়ার প্রধান খুঁটি ভারতের লুটপাট-নিপীড়ন-নিয়ন্ত্রণের এক অধীনস্ত রাজ্যে পরিণত হয়েছে তা শিশুরাও বুঝতে পারে। কিন্তু লেখক এই সহজ সত্যকে বুঝতে অপারগ।
লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন সিরাজ সিকদার ও তার পার্টির ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। আত্মনির্ভরতার ভিত্তিতে কোনো বিদেশি শক্তির সহায়তা ছাড়াই এসএস পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ গড়ে তুলেছিলেন। লেখক এ বিষয়টা আনলেও উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে মুজিবের স্বেচ্ছায় ধরা দেয়ার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে গেছেন। এসময় আওয়ামী অন্য নেতারা পালিয়ে ভারত যান। ভারতের মদদ ও ব্যবস্থাপনায় গঠিত হয় আওয়ামী প্রবাসী সরকার। লেখকের কাছে বিষয়টা ইতিবাচক হলেও সিরাজ সিকদার সঠিকভাবে ধরতে পেরেছিলেন যে পূর্ব বাংলা আন্ত:সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের কুরুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একইসাথে তিনি বলেছিলেন, ভারত যেখানে নিজ দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারকে টুটি চেপে ধরেছে, সেখানে পূর্ব বাংলার স্বাধীকারের প্রশ্নে এ ধরনের ‘সহযোগিতা’তাদের গোপন অভিসন্ধিরই প্রকাশ। ভারতে প্রশিক্ষিত মুজিবাহিনীকে সজ্জিত করা হয়েছিল মাওপন্থী দমনে। লেখক এ বিষয়টাকে হেঁয়ালিপূর্ণভাবে দেখাতে চেয়েছেন যেন মাওপন্থীদের শ্রেণিশত্রæ বা জাতীয় শত্রæ খতমের রাজনীতির কারণেই তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর সাথে মাওপন্থীদের সংঘাতের ঘটনা ঘটেছিল। ‘৭১-র বিশেষ পরিস্থিতিতে বরঞ্চ উল্টোটাই সত্য। আওয়ামী প্রধান নেতাদের অনুপস্থিতিতে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাওপন্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভারত ফেরত আওয়ামী মুক্তিবাহিনী দেশে ফিরেই মাওপন্থীদের প্রধান টার্গেট করে। মাওপন্থী উচ্ছেদে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে মেতে ওঠে। মুৎসুদ্দি আওয়ামী নেতৃত্ব কখনই মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালি জাতি-জনগণের সার্বিক শোষণ মুক্তির লড়াই হিসেবে দেখেনি, দেখেছে তাদের শ্রেণি বা গোষ্ঠিগত ক্ষমতার লড়াই হিসেবে। এজন্যই সত্যিকার কমিউনিস্ট বা মাওপন্থীদের প্রতি তারা এতটা বিরূপ। তাই তো দেখি সিরাজ সিকদার ও তার পার্টির আওয়ামীলীগের প্রতি খোলা চিঠি মারফত যৌথ কমান্ডে মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কোনো সাড়া মেলেনি। একইভাবে লেখকের কাছে এসবের কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই বলেই প্রতিভাত হয়েছে। কমিউনিস্ট নিধনে বিশেষত বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী ও দেশের ভিতরে অবস্থানরত কাদেরীয় বাহিনী ছিল এ প্রশ্নে সবচেয়ে সরস। লেখক নিজেও বিএলএফ’র সদস্য ছিলেন বলেই হয়ত ভারতের সেবাদাস এই মুক্তিবাহিনী কর্তৃক কমিউনিস্ট হত্যাকে বিশৃঙ্খলা দমন হিসেবেই দেখেছেন। তিনি এসব তথ্যকে তুলে ধরেছেন আওয়ামী পন্থীদের অপরাধ এড়িয়ে।
লেখক শাসক শ্রেণির প্রতিবিপ্লবী জাসদ রাজনীতিকে সর্বহারা পার্টির বিপ্লবী রাজনীতির সাথে মেলানোর অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। যে জাসদ-নেতৃত্ব বিপ্লব ধ্বংসের জন্য আওয়ামী লীগের সশস্ত্র বিটিম হিসেবে কাজ করেছে। যে সংগঠনের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের গণক্ষমতা তথা নয়াগণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার কোনো কর্মসূচি ছিল না। সেখানে কর্ণেল তাহেরের মত বিপ্লব আকাক্সক্ষী বিভ্রান্ত মধ্যবিত্ত বীরের আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমিক ও সমাজতন্ত্রমনা অসংখ্য ছাত্র-তরুণ-বুদ্ধিজীবীদের সংযুক্তি থাকলেও তার রাজনীতি, মূল নেতৃত্ব ও কর্মসূচি কখনই বিপ্লবী ছিল না। যে জাসদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সিরাজুল আলম