• শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

৩১ মার্চ’২৬-এর মধ্যে “মাওবাদী-মুক্ত ভারত”

হিন্দত্ববাদী মোদি সরকারের অভিলাষ ব্যর্থ করবে জনগণ

৩১ মার্চ’২৬-এর মধ্যে “মাওবাদী-মুক্ত ভারত”

হিন্দত্ববাদী মোদি সরকারের অভিলাষ ব্যর্থ করবে জনগণ

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

১৯৬৬ সালে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক গুণগত উল্লম্ফন ঘটায়। তৎকালীন মাও সে-তুঙ চিন্তাধারায় (বর্তমান মাওবাদ) প্রভাবিত হয়ে শহিদ কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) গড়ে ওঠে। ব্যাপাক মাত্রায় কৃষক-আদিবাসী-তরুণ এই আন্দোলনে যোগ দেন। রাষ্ট্রীয় তীব্র দমন-পীড়নের ফলে নকশালবাড়ি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে  কমরেড চারু মজুমদারের শহিদি মৃত্যুর পর পার্টি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। নকশালবাড়ির উত্থান ও পরবর্তী বিপ্লবী সংগ্রাম ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতিতে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও মতাদর্শিক ক্ষেত্রে মাওবাদ গ্রহণ, বিপ্লবের স্তর নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব নির্ধারণ, কৃষক সমস্যাকে কেন্দ্রবিন্দু করা এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন তৎকালিন মাওবাদীরা। নকশালবাড়ির প্রভাব ভারতসহ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ভারতের সুবিধাবাদী অংশ নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদী চিহ্নিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বর্জন করে।

বিপ্লবী অংশ নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সারসংকলন করে সত্তর দশকের শেষার্ধ থেকে আবার সশস্ত্র সংগ্রামের পথে সংগঠিত হতে শুরু করেন। “সশস্ত্র সংগ্রাম বা বাহিনী করা যাবে না” যারা বলতেন তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কোন্ডাপল্লী সীতারামাইয়ার নেতৃত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পাটির্ (পিপলস্ ওয়ার) সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলে। দলে দলে তরুণরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (PW) ও মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (MCC) ২০০৪ সালে (পরে আরো কিছু গ্রুপ যুক্ত হয়) ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি(মাওবাদী) গঠন করে। তারা বাহিনীকে ব্রিগেড (৩,০০০-৫,০০০ জনের) পর্যায়ে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় তথ্যানুসারেই মাওবাদীদের দুইটি ব্রিগেড ছিল। এছাড়া বহুসংখ্যক কোম্পানি ও প্লাটুনও এর সহায়ক হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পার্টির নেতৃত্বে মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিশাল অঞ্চল মুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে, যা মাওবাদী পরিভাষায় “ঘাঁটি” নামে পরিচিত।

এই ঐক্যবদ্ধ মাওবাদী পার্টি এবং এ পার্টির নেতৃত্বে ভারতের নিঃস্ব-নিপীড়িত কৃষক ও আদিবাসী জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের বিকাশে ভারত সরকার ও সাম্রাজ্যবাদীরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে মাওবাদী এবং সাধারণ আদিবাসীদের দমন-পীড়ন-হত্যা-গ্রেফতার করে আসছে। মাওবাদীরা একে সফলভাবেই প্রতিরোধ করেছেন। দমন-পীড়নের মধ্যেই ২০১৪ সালে পার্টি ‘জনতার সরকার’ গঠন করেছে। প্রগতিশীল লেখক-বুদ্ধিজীবী, যারা মাওবাদী অধ্যুষিত অঞ্চল ঘুরে এসে বই লিখেছেন, তাদের লেখনীতেই দেখা যায় জনতার সরকারের বাস্তব চিত্র। ভারত রাষ্ট্রের ভেতরই তারা নিজস্ব রাষ্ট্র-ব্যবস্থা পরিচালনা করেছেন। নয়াগণতান্ত্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যৌথ খামার ব্যবস্থা সবকিছুই তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শোষণমূলক রাষ্ট্রের পেটের ভেতর নবীন বিপ্লবী রাষ্ট্র পরিচালনা করে দেখিয়েছেন মাওবাদীরা। যার ফলে ভারত রাষ্ট্রের চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তারা।

