ইউক্রেন যুদ্ধ : কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং উপায় কী?
আন্দোলন প্রতিবেদন
শনিবার, ২ এপ্রিল ২০২২ | অনলাইন সংস্করণ
বেশ কিছুদিন ধরেই ইউক্রেনের সীমান্ত ঘিরে রাশিয়া সৈন্য সমাবেশ ঘটায়। রাশিয়া এবং মার্কিন-ইইউ পাল্টা-পাল্টি হুমকি-ধমকির পর গত ২৪ ফ্রেব্রুয়ারি’২২ ভোরে ইউক্রেনে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়া। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের আগে রুশ সীমান্তবর্তী দুটো অঞ্চল দোনেস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এগুলোতে পূর্ব থেকেই রুশপন্থি বিদ্রোহীদের সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিল। তবে রাশিয়া যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে তা যতনা ইউক্রেনকে টার্গেট করে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বকে টার্গেটে রেখে। কারণ ইউক্রেন ঘিরে রাশিয়ার সমরসজ্জা এবং রুশ আগ্রাসন হচ্ছে রুশ-মার্কিন এবং মার্কিন-চীন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশভাষীদের ওপর দমন-নির্যাতন এবং ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগদানের চেষ্টাসহ নানাবিধ ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ন্যাটো জোটের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছিল। ১৯৯০ সালে প্রাক্তন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের পর বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একচ্ছত্র আধিপত্য ও মোড়লীপনা করে। তখনকার পরিস্থিতিতে দুর্বল রাশিয়া তার সীমান্তঘেঁষা নতুন রাষ্ট্রগুলোতে মার্কিন ব্লকের রাজনৈতিক-সামরিক ষড়যন্ত্র মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মার্কিনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের আবির্ভাব এবং মার্কিনীদের সাম্রাজ্যে বহুবিধ সংকট বেড়ে ওঠার কারণে মার্কিন নেতৃতা¡ধীন একমেরু বিশ্বে ভাঙ্গন ধরে। বিশ্বের প্রভুত্ব নিয়ে চীন-রাশিয়া ও মার্কিন ব্লকের দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে। মার্কিনের নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের সংকটের জের ধরে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী চীন এখন বিশ্ব ভাগবাটোয়ায় ভাগ বসাতে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে আগামী ৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব জয়ের আশাবাদও ব্যক্ত করেছে। রাশিয়াও ইতিমধ্যে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং নিজ সাম্রাজ্যে গুছিয়ে ইউরোপে তার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া দেশগুলোকে পুনরায় নিজ বলয়ে টেনে আনার চেষ্টা করছে এবং প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসন চালাতেও সাহস দেখাচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে তার দালাল সরকারগুলোর মাধ্যমে রাশিয়া বিরোধী সামরিক-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করে এবং তার অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে অন্তর্ভুক্ত করে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার চক্রান্তে লিপ্ত হয়। রাশিয়া এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করার পাশাপাশি ইউক্রেনে রাশিয়াপন্থি সশস্ত্র গ্রুপগুলোকেও মদদ দেয়। শেষ পর্যন্ত জেলেনস্কি সরকার ন্যাটো জোটে যোগদানে অনড় থাকায় রাশিয়া এই আগ্রাসন চালায়। এই যুদ্ধে ইউক্রেনের অনেক অংশ রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। ইতিমধ্যে কয়েকদফা রুশ-ইউক্রেন আলোচনা হয়েছে যুদ্ধবন্ধে সমঝোতার জন্য। তুরস্কের মধ্যস্ততায় আলোচনায় জেলেনস্কির সুর কিছুটা নরম থাকলেও রাশিয়া ছিল কঠোর। রাশিয়ার দাবি ন্যাটো জোট ইউক্রেন কখনই যাবে না তা জেলেনস্কি সরকারকে শুধু ঘোষণা দিলেই চলবে না। এ জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে। মার্কিন দালাল জেলেনস্কি সরকার মার্কিনসহ ন্যাটো জোটের মদদে তা মেনে নেয়নি বিধায় যুদ্ধ এখনও চলছে। রাশিয়া যত সহজে ইউক্রেন দখলের চিন্তা করছিল তা সহজ হচ্ছে না। তাই দু’পক্ষই আলোচনার টেবিলে সমঝোতা করতেও চাইছে। তবে যুদ্ধের মাঠে জয়-পরাজয়, সফলতা-ব্যর্থতা দিয়েই এই সমঝোতার শর্তাবলি নির্ধারণ হবে তা বলাই বাহুল্য। চীন সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ না নিলেও সে রাশিয়ার পাশেই থাকছে। নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিনের যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার মধ্যদিয়েই তা