খান, যার হাত দিয়েই রচিত হয় বাকশালের কর্মসূচি। যখন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের বাহিনী দ্বারা বিপ্লব আকাঙ্খী জাসদের তরুণেরা আত্মাহুতি দিচ্ছেন তখন সিরাজুল আলম খানের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ ছিল শেখ মুজিবের। তাকে ভারতে পালাতে সাহায্য করছে শেখ মুজিব। লেখকের তথ্য থেকেই এ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আর তাকেই কিনা লেখক তুলনা করছেন সিরাজ সিকদারের মত মহান দেশপ্রেমিক-বিপ্লবী কমিউনিস্টের সাথে। একজন যেখানে সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত অনুচর, কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী; অন্যজন ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল শাসকশ্রেণির কবর খননকারী।
তিনি সর্বহারা পার্টির চক্র-উপদল সংক্রান্ত ভুল লাইন ও পদ্ধতিকে সমালোচনা করতে গিয়ে পার্টি ও বিপ্লবের রাজনৈতিক লাইন ও মতাদর্শকে বাতিল করে দিয়েছেন। সেজন্য তিনি দেখেছেন প্রধান নেতা কমরেড সিরাজ সিকদারসহ পার্টি নেতাদের স্বৈরাচারী পরিচালনা পদ্ধতি, ভোগ-বিলাস, যৌন বিচ্যুতি, খুনোখুনি ও নেতৃত্ব দখলের লোভে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের পিচ্ছিল পথ। অথচ এই বইয়েই উল্লেখ আছে কমরেড সিরাজ সিকদারসহ অগ্রসর বিপ্লবীগণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে আত্মপ্রতিষ্ঠা ও পরিবারের ভোগ বিলাসের জীবন ত্যাগ করে শ্রমিক-কৃষকের সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য দৈহিক শ্রম থেকে শুরু করে কত কষ্টকর জীবন যাপন করেছেন।
স্বল্প সময়ের বিপ্লবী অনুশীলনে প্রেম-বিয়ে-যৌন প্রশ্নকে বিপ্লবী স্বার্থের অধীনে রেখেছেন। এক সঙ্গে একাধিক স্ত্রী রাখাকে বিরোধিতা করেছেন। প্রয়োজনীয় বিবাহ বিচ্ছেদকে সহজতর করেছেন। যারা পুনর্গঠন হতে পারেনি তারাই পার্টি ও নেতৃত্বকে আক্রমণ করেছে। বিপ্লব ত্যাগকারীদেরকেই লেখক হাতিয়ার বানিয়েছে। পুঁজিবাদী-সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় একাধিক স্ত্রী রাখা, হোটেল পতিতালয়ে গমন, স্ত্রী নিপীড়ন, হত্যা-ধর্ষণ, বাল্য বিবাহের নরক যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে এসে পার্টি ও বিপ্লবী স্বার্থের অধীনে নারী-পুরুষের প্রেম-ভালবাসার স্বেচ্ছামূলক সম্পর্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়াস নিঃসন্দেহে অনুসরণযোগ্য। এক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতিকে বিপ্লবী সংগ্রামকে অব্যাহত রেখেই সারসংকলন করা যায়। কমরেড সিরাজ সিকদার এভাবেই ব্যক্তিগত সব কিছুকেই দেখেছেন। এখানে যৌন কাতরতা, ভোগ-বিলাসের কিছু নেই।
তিনি এসএস পরবর্তী ও পার্টির স্বল্পকালীন প্রধান নেতা কমরেড মতিনকে এসএস-এর গ্রেফতারের জন্য দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। যিনি বহু সীমাবদ্ধতা এবং ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্তে¡ও সংকটময় পরিস্থিতিতে পার্টির বিপ্লবী ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তত্ত¡ ও অনুশীলনে অতীতের সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি থেকে মুক্ত হয়ে অগ্রসর হতে না পারলেও তিনি বিপ্লব ত্যাগ করেন নি। তিনি আমৃত্যু সিরাজ সিকদার ও মাওবাদের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন।
যাদের মুখ দিয়ে কমরেড মতিনকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে তারাই পার্টি ও বিপ্লব ত্যাগ করেছেন, পার্টি ভাঙার ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করেছেন বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে শাসক শ্রেণির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন। রইসউদ্দিন আরিফের কথা এক্ষেত্রে খুব প্রযোজ্য। জিয়াউদ্দিন যিনি এসএস পরবর্তী মাওবাদ বর্জন করে হোক্সাপন্থা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের সহায়তায় ব্যক্তি জীবনে পুনর্বাসিত হন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদও গ্রহণ করেছিলেন।