তাই, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলমান “অপারেশন কাগার”(শেষ যুদ্ধ) নামে ভারত থেকে মাওবাদী নির্মূল করার মিশনে নামে ভারত রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যবাদীরা। ২০০৯ থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান সালওয়া জুডুম, গ্রিন হান্ট, সমাধান, প্রহর– ইত্যাদির মধ্যে ‘অপারেশন কাগার’ হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক অভিযান। শুধু স্থল পথেই নয়, আকাশ পথ থেকেও মাওবাদী ও আদিবাসীদের উপর আক্রমণ করেছে ভারত রাষ্ট্র। তাদের মাওবাদী দমন করার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দণ্ডকারণ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান খনিজ সম্পদের মালিকানা দখল করে তা সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালাল বড় বুর্জোয়াদের হাতে তুলে দেয়া। অর্থাৎ আদিবাসীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে তাদের জল-জমি-জঙ্গল সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে দিয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা। সেই লক্ষ্য থেকেই শত শত মাওবাদী এবং আদিবাসী জনগণকে হত্যা করছে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট মোদি সরকার। যারাই কাগারবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন/নিচ্ছেন, তাদেরকেই দমনমূলক আইন ইউএপিএ (UAPA)’র মাধ্যমে কঠোর হস্তে দমন করছে। অনেককে জেলে পুরেছে। নিজেদের বানানো বুর্জোয়া আইন লঙ্ঘন করে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই আটক করছে। নিজেরাই মোবাইল-কম্পিউটারে রাষ্ট্র-বিরোধী ডকুমেন্ট তৈরি করে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করছে। আটক করে অমানুষিক শারীরিক-মানসিক-যৌন নিপীড়ন করছে।

বুর্জোয়া মিডিয়া মারফতই জানা যায় অপারেশন কাগারে ৭৫০ জনের অধিক মাওবাদীদের তারা হত্যা করেছে। বিকৃত-বীভৎস লাশের ছবিই বলে দেয় যে, কি পরিমাণ অমানবিক নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে মাওবাদী নারী গেরিলাদের ধর্ষণও করা হয়েছে। এই তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যে পার্টি হারিয়েছে পার্টির সম্পাদক শহিদ কমরেড বাসবরাজকে। হারিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার মাদভি হিদমাসহ অনেক কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে। তাদের পরিচালিত জনতার সরকার সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

কিন্তু এই দুই বছরে চলা সামরিক অভিযান ‘অপারেশন কাগারে’ যতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্লান্ত বিপ্লবীদের ব্যক্তি-সুবিধাবাদের কারণে। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ বিসর্জন দিয়ে তারা আত্মসমর্পণ লাইন, তথাকথিত যুদ্ধ বিরতিকরণ লাইন হাজির করেছে। বুর্জোয়া মিডিয়া মারফত জানা যায়, বিশ্বাসঘাতক সোনু-সতীশ-দেবজির হাত ধরে, ২৫০০ ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করেছে। একদল মূল ধারায় ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আরেকদল আপাত যুদ্ধবিরতিকরণের পথে হাঁটছে।

এখন প্রশ্ন হলো আত্মসমর্পণ লাইন বা যুদ্ধ বিরতিকরণ লাইন তারা কেন হাজির করছে? মুক্তির পথ কী?