প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ব প্রভুত্বে মার্কিন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। চীনের নিজেরও রয়েছে মার্কিন এবং ইইউ’র সাথে বিবিধ গুরুতর সব দ্বন্দ্ব - যেমন, তাইওয়ান, তিব্বত, হংকং, উইঘুর, ভারতের সাথে সীমান্ত, দক্ষিণ চীন সাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সামরিক ইস্যু এবং বাণিজ্যযুদ্ধ। তাই রাশিয়াকে চীন তার মিত্র হিসেবেই দেখছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার এই আগ্রাসন প্রমাণ করছে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব দ্রুত তীব্র হচ্ছে তা রাজনৈতি-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই শুধু নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও। এখনই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেধে না গেলেও একে তার প্রস্তুতি বলা যেতে পারে। পোল্যান্ড সীমান্তে সেনাঘাঁটিতে রুশ হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জো বাইডেন বলেছে - ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান পশ্চিমা সামরিক জোটের কোনো সদস্যদেশের সীমানায় এলে ন্যাটো তার সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করবে।’ কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে ধ্বংস যজ্ঞের মুখে ফেলার ঝুঁকি নিতে তারা হয়তো চাইছে না। কিন্তু প্রক্সিযুদ্ধ চালাতে তারা বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব এতোটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে যুদ্ধ ছাড়া কোনো সমাধান তাদের কাছে নেই। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা গুরুতর সংকটগ্রস্ত। তাদের সংকট মোকাবেলার জন্যই সেসব দেশে ফ্যাসিবাদও গজিয়ে উঠছে এবং বিকশিত হচ্ছে। এসবই তাদের এ জাতীয় আগ্রাসনে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সাম্রাজ্যবাদের অমোঘ নিয়ম। মহান লেনিন বলেছিলেন সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ। শতবছর পরও আমরা সেটাই দেখছি। তাই সরাসরি যুদ্ধকে, এমনকি বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাকেও বাতিল করা যাবে না। এটা বাড়তেই থাকবে। কোনো শান্তিবাদী প্রচারই একে থামাতে পারবে না। বৃহৎ শক্তিগুলোর আগ্রাসন ও যুদ্ধ-চক্রান্তের মুখে পৃথক দেশ হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার ইউক্রেনের রয়েছে। কিন্তু সে দেশের বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি বিভক্ত হয়ে গেছে মার্কিন ও রুশ ব্লকে। জেলেনস্কি সরকার হচ্ছে মার্কিনের দালাল। সে কারণেই সে ন্যাটোর সামারিক জোটে যুক্ত হতে অনড় ছিল। রাশিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর উপস্থিতি, রাশিয়াকে ঘিরে ফেলা, এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি রাশিয়া মেনে নেবে না। তাই, ইউক্রেন-যুদ্ধ বাধার ক্ষেত্রে রাশিয়া যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী ন্যাটো, তার প্রধান গডফাদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দালাল জেলেনস্কি সরকারও। ইউক্রেনের জনগণ যুদ্ধবাজ এই উভয়গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র, হত্যা-নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার। জেলেনস্কি ও তার সরকারকে মহান, বীর, দেশপ্রেমিক হিসেবে পশ্চিমা মিডিয়া তুলে ধরছে। আসলে জেলেনস্কি সরকার মার্কিন এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের রক্ষক এবং দালাল ছাড়া আর কিছু নয়। তারা দোনেস্ক ও লুহানস্কের মতো রুশভাষী সংখ্যাগুরু অঞ্চলগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে দমন-নির্যাতন করেছে। তারা ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি সংগ্রামকে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে অত্যন্ত নগ্নভাবে মার্কিন-ইসরাইলের আগ্রসনকে সমর্থন দিয়েছে। তারা রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে এমনকি ইউক্রেনের নাৎসিপন্থি সশস্ত্র গ্রুপকেও মদদ দিচ্ছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের রাশিয়া বিরোধী যুদ্ধ চক্রান্তে ইউক্রেনকে ব্যবহার করছে। যুদ্ধের আগে তারা হুমকি দিয়েছিল ইউক্রেন আক্রমণ করলে তারা রাশিয়াকে উপযুক্ত জবাব দেবে। কিন্তু তারা এখন বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ থেকে অস্ত্র ব্যবসাকে শক্তিশালী করছে। আর সামরিক আগ্রাসন বিরোধিতা, মানবতা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতার বুলি আওড়াচ্ছে। মাত্র কিছু বছর আগেও আমেরিকা ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে সে সব দেশের সরকারগুলো উচ্ছেদ এবং মার্কিনের পদলেহীদের ক্ষমতায় বসানোর মত অপরাধ করেছে। বিগত মাত্র ২০/২১ বছরেই মার্কিন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক আগ্রাসনে লক্ষ লক্ষ জনগণ হতাহত হয়েছেন, বাস্তুহারা হয়েছেন, বিপুল সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, অগণিত নারী-শিশু-বৃদ্ধ-অসুস্থ মানুষ চরম বিপদে পড়েছেন। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধে এই দুই দেশের নিপীড়িত জাতি ও জনগণের কোনো স্বার্থ নেই। জেলেনস্কি সরকারের মতো এক মার্কিন-ইসরাইল-পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ-চক্রান্তের বাইরে গিয়ে কোনো গণযুদ্ধ পরিচালনা করে রাশিয়ার আগ্রসনকে পরাজিত করা। তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উপর নির্ভর করে ও তা করার জন্য। বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ও মানবতাবাদীরা বরাবরের মতো গলা ফাটাচ্ছে যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। তারা ন্যায় এবং অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে কোন পার্থক্য করছে না। বরং তারা অন্যায় যুদ্ধকে সমর্থন করছে। তাদের প্রধান অংশ রাশিয়ার আগ্রাসনকে বিরোধিতার নামে মূলত মার্কিনদ-ন্যাটোর যুদ্ধ-ষড়যন্ত্রকে এড়িয়ে গিয়ে জেলেনস্কি সরকারকে মহিয়ান করছে। অন্যদিকে কেউ কেউ মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অপরাধ-ষড়যন্ত্রকে বিরোধিতার নামে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনকে ন্যায্য করছে। আর আমাদের দেশের হাসিনা সরকার এই যুদ্ধে নিরপেক্ষতার ভান করছে। তারা সবদেশের সাথে বন্ধুত্ব রাখার কথা বলে যুদ্ধবাজ উভয় গোষ্ঠীর মন রক্ষা করছে। বিশ্বের নিপীড়িত, মুক্তিকামী জাতি-জনগণকে এই দুই সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের যুদ্ধ-আগ্রাসন-চক্রান্তকে বিরোধিতা, নিন্দা ও সংগ্রাম করতে হবে। সেটা করতে পারলেই ইউক্রেন ও নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হতে পারে। সেজন্য বিপ্লবের বিজ্ঞান মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে আয়ত্ত করতে হবে। সকল সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্র কায়েমের কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ইউক্রেন যুদ্ধ : কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং উপায় কী?
বেশ কিছুদিন ধরেই ইউক্রেনের সীমান্ত ঘিরে রাশিয়া সৈন্য সমাবেশ ঘটায়। রাশিয়া এবং মার্কিন-ইইউ পাল্টা-পাল্টি হুমকি-ধমকির পর গত ২৪ ফ্রেব্রুয়ারি’২২ ভোরে ইউক্রেনে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়া। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের আগে রুশ সীমান্তবর্তী দুটো অঞ্চল দোনেস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এগুলোতে পূর্ব থেকেই রুশপন্থি বিদ্রোহীদের সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিল। তবে রাশিয়া যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে তা যতনা ইউক্রেনকে টার্গেট করে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বকে টার্গেটে রেখে। কারণ ইউক্রেন ঘিরে রাশিয়ার সমরসজ্জা এবং রুশ আগ্রাসন হচ্ছে রুশ-মার্কিন এবং মার্কিন-চীন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশভাষীদের ওপর দমন-নির্যাতন এবং ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগদানের চেষ্টাসহ নানাবিধ ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ন্যাটো জোটের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছিল। ১৯৯০ সালে প্রাক্তন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের পর বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একচ্ছত্র আধিপত্য ও মোড়লীপনা করে। তখনকার পরিস্থিতিতে দুর্বল রাশিয়া তার সীমান্তঘেঁষা নতুন রাষ্ট্রগুলোতে মার্কিন ব্লকের রাজনৈতিক-সামরিক ষড়যন্ত্র মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মার্কিনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের আবির্ভাব এবং মার্কিনীদের সাম্রাজ্যে বহুবিধ সংকট বেড়ে ওঠার কারণে মার্কিন নেতৃতা¡ধীন একমেরু বিশ্বে ভাঙ্গন ধরে। বিশ্বের প্রভুত্ব নিয়ে চীন-রাশিয়া ও মার্কিন ব্লকের দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে। মার্কিনের নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের সংকটের জের ধরে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী চীন এখন বিশ্ব ভাগবাটোয়ায় ভাগ বসাতে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে আগামী ৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব জয়ের আশাবাদও ব্যক্ত করেছে। রাশিয়াও ইতিমধ্যে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং নিজ সাম্রাজ্যে গুছিয়ে ইউরোপে তার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া দেশগুলোকে পুনরায় নিজ বলয়ে টেনে আনার চেষ্টা করছে এবং প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসন চালাতেও সাহস দেখাচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে তার দালাল সরকারগুলোর মাধ্যমে রাশিয়া বিরোধী সামরিক-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করে এবং তার অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটে অন্তর্ভুক্ত করে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলার চক্রান্তে লিপ্ত হয়। রাশিয়া এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করার পাশাপাশি ইউক্রেনে রাশিয়াপন্থি সশস্ত্র গ্রুপগুলোকেও মদদ দেয়। শেষ পর্যন্ত জেলেনস্কি সরকার ন্যাটো জোটে যোগদানে অনড় থাকায় রাশিয়া এই আগ্রাসন চালায়। এই যুদ্ধে ইউক্রেনের অনেক অংশ রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। ইতিমধ্যে কয়েকদফা রুশ-ইউক্রেন আলোচনা হয়েছে যুদ্ধবন্ধে সমঝোতার জন্য। তুরস্কের মধ্যস্ততায় আলোচনায় জেলেনস্কির সুর কিছুটা নরম থাকলেও রাশিয়া ছিল কঠোর। রাশিয়ার দাবি ন্যাটো জোট ইউক্রেন কখনই যাবে না তা জেলেনস্কি সরকারকে শুধু ঘোষণা দিলেই চলবে না। এ জন্য সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে। মার্কিন দালাল জেলেনস্কি সরকার মার্কিনসহ ন্যাটো জোটের মদদে তা মেনে নেয়নি বিধায় যুদ্ধ এখনও চলছে। রাশিয়া যত সহজে ইউক্রেন দখলের চিন্তা করছিল তা সহজ হচ্ছে না। তাই দু’পক্ষই আলোচনার টেবিলে সমঝোতা করতেও চাইছে। তবে যুদ্ধের মাঠে জয়-পরাজয়, সফলতা-ব্যর্থতা দিয়েই এই সমঝোতার শর্তাবলি নির্ধারণ হবে তা বলাই বাহুল্য। চীন সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ না নিলেও সে রাশিয়ার পাশেই থাকছে। নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিনের যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকার মধ্যদিয়েই তা প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ব প্রভুত্বে মার্কিন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। চীনের নিজেরও রয়েছে মার্কিন এবং ইইউ’র সাথে বিবিধ গুরুতর সব দ্বন্দ্ব - যেমন, তাইওয়ান, তিব্বত, হংকং, উইঘুর, ভারতের সাথে সীমান্ত, দক্ষিণ চীন সাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সামরিক ইস্যু এবং বাণিজ্যযুদ্ধ। তাই রাশিয়াকে চীন তার মিত্র হিসেবেই দেখছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার এই আগ্রাসন প্রমাণ করছে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব দ্রুত তীব্র হচ্ছে তা রাজনৈতি-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই শুধু নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও। এখনই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেধে না গেলেও একে তার প্রস্তুতি বলা যেতে পারে। পোল্যান্ড সীমান্তে সেনাঘাঁটিতে রুশ হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জো বাইডেন বলেছে - ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান পশ্চিমা সামরিক জোটের কোনো সদস্যদেশের সীমানায় এলে ন্যাটো তার সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করবে।’ কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে ধ্বংস যজ্ঞের মুখে ফেলার ঝুঁকি নিতে তারা হয়তো চাইছে না। কিন্তু প্রক্সিযুদ্ধ চালাতে তারা বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব এতোটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে যুদ্ধ ছাড়া কোনো সমাধান তাদের কাছে নেই। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা গুরুতর সংকটগ্রস্ত। তাদের সংকট মোকাবেলার জন্যই সেসব দেশে ফ্যাসিবাদও গজিয়ে উঠছে এবং বিকশিত হচ্ছে। এসবই তাদের এ জাতীয় আগ্রাসনে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সাম্রাজ্যবাদের অমোঘ নিয়ম। মহান লেনিন বলেছিলেন সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ। শতবছর পরও আমরা সেটাই দেখছি। তাই সরাসরি যুদ্ধকে, এমনকি বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাকেও বাতিল করা যাবে না। এটা বাড়তেই থাকবে। কোনো শান্তিবাদী প্রচারই একে থামাতে পারবে না। বৃহৎ শক্তিগুলোর আগ্রাসন ও যুদ্ধ-চক্রান্তের মুখে পৃথক দেশ হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার ইউক্রেনের রয়েছে। কিন্তু সে দেশের বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি বিভক্ত হয়ে গেছে মার্কিন ও রুশ ব্লকে। জেলেনস্কি সরকার হচ্ছে মার্কিনের দালাল। সে কারণেই সে ন্যাটোর সামারিক জোটে যুক্ত হতে অনড় ছিল। রাশিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর উপস্থিতি, রাশিয়াকে ঘিরে ফেলা, এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি রাশিয়া মেনে নেবে না। তাই, ইউক্রেন-যুদ্ধ বাধার ক্ষেত্রে রাশিয়া যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী ন্যাটো, তার প্রধান গডফাদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দালাল জেলেনস্কি সরকারও। ইউক্রেনের জনগণ যুদ্ধবাজ এই উভয়গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র, হত্যা-নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার। জেলেনস্কি ও তার সরকারকে মহান, বীর, দেশপ্রেমিক হিসেবে পশ্চিমা মিডিয়া তুলে ধরছে। আসলে জেলেনস্কি সরকার মার্কিন এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের রক্ষক এবং দালাল ছাড়া আর কিছু নয়। তারা দোনেস্ক ও লুহানস্কের মতো রুশভাষী সংখ্যাগুরু অঞ্চলগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে দমন-নির্যাতন করেছে। তারা ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি সংগ্রামকে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে অত্যন্ত নগ্নভাবে মার্কিন-ইসরাইলের আগ্রসনকে সমর্থন দিয়েছে। তারা রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে এমনকি ইউক্রেনের নাৎসিপন্থি সশস্ত্র গ্রুপকেও মদদ দিচ্ছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের রাশিয়া বিরোধী যুদ্ধ চক্রান্তে ইউক্রেনকে ব্যবহার করছে। যুদ্ধের আগে তারা হুমকি দিয়েছিল ইউক্রেন আক্রমণ করলে তারা রাশিয়াকে উপযুক্ত জবাব দেবে। কিন্তু তারা এখন বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ থেকে অস্ত্র ব্যবসাকে শক্তিশালী করছে। আর সামরিক আগ্রাসন বিরোধিতা, মানবতা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতার বুলি আওড়াচ্ছে। মাত্র কিছু বছর আগেও আমেরিকা ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে সে সব দেশের সরকারগুলো উচ্ছেদ এবং মার্কিনের পদলেহীদের ক্ষমতায় বসানোর মত অপরাধ করেছে। বিগত মাত্র ২০/২১ বছরেই মার্কিন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক আগ্রাসনে লক্ষ লক্ষ জনগণ হতাহত হয়েছেন, বাস্তুহারা হয়েছেন, বিপুল সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, অগণিত নারী-শিশু-বৃদ্ধ-অসুস্থ মানুষ চরম বিপদে পড়েছেন। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধে এই দুই দেশের নিপীড়িত জাতি ও জনগণের কোনো স্বার্থ নেই। জেলেনস্কি সরকারের মতো এক মার্কিন-ইসরাইল-পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ-চক্রান্তের বাইরে গিয়ে কোনো গণযুদ্ধ পরিচালনা করে রাশিয়ার আগ্রসনকে পরাজিত করা। তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উপর নির্ভর করে ও তা করার জন্য। বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ও মানবতাবাদীরা বরাবরের মতো গলা ফাটাচ্ছে যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। তারা ন্যায় এবং অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে কোন পার্থক্য করছে না। বরং তারা অন্যায় যুদ্ধকে সমর্থন করছে। তাদের প্রধান অংশ রাশিয়ার আগ্রাসনকে বিরোধিতার নামে মূলত মার্কিনদ-ন্যাটোর যুদ্ধ-ষড়যন্ত্রকে এড়িয়ে গিয়ে জেলেনস্কি সরকারকে মহিয়ান করছে। অন্যদিকে কেউ কেউ মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অপরাধ-ষড়যন্ত্রকে বিরোধিতার নামে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনকে ন্যায্য করছে। আর আমাদের দেশের হাসিনা সরকার এই যুদ্ধে নিরপেক্ষতার ভান করছে। তারা সবদেশের সাথে বন্ধুত্ব রাখার কথা বলে যুদ্ধবাজ উভয় গোষ্ঠীর মন রক্ষা করছে। বিশ্বের নিপীড়িত, মুক্তিকামী জাতি-জনগণকে এই দুই সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের যুদ্ধ-আগ্রাসন-চক্রান্তকে বিরোধিতা, নিন্দা ও সংগ্রাম করতে হবে। সেটা করতে পারলেই ইউক্রেন ও নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হতে পারে। সেজন্য বিপ্লবের বিজ্ঞান মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে আয়ত্ত করতে হবে। সকল সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্র কায়েমের কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র