লেখক সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর তার পার্টির বিভক্তি ও বিভক্ত অংশগুলোর বর্ণনায় একটি মাত্র পক্ষের বক্তব্যকেই তুলে ধরেছেন, যারা কিনা পরবর্তীতে সিরাজ-বিরোধী রাজনীতির প্রচারক। এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, সিরাজের মৃত্যুর পর তার রাজনীতি-অনুসারী তার পার্টি ও অনেক ব্যক্তি/গোষ্ঠী এখনো সক্রিয়। তাদের কোনো বক্তব্য সংগ্রহের চেষ্টা লেখক করেছেন বলে মনে হয়নি। এ থেকেও লেখকের রাজনৈতিক মতাবস্থান বোঝা যায়, যা প্রকৃত ইতিহাস নির্মাণে অসততা ছাড়া কিছু নয়।
* সিরাজ সিকদারের গ্রেফতার ও বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর জন্য আওয়ামী সরকার ও তার প্রধান শেখ মুজিব দায়ী। গ্রেফতার জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়ায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ইএ চৌধুরি, এসপি মাহবুব, রক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে আনোয়ার উল আলম, সরোয়ার মোল্লা, নূরুজ্জামান দায়ী।
লেখক শেখ মুজিব, পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তাদের অভিযোগ থেকে রক্ষার জন্য মিথ্যা তথ্যের অবতারণা করেছেন। সেজন্য সংসদে দাঁড়িয়ে ‘কোথায় আজ সিরাজ সিকদার’ বলে মুজিব যে সিরাজ সিকদারের হত্যার দায় স্বীকার করেছিল সে অভিযোগ থেকে দায়মুক্ত করে লেখক শেখ হাসিনার মুখ দিয়ে বের করেছেন ‘তোরা ওকে বাঁচতে দিলি না’। এই তোরাটা কারা? লেখক সেটা আবিষ্কার করেননি। তাছাড়া শেখ হাসিনার বয়ানে পুলিশ বাহিনীর মধ্যকার মুজিব বিরোধীদের ক্রসফায়ারে সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর নতুন কাহিনী সাজিয়েছেন। এটা এক জঘন্য প্রতারণা।
লেখক কার্যত সিরাজ সিকদার গ্রেফতার ও হত্যার ক্ষেত্রে যারা তার হত্যাকারী সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তা-ব্যক্তিদের তথ্যকেই প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তাতেই আস্থা স্থাপন করেছেন। এ থেকেই লেখকের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যায়।
* লেখক তার সমগ্র বইতে সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টির মতবাদ-রাজনীতি-কর্মসূচি হালকা চালে নিয়ে এসেছেন। তার বইতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সিরাজ সিকদার ও তাঁর উত্তরাধিকারদের ব্যক্তিগত জীবনাচারণ-প্রেম-বিয়ের নানা কেচ্ছাকাহিনী। বুর্জোয়ারা যেভাবে তাদের বিরোধীপক্ষকে ঘায়েল করতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নানান গল্প সাজিয়ে চরিত্র হননের চেষ্টা করে, লেখকও সেই নোংরা পথ অনুসরণ করেছেন। এসএস-এর অনুপস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে এমন চারিত্রিক কালিমালেপন রাজনৈতিক বা সামাজিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। দেশে ও বিশ্বে যখন পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা তার কদর্য ফ্যাসিবাদী রূপের কারণে জনগণ এ ব্যবস্থার প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন মহান একজন বিপ্লবী নেতৃত্ব সম্পর্কে এ ধরনের কালিমালেপনে লেখকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। আমাদের দেশের শ্রমজীবী জনগণ ও প্রগতিশীল ছাত্র-তরুণ-বুদ্ধিজীবীদের কাছে এই সংকটকালে সিরাজ সিকদার আজও এক আলোর দিশারী। তখন লেখকের এ ধরনের উদ্যোগ অসৎ মনোভাবাপন্নেরই প্রকাশ। লেখক ‘লাল সন্ত্রাস’ বইটিকে সিরাজ সিকদার ও তাঁর পার্টির ইতিহাস বললেও কার্যত ইতিহাসের জঘন্য বিকৃতি ও মিথ্যাচারের দলিল হিসেবেই পাঠক মহলে এটি জায়গা পাবে। নাসিরুদ্দিন নীলুরা যেমন স্ট্যালিনকে বিকৃতি করে নাটক নির্মাণ করে সাম্রাজ্যবাদীদের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে, সেখানে মহিউদ্দিন সাহেব অন্তত বর্তমান দেশীয় শাসক গোষ্ঠীর আশীর্বাদ পাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র