সমাজ বিকাশের সাথে সাথে ভারতেরও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। আজ আধা-সামন্তবাদ ভিন্নরূপে-ভিন্ন আঙ্গিকে বিদ্যমান। এই আধা-সামন্তবাদী, নয়া-উপনিবেশিক ব্যবস্থার সাথে যুদ্ধকে সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, যখন কিনা শত্রুপক্ষ অস্ত্র-শস্ত্র, সামরিক কৌশল ও অর্থ-সম্পদ ইত্যাদিতে অনেক শক্তিশালী। আত্মরক্ষার স্তর থেকে ভারসাম্য বা আক্রমণের লড়াইয়ের এই দীর্ঘ সময়ে একদল ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই ক্লান্ত বিপ্লবীরাই আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধ বিরতিকরণের লাইন এনে তথাকথিত মূল ধারায়, অর্থাৎ চলমান গণশত্রু বুর্জোয়া-সামন্ত ধারায় ফিরে যাচ্ছে। তারা বাহিনী বিলুপ্ত করে বুর্জোয়া সংসদে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বুর্জোয়া মূল ধারাতেই ফিরে যাওয়া হয়, তাহলে আর বিপ্লবের কথা থাকছে কোথায়? তথাকথিত মূল ধারায় ফিরে যাওয়া বা বাহিনী বিলুপ্তি তো বিপ্লবের সমস্যার কোনো সমাধান নয়, বরং তাহলো পরিষ্কার ভাবেই বিপ্লব বর্জন, মুখে তারা যতই বিপ্লবের কথা বলুক না কেন। মূল ধারায় ফিরে যাওয়া মানে পুরানো উৎপাদন, রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। পুরানো উৎপাদন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের সংকট-সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ। বরং সত্যি কথাটি হলো, এ ব্যবস্থাই জনগণের সংকটের মূল কারণ। সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে একটানা ৩৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদন ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। সিপিএম-এর পশ্চিমবঙ্গ পরিচালনা থেকে গুজরাটে বিজেপি বা উত্তর ভারতে কংগ্রেসের পরিচালনায় উৎপাদন ব্যবস্থা একই থাকে। জনগণের সংকটও একই থাকে। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নারী-আদিবাসীসহ নিপীড়িত জনগণের মুক্তি যুক্ত হয়ে আছে ব্যবস্থা পরিবর্তনের সাথে। ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রেখে মূল ধারায় ফিরে যাওয়া, সংসদে ফিরে যাওয়া মুক্তির কোনো পথই হতে পারে না।

ইতিহাসে সকল বিপ্লবী শিক্ষাগুরুরা শিখিয়েছেন, আত্মসমর্পণ নয়, শেষ পর্যন্ত লড়াই কর। বিপ্লবে পরাজয় রয়েছে, পশ্চাদপসরণ করতে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের জয় হবেই। অর্থাৎ কষ্ট, ক্ষয়ক্ষতি বা জীবন বিসর্জন দিতে হলেও শত্রুর কাছে কোনো আত্মসমর্পণ নয়, শেষ পর্যন্ত অব্যহত লড়াই করতে হবে। বরং শত্রুকেই আত্মসমর্পণের জন্য বাধ্য করতে হবে। কিন্তু হতাশাগ্রস্ত ক্লান্ত বিপ্লবীরা এইসব শিক্ষা ভুলে গিয়ে বিপ্লবের সাথে, কাগার-শহিদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। চীন-রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করেও পার্টির অভ্যন্তরের ক্যাডাররা পুঁজিবাদের পথগামী হয়ে গিয়েছিল। কমরেড মাও সে-তুঙ দেখিয়েছেন পার্টির ভেতরেই কিভাবে পুঁজিবাদের পথগামীরা-সংশোধনবাদীরা জন্ম নেয়। জিপিসিআরের শিক্ষায় আমাদের অব্যাহত বিপ্লব করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধকে দুই/চার/পাঁচ বছরের দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে দেখলে হবে না। এই যুদ্ধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, যুগ থেকে যুগ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ধরেই বিপ্লবীদের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

ভারত রাষ্ট্র বলেছিল ৩১ মার্চের মধ্যে মাওবাদী মুক্ত ভারত গঠন করবে। কিন্তু আমরা দেখেছি ১ এপ্রিল, ২০২৬- এই মোদি-অমিত শাহর বক্তব্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আদিবাসী-মাওবাদীরা বলছেন “মাওবাদী মুক্ত ভারত নয়, দারিদ্র-মুক্ত ভারত গঠন কর”। সিপিআই(মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটি অব্যাহত লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কারণ যেকারণে ভারতে সিপিআই(মাওবাদী) গঠিত হয়েছে, সেই কারণ ফুরিয়ে যায়নি। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নারী-আদিবাসীসহ নিপীড়িত জাতি-জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্র সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ জনগণের যে সংকট থেকে ভারতে মাওবাদী রাজনীতি শুরু হয়েছে সে সংকট এখনও বিরাজমান। যদি দমন-পীড়ন করেই মাওবাদী মুক্ত ভারত গঠন করা যেতো তবে নকশালবাড়ি আন্দোলন, তেলেঙ্গানা বিদ্রোহে দমন-পীড়ন, ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে দমনপীড়নের পর চলমান যুদ্ধ ও বিপ্লবী ঘঁাটি প্রতিষ্ঠা হতো না। কিন্তু আগের পরাজয়গুলোর পরও মাওবাদী বিপ্লব আবার নতুন বিক্রমে মাথা তুলেছে। আমরা দেখেছি প্রত্যেকটি পরাজয়ের পর, পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক-সামরিক ক্ষেত্রে সারসংকলন করেই পার্টি এগিয়ে গেছে। যারা এখনও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথে অবিচল রয়েছেন তাদেরকে এই ক্ষয়ক্ষতি-বিপর্যয়ের বিপ্লবী সারসংকলন করেই বিপ্লব এগিয়ে নিতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের এই পথ কখনোই সরল হবে না, এই পথ হবে বন্ধুর। বিপ্লব এই আঁকাবাঁকা পথেই মাওবাদীদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে।

 

বিশ্বজুড়ে 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত

 

ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট মোদি সরকার ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে 'অপারেশন কাগার' নামক সামরিক অভিযান চালিয়ে মাওবাদী নেতা-কর্মী ও আদিবাসীদের হত্যা-দমন করে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে "মাওবাদী মুক্ত ভারত” প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষাকারী ফ্যাসিস্ট ভারত রাষ্ট্র এই দুই বছরে ৭৫০ জনেরও অধিক মাওবাদী নেতৃত্ব এবং সাধারণ আদিবাসীদের হত্যা করেছে।

ICSPWI ও FACAM বিশ্বজুড়ে ২৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সমাবেশের আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বজুড়ে 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, ব্রিটেন, গ্রিস, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, কলাম্বিয়া, তিউনিশিয়া, চিলি, ব্রাজিল, তুরস্ক, ফিলিপাইন, মেজিকা, স্পেনের মাদ্রিদে, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সমাবেশ, আলোচনাসভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, শ্রমজীবী এলাকাগুলোতে পোস্টারিং, কারখানার সামনে লিফলেট বিতরণ করা হয়। ব্রেমেনে ডুসেলডর্ফ, এসেন, ফ্রাইবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে ব্যানার, পোস্টার ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশেও "ভারতে মাওবাদী ও আদিবাসী গণহত্যা বিরোধী প্রতিবাদ কমিটি, বাংলাদেশ”-এর উদ্যোগে ৩১ মার্চ'২৬ এ রাজধানীর শাহবাগে 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে 'অপারেশন কাগারের বিরুদ্ধে' প্রতিবাদ এবং ভারতের মাওবাদী ও আদিবাসীদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানানো হয়।

৩১ মার্চ’২৬-এর মধ্যে “মাওবাদী-মুক্ত ভারত”

হিন্দত্ববাদী মোদি সরকারের অভিলাষ ব্যর্থ করবে জনগণ

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
বৃহঃস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

১৯৬৬ সালে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক গুণগত উল্লম্ফন ঘটায়। তৎকালীন মাও সে-তুঙ চিন্তাধারায় (বর্তমান মাওবাদ) প্রভাবিত হয়ে শহিদ কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) গড়ে ওঠে। ব্যাপাক মাত্রায় কৃষক-আদিবাসী-তরুণ এই আন্দোলনে যোগ দেন। রাষ্ট্রীয় তীব্র দমন-পীড়নের ফলে নকশালবাড়ি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে  কমরেড চারু মজুমদারের শহিদি মৃত্যুর পর পার্টি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। নকশালবাড়ির উত্থান ও পরবর্তী বিপ্লবী সংগ্রাম ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতিতে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করলেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। কিন্তু এ সত্ত্বেও মতাদর্শিক ক্ষেত্রে মাওবাদ গ্রহণ, বিপ্লবের স্তর নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব নির্ধারণ, কৃষক সমস্যাকে কেন্দ্রবিন্দু করা এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন তৎকালিন মাওবাদীরা। নকশালবাড়ির প্রভাব ভারতসহ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ভারতের সুবিধাবাদী অংশ নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদী চিহ্নিত করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বর্জন করে।

বিপ্লবী অংশ নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সারসংকলন করে সত্তর দশকের শেষার্ধ থেকে আবার সশস্ত্র সংগ্রামের পথে সংগঠিত হতে শুরু করেন। “সশস্ত্র সংগ্রাম বা বাহিনী করা যাবে না” যারা বলতেন তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কোন্ডাপল্লী সীতারামাইয়ার নেতৃত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পাটির্ (পিপলস্ ওয়ার) সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলে। দলে দলে তরুণরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (PW) ও মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (MCC) ২০০৪ সালে (পরে আরো কিছু গ্রুপ যুক্ত হয়) ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি(মাওবাদী) গঠন করে। তারা বাহিনীকে ব্রিগেড (৩,০০০-৫,০০০ জনের) পর্যায়ে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় তথ্যানুসারেই মাওবাদীদের দুইটি ব্রিগেড ছিল। এছাড়া বহুসংখ্যক কোম্পানি ও প্লাটুনও এর সহায়ক হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পার্টির নেতৃত্বে মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিশাল অঞ্চল মুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে, যা মাওবাদী পরিভাষায় “ঘাঁটি” নামে পরিচিত।

এই ঐক্যবদ্ধ মাওবাদী পার্টি এবং এ পার্টির নেতৃত্বে ভারতের নিঃস্ব-নিপীড়িত কৃষক ও আদিবাসী জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের বিকাশে ভারত সরকার ও সাম্রাজ্যবাদীরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে মাওবাদী এবং সাধারণ আদিবাসীদের দমন-পীড়ন-হত্যা-গ্রেফতার করে আসছে। মাওবাদীরা একে সফলভাবেই প্রতিরোধ করেছেন। দমন-পীড়নের মধ্যেই ২০১৪ সালে পার্টি ‘জনতার সরকার’ গঠন করেছে। প্রগতিশীল লেখক-বুদ্ধিজীবী, যারা মাওবাদী অধ্যুষিত অঞ্চল ঘুরে এসে বই লিখেছেন, তাদের লেখনীতেই দেখা যায় জনতার সরকারের বাস্তব চিত্র। ভারত রাষ্ট্রের ভেতরই তারা নিজস্ব রাষ্ট্র-ব্যবস্থা পরিচালনা করেছেন। নয়াগণতান্ত্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যৌথ খামার ব্যবস্থা সবকিছুই তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শোষণমূলক রাষ্ট্রের পেটের ভেতর নবীন বিপ্লবী রাষ্ট্র পরিচালনা করে দেখিয়েছেন মাওবাদীরা। যার ফলে ভারত রাষ্ট্রের চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তারা।

তাই, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলমান “অপারেশন কাগার”(শেষ যুদ্ধ) নামে ভারত থেকে মাওবাদী নির্মূল করার মিশনে নামে ভারত রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যবাদীরা। ২০০৯ থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান সালওয়া জুডুম, গ্রিন হান্ট, সমাধান, প্রহর– ইত্যাদির মধ্যে ‘অপারেশন কাগার’ হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক অভিযান। শুধু স্থল পথেই নয়, আকাশ পথ থেকেও মাওবাদী ও আদিবাসীদের উপর আক্রমণ করেছে ভারত রাষ্ট্র। তাদের মাওবাদী দমন করার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দণ্ডকারণ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান খনিজ সম্পদের মালিকানা দখল করে তা সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালাল বড় বুর্জোয়াদের হাতে তুলে দেয়া। অর্থাৎ আদিবাসীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে তাদের জল-জমি-জঙ্গল সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে দিয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা। সেই লক্ষ্য থেকেই শত শত মাওবাদী এবং আদিবাসী জনগণকে হত্যা করছে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট মোদি সরকার। যারাই কাগারবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন/নিচ্ছেন, তাদেরকেই দমনমূলক আইন ইউএপিএ (UAPA)’র মাধ্যমে কঠোর হস্তে দমন করছে। অনেককে জেলে পুরেছে। নিজেদের বানানো বুর্জোয়া আইন লঙ্ঘন করে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই আটক করছে। নিজেরাই মোবাইল-কম্পিউটারে রাষ্ট্র-বিরোধী ডকুমেন্ট তৈরি করে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করছে। আটক করে অমানুষিক শারীরিক-মানসিক-যৌন নিপীড়ন করছে।

বুর্জোয়া মিডিয়া মারফতই জানা যায় অপারেশন কাগারে ৭৫০ জনের অধিক মাওবাদীদের তারা হত্যা করেছে। বিকৃত-বীভৎস লাশের ছবিই বলে দেয় যে, কি পরিমাণ অমানবিক নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে মাওবাদী নারী গেরিলাদের ধর্ষণও করা হয়েছে। এই তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যে পার্টি হারিয়েছে পার্টির সম্পাদক শহিদ কমরেড বাসবরাজকে। হারিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডার মাদভি হিদমাসহ অনেক কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে। তাদের পরিচালিত জনতার সরকার সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

কিন্তু এই দুই বছরে চলা সামরিক অভিযান ‘অপারেশন কাগারে’ যতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্লান্ত বিপ্লবীদের ব্যক্তি-সুবিধাবাদের কারণে। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ বিসর্জন দিয়ে তারা আত্মসমর্পণ লাইন, তথাকথিত যুদ্ধ বিরতিকরণ লাইন হাজির করেছে। বুর্জোয়া মিডিয়া মারফত জানা যায়, বিশ্বাসঘাতক সোনু-সতীশ-দেবজির হাত ধরে, ২৫০০ ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করেছে। একদল মূল ধারায় ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আরেকদল আপাত যুদ্ধবিরতিকরণের পথে হাঁটছে।

এখন প্রশ্ন হলো আত্মসমর্পণ লাইন বা যুদ্ধ বিরতিকরণ লাইন তারা কেন হাজির করছে? মুক্তির পথ কী?

সমাজ বিকাশের সাথে সাথে ভারতেরও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। আজ আধা-সামন্তবাদ ভিন্নরূপে-ভিন্ন আঙ্গিকে বিদ্যমান। এই আধা-সামন্তবাদী, নয়া-উপনিবেশিক ব্যবস্থার সাথে যুদ্ধকে সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, যখন কিনা শত্রুপক্ষ অস্ত্র-শস্ত্র, সামরিক কৌশল ও অর্থ-সম্পদ ইত্যাদিতে অনেক শক্তিশালী। আত্মরক্ষার স্তর থেকে ভারসাম্য বা আক্রমণের লড়াইয়ের এই দীর্ঘ সময়ে একদল ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই ক্লান্ত বিপ্লবীরাই আত্মসমর্পণ বা যুদ্ধ বিরতিকরণের লাইন এনে তথাকথিত মূল ধারায়, অর্থাৎ চলমান গণশত্রু বুর্জোয়া-সামন্ত ধারায় ফিরে যাচ্ছে। তারা বাহিনী বিলুপ্ত করে বুর্জোয়া সংসদে ফিরে যাওয়ার কথা বলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বুর্জোয়া মূল ধারাতেই ফিরে যাওয়া হয়, তাহলে আর বিপ্লবের কথা থাকছে কোথায়? তথাকথিত মূল ধারায় ফিরে যাওয়া বা বাহিনী বিলুপ্তি তো বিপ্লবের সমস্যার কোনো সমাধান নয়, বরং তাহলো পরিষ্কার ভাবেই বিপ্লব বর্জন, মুখে তারা যতই বিপ্লবের কথা বলুক না কেন। মূল ধারায় ফিরে যাওয়া মানে পুরানো উৎপাদন, রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। পুরানো উৎপাদন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের সংকট-সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ। বরং সত্যি কথাটি হলো, এ ব্যবস্থাই জনগণের সংকটের মূল কারণ। সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে একটানা ৩৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদন ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। সিপিএম-এর পশ্চিমবঙ্গ পরিচালনা থেকে গুজরাটে বিজেপি বা উত্তর ভারতে কংগ্রেসের পরিচালনায় উৎপাদন ব্যবস্থা একই থাকে। জনগণের সংকটও একই থাকে। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নারী-আদিবাসীসহ নিপীড়িত জনগণের মুক্তি যুক্ত হয়ে আছে ব্যবস্থা পরিবর্তনের সাথে। ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রেখে মূল ধারায় ফিরে যাওয়া, সংসদে ফিরে যাওয়া মুক্তির কোনো পথই হতে পারে না।

ইতিহাসে সকল বিপ্লবী শিক্ষাগুরুরা শিখিয়েছেন, আত্মসমর্পণ নয়, শেষ পর্যন্ত লড়াই কর। বিপ্লবে পরাজয় রয়েছে, পশ্চাদপসরণ করতে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের জয় হবেই। অর্থাৎ কষ্ট, ক্ষয়ক্ষতি বা জীবন বিসর্জন দিতে হলেও শত্রুর কাছে কোনো আত্মসমর্পণ নয়, শেষ পর্যন্ত অব্যহত লড়াই করতে হবে। বরং শত্রুকেই আত্মসমর্পণের জন্য বাধ্য করতে হবে। কিন্তু হতাশাগ্রস্ত ক্লান্ত বিপ্লবীরা এইসব শিক্ষা ভুলে গিয়ে বিপ্লবের সাথে, কাগার-শহিদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। চীন-রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করেও পার্টির অভ্যন্তরের ক্যাডাররা পুঁজিবাদের পথগামী হয়ে গিয়েছিল। কমরেড মাও সে-তুঙ দেখিয়েছেন পার্টির ভেতরেই কিভাবে পুঁজিবাদের পথগামীরা-সংশোধনবাদীরা জন্ম নেয়। জিপিসিআরের শিক্ষায় আমাদের অব্যাহত বিপ্লব করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধকে দুই/চার/পাঁচ বছরের দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে দেখলে হবে না। এই যুদ্ধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, যুগ থেকে যুগ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ধরেই বিপ্লবীদের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

ভারত রাষ্ট্র বলেছিল ৩১ মার্চের মধ্যে মাওবাদী মুক্ত ভারত গঠন করবে। কিন্তু আমরা দেখেছি ১ এপ্রিল, ২০২৬- এই মোদি-অমিত শাহর বক্তব্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আদিবাসী-মাওবাদীরা বলছেন “মাওবাদী মুক্ত ভারত নয়, দারিদ্র-মুক্ত ভারত গঠন কর”। সিপিআই(মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটি অব্যাহত লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কারণ যেকারণে ভারতে সিপিআই(মাওবাদী) গঠিত হয়েছে, সেই কারণ ফুরিয়ে যায়নি। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নারী-আদিবাসীসহ নিপীড়িত জাতি-জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্র সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ জনগণের যে সংকট থেকে ভারতে মাওবাদী রাজনীতি শুরু হয়েছে সে সংকট এখনও বিরাজমান। যদি দমন-পীড়ন করেই মাওবাদী মুক্ত ভারত গঠন করা যেতো তবে নকশালবাড়ি আন্দোলন, তেলেঙ্গানা বিদ্রোহে দমন-পীড়ন, ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে দমনপীড়নের পর চলমান যুদ্ধ ও বিপ্লবী ঘঁাটি প্রতিষ্ঠা হতো না। কিন্তু আগের পরাজয়গুলোর পরও মাওবাদী বিপ্লব আবার নতুন বিক্রমে মাথা তুলেছে। আমরা দেখেছি প্রত্যেকটি পরাজয়ের পর, পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক-সামরিক ক্ষেত্রে সারসংকলন করেই পার্টি এগিয়ে গেছে। যারা এখনও দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথে অবিচল রয়েছেন তাদেরকে এই ক্ষয়ক্ষতি-বিপর্যয়ের বিপ্লবী সারসংকলন করেই বিপ্লব এগিয়ে নিতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের এই পথ কখনোই সরল হবে না, এই পথ হবে বন্ধুর। বিপ্লব এই আঁকাবাঁকা পথেই মাওবাদীদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে।

 

বিশ্বজুড়ে 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত

 

ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট মোদি সরকার ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে 'অপারেশন কাগার' নামক সামরিক অভিযান চালিয়ে মাওবাদী নেতা-কর্মী ও আদিবাসীদের হত্যা-দমন করে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে "মাওবাদী মুক্ত ভারত” প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষাকারী ফ্যাসিস্ট ভারত রাষ্ট্র এই দুই বছরে ৭৫০ জনেরও অধিক মাওবাদী নেতৃত্ব এবং সাধারণ আদিবাসীদের হত্যা করেছে।

ICSPWI ও FACAM বিশ্বজুড়ে ২৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সমাবেশের আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বজুড়ে 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, ব্রিটেন, গ্রিস, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, কলাম্বিয়া, তিউনিশিয়া, চিলি, ব্রাজিল, তুরস্ক, ফিলিপাইন, মেজিকা, স্পেনের মাদ্রিদে, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সমাবেশ, আলোচনাসভা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, শ্রমজীবী এলাকাগুলোতে পোস্টারিং, কারখানার সামনে লিফলেট বিতরণ করা হয়। ব্রেমেনে ডুসেলডর্ফ, এসেন, ফ্রাইবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে ব্যানার, পোস্টার ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

বাংলাদেশেও "ভারতে মাওবাদী ও আদিবাসী গণহত্যা বিরোধী প্রতিবাদ কমিটি, বাংলাদেশ”-এর উদ্যোগে ৩১ মার্চ'২৬ এ রাজধানীর শাহবাগে 'কাগারবিরোধী' প্রতিবাদ সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে 'অপারেশন কাগারের বিরুদ্ধে' প্রতিবাদ এবং ভারতের মাওবাদী ও আদিবাসীদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানানো হয়।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র